অধিকার নাকি নিরাপত্তা

অহংকার ও তথাকথিত সমাধিকারের লড়াই

আমি চিরকালই বাসে বা ট্রেনে মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত সিটের ঘোর বিরোধী ছিলাম। আমার যুক্তি ছিল খুব সরল—নারীরা যখন সব ক্ষেত্রে পুরুষদের সমান অধিকার বা সমাধিকার দাবি করে, তখন আবার গণপরিবহনে আলাদা করে কেন সংরক্ষিত আসন বা কামরা চাইবে?

একদিন এক লোকাল বাসে ফাঁকা পেয়ে আমি মেয়েদের একটি সংরক্ষিত সিটে বসে পড়েছিলাম। একটু পরেই বাসে ভিড় বাড়ে এবং পাশে এসে দাঁড়ানো এক নারী আমতা আমতা করে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "এটা তো মহিলাদের সিট। আপনি পুরুষ হয়ে..."

তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই আমি চড়া গলায় বলে উঠেছিলাম, "আপনারা মেয়েরা পেয়েছেনটা কী? সমাধিকারের জন্য চেঁচামেচি করবেন, আবার ট্রেন-বাসে সংরক্ষিত সিট চাইবেন, কামরা চাইবেন—এটা তো হয় না! সমাধিকার যখন চাচ্ছেন, তখন আমাদের ছেলেদের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে শিখুন। সংরক্ষিত সিটের কথা জীবনে মুখে উচ্চারণ করবেন না।" বাসের অন্যান্য পুরুষেরা আমার কথায় সায় দেওয়ায় সেই নারী বিষণ্ণ মুখে চুপ হয়ে যান। এরপর থেকে আমি নিয়ম করে মহিলাদের সিট ফাঁকা পেলেই বসে পড়তাম এবং কোনো নারী প্রতিবাদ করলে এই একই যুক্তি দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দিতাম।

বাস্তবতার মুখোমুখি: এক নির্মম সত্যের উন্মোচন

দিন বদলে যায়। একদিন আমি আমার স্ত্রী এবং চার বছরের ছোট ছেলেকে নিয়ে একটি প্রচণ্ড ভিড় লোকাল বাসে করে কোথাও যাচ্ছিলাম। বাসে তিল ধারণের জায়গা নেই। ছেলেকে কোলে নিয়ে আমি কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছি, আর আমার পাশেই ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে আমার স্ত্রী।

মহিলাদের সংরক্ষিত সিটগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার স্ত্রী বিরক্ত হয়ে বলল, "ব্যাটা ছেলেরা কোন আক্কেলে মেয়েদের সিটে বসে বুঝি না।" নিজের অতীতের আচরণের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় আমি আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম, যেন তার কথা শুনতেই পাইনি। কিন্তু স্ত্রী নাছোড়বান্দা। সে আমাকে বলল, "পুরুষগুলোকে মহিলাদের সিট থেকে উঠে যেতে বলো। ওরা উঠলে আমরা দাঁড়িয়ে থাকা মহিলারা বসতে পারব। এই সিটগুলো তো আমাদের জন্যই রাখা হয়েছে।"

যে আমি সারাজীবন মহিলাদের সিটে বসেছি, সে কীভাবে অন্য পুরুষদের উঠে যেতে বলি? তাই চাপা ধমকের গলায় স্ত্রীকে বললাম, "চুপ থাকো। আমি যেভাবে দাঁড়িয়ে আছি, সেভাবে দাঁড়িয়ে থাকো।"

আমার স্ত্রী পাল্টা জবাব দিল, "আমি আর তুমি এক হলাম? সমাধিকারের কথা যখন বলো তখন তো ছেলে-মেয়ে একই ভাবো। তাহলে এখন সমস্যা কেন হচ্ছে? কেন তোমাদের ট্রেন-বাসে সংরক্ষিত সিট বা কামরা লাগবে? আমাদের পুরুষদের তো সংরক্ষিত সিট বা কামরা লাগে না?"

স্ত্রী সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "টেনে বাসে মেয়েদের জন্য কেন সংরক্ষিত সিট বা কামরা লাগবে জানতে চাও?"
আমি কৌতূহল নিয়ে বললাম, "হ্যাঁ চাই।"
সে বলল, "তাহলে একটু অপেক্ষা করো। নিজেই দেখতে পাবে।"

ভিড়ের আড়ালের অন্ধকার রূপ

কিছুক্ষণ পর আমার স্ত্রী অত্যন্ত নিচু স্বরে, ফিসফিস করে বলল, "আমার পেছনে যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, সে এই পর্যন্ত তিনবার আমার পিঠে আর কোমরে হাত দিয়েছে।"

কথাটা শুনে আমার পুরো শরীর চমকে উঠল। রাগে রক্ত মাথায় চড়ে গেল। আমি পেছনের লোকটার দিকে তাকিয়ে তীব্র কণ্ঠে বললাম, "সরে দাঁড়ান! দেখতে পাচ্ছেন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে?" লোকটা বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে উল্টো জবাব দিল, "সরে দাঁড়াবোটা কোথায়? বাসের কোথাও জায়গা আছে? কথা কম বলেন, সরে দাঁড়ান। আমিও তো দাঁড়িয়ে আছি। কই আমি তো পাশের মহিলার গায়ে টাচ করছি না!" শেষ পর্যন্ত লোকটা অনিচ্ছায় একটু সরে দাঁড়াল।

