‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’ পোস্টার

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু চরিত্র রয়েছেন, যাঁদের জীবনকে শুধুমাত্র ‘নায়ক’ কিংবা ‘খলনায়ক’—এই দুই ভাগে বিচার করা কঠিন। তাঁদের জীবন জুড়ে রয়েছে সংগ্রাম, আদর্শ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া বাস্তবতা। বিপ্লবী অনন্ত সিংহ তেমনই এক বিতর্কিত ও আকর্ষণীয় চরিত্র। সেই মানুষটির জীবন ও ভাবনাকে বড়পর্দায় তুলে ধরেছেন পরিচালক পথিকৃৎ বসু। ছবির নাম—‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’।

প্রায় দু’বছর পর বড়পর্দায় জিৎ-এর প্রত্যাবর্তনও এই ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ। তবে ছবিটি শুধুমাত্র জিৎ-এর স্টার পাওয়ারের উপর নির্ভর করে তৈরি নয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এবং একজন বিপ্লবীর আদর্শ কীভাবে সময়ের সঙ্গে সংঘাতের মুখে পড়ে—সেই প্রশ্নকেই ছবির কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

গল্পের কেন্দ্রে অনন্ত সিংহ

ছবির গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনন্ত সিংহ। মাস্টারদা সূর্য সেনের সহযোদ্ধা হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত এই বিপ্লবীর জীবনের পরবর্তী অধ্যায় ছিল আরও জটিল।

স্বাধীনতার আগে যে মানুষ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, স্বাধীনতার পরে সেই মানুষই কীভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা, দুর্নীতি ও সামাজিক অসাম্যের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লেন—ছবির গল্প মূলত সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে।

ষাটের দশকের কলকাতায় একের পর এক ডাকাতির ঘটনা এবং তার সঙ্গে অনন্তের যোগসূত্র গল্পে রহস্য তৈরি করে। কিন্তু পরিচালক শুধু ‘কে ডাকাত?’ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেননি। বরং প্রশ্ন তুলেছেন—একজন বিপ্লবী যদি স্বাধীনতার পরও নিজের আদর্শের জন্য লড়াই করেন, তাহলে তাঁকে কী নামে ডাকা হবে?

জিৎ-এর অভিনয়—এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি

অনন্ত সিংহের চরিত্রে জিৎকে এই ছবিতে তাঁর পরিচিত commercial hero image-এর বাইরে দেখা যায়। চরিত্রটির বিভিন্ন বয়স, মানসিক পরিবর্তন এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায় ফুটিয়ে তুলতে তাঁর লুক, শরীরী ভাষা এবং সংলাপ বলার ধরনে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

বিশেষ করে ছবির আবেগঘন মুহূর্তগুলিতে জিৎ-এর অভিনয় নজর কাড়ে। তাঁর চরিত্রের রাগ, জেদ, আত্মবিশ্বাস এবং ভিতরের যন্ত্রণা—সবকিছুকে একসঙ্গে ধরে রাখার চেষ্টা দেখা যায়।

অ্যাকশন দৃশ্যেও জিৎ তাঁর স্বাভাবিক screen presence বজায় রেখেছেন। তবে এই ছবিতে শুধুমাত্র ‘mass hero’ হিসেবে তাঁকে ব্যবহার না করে অভিনেতা জিৎ-এর দিকটিকেও সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। একাধিক সমালোচনাতেও তাঁর অভিনয়কে ছবির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জিৎ-এর অ্যাকশন দৃশ্য - ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’
অ্যাকশন দৃশ্যে জিৎ-এর লার্জার-দ্যান-লাইফ ও তীব্র উপস্থিতি

টোটা রায়চৌধুরীর উপস্থিতি নজরকাড়া

ছবিতে জিৎ-এর পাশাপাশি টোটা রায়চৌধুরীও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অনন্তকে ধরার দায়িত্বে থাকা পুলিশ অফিসার দুর্গা প্রসাদ রায়ের চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি গল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব তৈরি করে।

একদিকে অনন্ত নিজের আদর্শ নিয়ে এগিয়ে চলেছেন, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা পুলিশ তাঁকে অপরাধী হিসেবে দেখছে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত ছবির নাটকীয়তা বাড়িয়েছে।

লোকনাথ দে, কৌশিক সেন, চন্দন সেন, রজতাভ দত্ত, প্রিয়াঙ্কা সরকার-সহ অন্যান্য অভিনেতারাও নিজেদের জায়গা থেকে ছবিকে শক্তিশালী করেছেন।

অ্যাকশন কেমন?

