আবেগের শেষ সীমায়

স্তব্ধ কলকাতা ও এক আকস্মিক খবর

সালটা ১৯৮০। জুলাই মাসের এক সকাল। তখনও জানতাম না, ইতিহাসের এক আবেগঘন দিনের সাক্ষী হতে চলেছি। সবে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি, ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন আর চিন্তার মধ্যে বাড়িতেই ছিলাম। হঠাৎ রাস্তা থেকে ভেসে এল একসঙ্গে বহু মানুষের ছুটে চলার শব্দ। কৌতূহলবশত বাইরে এসে দেখি, তিন-চারজন লোক প্রাণপণে কুঁদঘাটের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই দৃশ্যটা যেন অবিশ্বাস্য হয়ে উঠল। আশপাশের প্রতিটি বাড়ি থেকে মানুষ বেরিয়ে আসছে। মায়ের বয়সী মহিলারা রান্নাঘর থেকে হাতা-خুন্তি ফেলে ছুটছেন। কেউ শাড়ির আঁচল গুছিয়ে নেওয়ার সময় পাননি, কেউ বা পায়ে চটি পর্যন্ত পরেননি। শিশু থেকে বৃদ্ধ, ছাত্র থেকে শ্রমিক---সকলেই যেন এক অদৃশ্য শক্তির টানে একই দিকে ছুটে চলেছে।

ছুটতে ছুটতেই কানে এল সেই বজ্রপাতের মতো খবর--- "উত্তমকুমার আর নেই!"

মুহূর্তে যেন বুকের ভেতরটা শূন্য হয়ে গেল।

জনস্রোতের মহাপ্লাবন

আমি নিজেও সেই জনস্রোতের অংশ হয়ে গেলাম। যত এগোচ্ছি, তত দেখছি চারপাশের গলি থেকে অসংখ্য মানুষ বেরিয়ে আসছে। রিকশাওয়ালারা যাত্রী নামিয়ে রিকশা রাস্তায় ফেলে দৌড়েছেন। তাঁদের মাথায় তখন রোজগার নেই, রিকশা চুরি হবে কি না সেই চিন্তাও নেই। কয়েকজন মহিলাকে দেখলাম কোলে শিশু নিয়ে ছুটছেন। মনে হচ্ছিল, গোটা কলকাতা যেন এক মানুষ হয়ে গেছে, আর সেই মানুষের হৃদয় আজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

মহানায়কের রাজকীয় নীরবতা

কখন যে ক্যালকাটা মুভিটোন পেরিয়ে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওর কাছে পৌঁছে গিয়েছিলাম, বুঝতেই পারিনি। তারপর আর দৌড়ানো সম্ভব ছিল না। মানুষের ঢল এতটাই প্রবল যে ভিড় ঠেলে এক পা এগোতেই সময় লাগছিল। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, কার্নিশ--- যেখানে দাঁড়ানো যায়, সেখানেই মানুষ ঝুলছে। প্রত্যেকের চোখে একই বেদনা, একই অবিশ্বাস।

তারপর চোখে পড়ল সেই দৃশ্য, যা আজও স্মৃতিতে অম্লান।

একটি বিশাল লরির উপর ফুলে ঢাকা অবস্থায় শায়িত বাংলার মহানায়ক। অসংখ্য মালার স্তূপের মধ্যে রাজকীয় নীরবতায় ঘুমিয়ে আছেন তিনি। জীবনে যাঁর হাসি, যাঁর কণ্ঠ, যাঁর উপস্থিতি লক্ষ মানুষের মনে আনন্দ এনে দিয়েছিল, আজ তিনি নিথর।

লরিতে পায়ের কাছে বসে ছিলেন চলচ্চিত্র জগতের বহু পরিচিত মুখ। কিন্তু সেদিন তারকাদেরও আলাদা করে চেনা হচ্ছিল না। কারণ সেদিন সবাই শুধুই শোকাহত মানুষ।

রেলব্রিজের ওপর থমকে যাওয়া শেষ শ্রদ্ধা

যানবাহন অনেকক্ষণ আগেই থেমে গিয়েছিল। শহর যেন নিজেই নিজের গতি বন্ধ করে দিয়েছিল। এমন সময় টালিগঞ্জ রেলব্রিজের কাছে পৌঁছে ঘটল এমন এক ঘটনা, যা আজও মনে পড়লে চোখ ভিজে ওঠে।

একটি ট্রেন ব্রিজের উপর এসে থেমে গেল। ড্রাইভারও যেন আর শুধু ড্রাইভার নন, তিনিও একজন শোকাহত বাঙালি। ট্রেনের যাত্রীরা নেমে ব্রিজের রেলিংয়ে ঝুঁকে পড়লেন শেষবারের মতো মহানায়ককে দেখার জন্য।

ফুল বিক্রেতাদের অশ্রুসজল অঞ্জলি

ঠিক তখনই দেখা গেল এক অপূর্ব দৃশ্য।

ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে থাকা ফুল বিক্রেতারা---যাঁদের দিনের আয় নির্ভর করে সেই ফুল বিক্রির উপর---তাঁরা নিজেদের কাপড়ে বাঁধা ফুলের গাঁট্টি খুলে একের পর এক নীচে ছুঁড়ে দিতে শুরু করলেন। রাশি রাশি গাঁদা, রজনীগন্ধা, জুঁই আর গোলাপ ঝরে পড়তে লাগল উত্তমকুমারের মরদেহ বহনকারী লরির উপর।

"সেই ফুল শুধু ফুল ছিল না। সেগুলো ছিল একজন গরিব মানুষের শ্রদ্ধা।
সেগুলো ছিল একদিনের রোজগার বিসর্জন দিয়ে প্রিয় মানুষটিকে শেষ প্রণাম।
সেগুলো ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কান্না।"

মুহূর্তের মধ্যে লরির উপর ফুলের এমন আস্তরণ তৈরি হল, যেন মহানায়ককে বাঙালি তার ভালোবাসার বিছানায় শুইয়ে বিদায় জানাচ্ছে।

জনপ্রিয়তা বনাম হৃদয়ের সদস্য

সেদিন বুঝেছিলাম, জনপ্রিয়তা আর ভালোবাসা এক জিনিস নয়।

জনপ্রিয় মানুষ অনেকেই হন, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের সদস্য হতে পারেন খুব কমজন। উত্তমকুমার ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন। তিনি শুধু সিনেমার নায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির পরিবারের একজন। কারও দাদা, কারও বন্ধু, কারও স্বপ্ন, কারও ভালোবাসা।

তাঁর মৃত্যুতে মানুষ কাঁদেনি একজন অভিনেতার জন্য; মানুষ কেঁদেছিল নিজের ঘরের একজন মানুষকে হারিয়ে।

আজ এত বছর পরেও যখন সেই দিনের কথা মনে পড়ে, তখন মনে হয়--- একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনও পদক নয়, কোনও সম্মান নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মানুষের হৃদয়ে এমন একটি স্থান তৈরি করা, যেখানে মৃত্যুও তাঁকে মুছে দিতে পারে না।

আর সেই কারণেই, উত্তমকুমার আজও শুধু মহানায়ক নন, তিনি বাঙালির আবেগের অন্য নাম।

উত্তম কুমার আজও বেঁচে আছেন লক্ষ লক্ষ মানুষের স্মৃতিতে, ভালোবাসায় আর অশ্রুসজলে।


কাঞ্চন চক্রবর্তী