কিন্তু নরকযন্ত্রণা সেখানেই শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর স্ত্রী আবার বলল, "আমার বাঁ দিকে যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, সে চারবার আমার উরুতে হাত দিয়েছে।" আবারো ক্ষোভে ফেটে পড়ে আমি সেই লোকটাকে রুক্ষ স্বরে বললাম, "আমার স্ত্রীর শরীরের সাথে লেগে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? সরে দাঁড়ান।" লোকটা গজগজ করে বলল, "ভিড়ের বাসে হালকা পাতলা শরীরের সাথে স্পর্শ লাগবেই। এটা আটকানো যাবে না। আর স্ত্রীকে নিয়ে যদি এতোই সমস্যা হয়, তাহলে প্রাইভেট কারে করে যাতায়াত করেন। বাসে উঠেছেন কেন?"

এরপর বাসের ভিড় থেকে আরও এক ব্যক্তি নামার সময় কৌশলে আমার স্ত্রীর নিতম্বে হাত দিয়ে নেমে গেল। আমি তাকে 'শুয়োরের বাচ্চা' বলে ধরার চেষ্টা করেও পারলাম না, কারণ ততক্ষণে বাস ছেড়ে দিয়েছে।

উপলব্ধি এবং নতুন দিগন্ত

আমার অসহায়ত্ব দেখে স্ত্রী তখন বলল, "তুমি কয়জনকে আটকাবে? ভিড়ের মধ্যে এমন অনেক অসভ্য পুরুষ ওঁত পেতে থাকে মহিলাদের যৌন হয়রানি করার জন্য। এইসব অসভ্যদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই ট্রেনে বাসে মহিলাদের সংরক্ষিত সিট আর কামরা থাকা দরকার। এবার কি বুঝতে পেরেছো?"

আমি হতভম্ব হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। গণপরিবহনে নারীরা প্রতিদিন কী পরিমাণ হেনস্তা ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়, তা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। স্ত্রী এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "এখন কি দয়া করে ঐ পুরুষদের বলবে মহিলাদের সিট থেকে উঠে যেতে? নাকি আমি নিজে বলবো?"

আমি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মহিলাদের সিটে বসে থাকা পুরুষদের উঠে যাওয়ার জন্য বললাম। কিন্তু তারা আমাকেই আমার পুরনো 'সমাধিকারের' যুক্তি শোনাতে লাগল। এবার আমার স্ত্রী তেড়ে এসে বাসের সবার সামনে গর্জে উঠল। সে জানাল, এতটুকু সময়ের মধ্যে কতজন পুরুষ তার শরীরে নোংরাভাবে হাত দিয়েছে। গণপরিবহনে এই যৌন নিপীড়ন মেয়েদের উন্নতির পথে কত বড় বাধা, তা সে বুঝিয়ে দিল। সে চিৎকার করে বলল:

"দেখুন, দাঁড়িয়ে থাকতে আমাদের মেয়েদের কোনো আপত্তি নেই। সংরক্ষিত সিট কিংবা কামরা—এগুলো আমরা বসার আরামের জন্য চাচ্ছি না। এগুলো আমরা চাচ্ছি শুধুমাত্র নিরাপত্তার জন্য।"

স্ত্রীর এই জোরালো বক্তব্য বাসের অন্য দাঁড়িয়ে থাকা নারীরাও সমর্থন করলেন এবং সমস্বরে পুরুষদের সিট ছাড়তে বাধ্য করলেন। অবশেষে পুরুষেরা উঠে গেলে নারীরা সেখানে বসার সুযোগ পান।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

আমার স্ত্রী সিটে বসে ছেলেকে তার কাছে চাইল, "ছেলেকে আমার কাছে দাও।"
আমি শক্ত গলায় উত্তর দিলাম, "মহিলাদের সিটে ছেলেকে বসানোর দরকার নেই।"
স্ত্রী অবাক হয়ে বলল, "ও তো এখনো ছোট। আর ও আমার কোলেই থাকবে।"

আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটি উপলব্ধি করে বললাম:

"না। যে ভুল সারাজীবন আমি করেছি, সেই ভুল ছেলেকে করতে দেবো ঘন। ছেলেকে এখন থেকেই শেখাবো মেয়েদের সংরক্ষিত সিটে বসতে নেই। আরো শেখাবো মেয়েদের সম্মান করতে। যাতে কখনো ভিড়ের সুযোগ নিয়ে সে কোনো মেয়ের সাথে অসভ্যতা না করে।"

আমার কথা শুনে স্ত্রীর চোখে-মুখে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। মাকে হাসতে দেখে আমাদের চার বছরের ছেলেও হেসে দিল। আমি পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে মনে মনে বললাম—"পুরুষ নয়, মানুষ হও বাবা। এই দোয়া করি।"

সংগৃহীত