এখানে ছবিটি বেশ স্পষ্টভাবেই commercial cinema-র রাস্তা নিয়েছে। অ্যাকশন দৃশ্যগুলিতে রয়েছে বড় পরিসর, স্টাইলিশ presentation এবং mass appeal। দক্ষিণী ছবির ধাঁচের কিছু action treatment-ও চোখে পড়ে।

এই জায়গাটি দর্শকদের একটি অংশের কাছে ছবির অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে। আবার যাঁরা একেবারে বাস্তবধর্মী historical drama আশা করবেন, তাঁদের কাছে কিছু action sequence অতিরিক্ত stylised বলেও মনে হতে পারে। প্রকাশিত রিভিউগুলিতেও এই দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

ইতিহাস বনাম সিনেমাটিক স্বাধীনতা

এই ছবিকে দেখতে গেলে একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি—এটি ইতিহাসের হুবহু পুনর্নির্মাণ নয়। বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হলেও গল্পকে cinematic drama হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ফলে কিছু জায়গায় mass moments, action এবং dramatic treatment এসেছে। এই cinematic liberty-ই ছবিটিকে সাধারণ দর্শকের কাছে আরও accessible করেছে, আবার ইতিহাসের একেবারে নিখুঁত পুনর্নির্মাণ প্রত্যাশা করা দর্শকের কাছে কিছু অংশ প্রশ্ন তুলতে পারে।

তবে ছবির মূল প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ—স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা একজন মানুষ স্বাধীনতার পর নিজের দেশ ও সমাজের অন্যায় দেখে প্রতিবাদ করলে, তাঁর পরিচয় কী হবে?

"এই প্রশ্নটাই ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’-এর আসল শক্তি।"
অনন্ত সিংহের চরিত্রে জিৎ-এর নানা রূপ ও লুক
বিপ্লবী অনন্ত সিংহের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে জিৎ-এর বহুরূপী লুক

দ্বিতীয়ার্ধে আবেগের জায়গা বেশি

ছবির দ্বিতীয়ার্ধে গল্পের আবেগ এবং অনন্তের চরিত্রের ভিতরের দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার স্বপ্ন এবং স্বাধীনতার পর বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান, সেটিই গল্পকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

একজন বিপ্লবী যে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই দেশেই যদি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তাঁর মানসিক অবস্থাটা কী হতে পারে—ছবিটি সেই প্রশ্নের দিকে দর্শককে নিয়ে যায়।

এই জায়গাটিই ছবিকে শুধু action drama না হয়ে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্যের দিকে নিয়ে যায়।

গান ও আবহসংগীত

শান্তনু মৈত্রের সংগীত ছবির আবহ তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। বিশেষ করে আবেগঘন মুহূর্তে background score গল্পের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশেছে। প্রকাশিত রিভিউগুলিতেও ছবির music ও background score-এর প্রশংসা পাওয়া গেছে।

দেশপ্রেমের আবেগ, বিপ্লবের উত্তেজনা এবং চরিত্রের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা—তিনটি আলাদা mood তৈরি করার ক্ষেত্রে সংগীত ছবিকে সাহায্য করেছে।

কোথায় কিছুটা দুর্বল?

ছবির ambition বড়। ইতিহাস, বিপ্লব, রাজনীতি, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, action এবং commercial entertainment—সবকিছু একসঙ্গে সামলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে কিছু জায়গায় screenplay-এর গতি সমান থাকে না।

প্রথমার্ধের কিছু অংশ অপেক্ষাকৃত slow মনে হতে পারে। আবার কিছু action sequence-এ অতিরিক্ত stylisation রয়েছে বলেও মনে হতে পারে। কয়েকটি সমালোচনায় screenplay-এর কিছু দুর্বল অংশ এবং pacing issue-এর কথাও উঠে এসেছে।

তবে এই খামতিগুলি সত্ত্বেও ছবির মূল গল্প এবং জিৎ-এর performance দর্শককে ধরে রাখে।

শেষ কথা

‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’ শুধুমাত্র একজন বিপ্লবীর জীবনের গল্প নয়। এটি একজন মানুষের গল্প—যিনি নিজের আদর্শের জন্য লড়েছেন, স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছেন এবং পরে স্বাধীন দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন।

ছবির সবচেয়ে বড় সাফল্য হল, অনন্ত সিংহের মতো তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত একটি ঐতিহাসিক চরিত্রকে mainstream Bengali cinema-র আলোচনায় নিয়ে আসা।

আর জিৎ-এর জন্য ছবিটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর star image-এর পাশাপাশি অভিনেতা হিসেবে নিজেকে নতুনভাবে দেখানোর সুযোগ তিনি এখানে পেয়েছেন। অ্যাকশন, আবেগ, ইতিহাস এবং mass entertainment—সব মিলিয়ে এটি জিৎ-এর কেরিয়ারের একটি উল্লেখযোগ্য ছবি হয়ে থাকতে পারে।

যাঁরা ইতিহাসের সঙ্গে commercial action ও emotional drama পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’ প্রেক্ষাগৃহে দেখার মতো ছবি।

আমাদের রেটিং

হৃদয়ে অপরাজিতা ফিল্ম রিভিউ ডেস্ক
3.5 / 5
অভিনয়: ⭐⭐⭐⭐
গল্প: ⭐⭐⭐½
অ্যাকশন: ⭐⭐⭐⭐
সংগীত: ⭐⭐⭐⭐
চিত্রনাট্য: ⭐⭐⭐½
Overall: ⭐⭐⭐½/5

নিজস্ব প্রতিবেদন | বিনোদন