কাউকে কষ্ট দিয়ে সুখী হওয়া যায় না

“চোখের জলে কেন অভিশাপ লাগে?”—এই প্রশ্নটার উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের আবেগের সবচেয়ে গভীর স্তরে। কারণ, সব কান্না শুধু সাধারণ দুঃখের জন্য ঝরে না; কিছু কান্না ঝরে ভাঙা বিশ্বাসের জন্য, তীব্র অপমানের জন্য আর নির্মম অবহেলার জন্য। মানুষের বুক ভরা কষ্ট যখন কোনো ভাষায় বা মুখে প্রকাশ পায় না, তখন সেই বোবা কষ্টটাই চোখের জল হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। যে মানুষটা প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে তিল তিল করে মরছে, কিন্তু লোকলজ্জা বা সম্মানের ভয়ে কাউকে কিছু বলছে না, তার চোখের জল নিঃশব্দ হলেও বড্ড ভারী হয়। সেই কান্নার মধ্যে জমে থাকে হাজারটা না বলা কথা, হাজারটা রাতের যন্ত্রণাদায়ক একাকীত্ব আর হাজারটা অপূর্ণ প্রত্যাশা। মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, দীর্ঘদিনের চাপা কষ্ট মানুষের ভেতরে এক ধরনের নেতিবাচক শক্তি বা নেগেটিভ এনার্জি তৈরি করে। যখন কেউ অন্যায়ভাবে কাউকে কাঁদায়, দিনের পর দিন প্রতারণা করে কিংবা কারও পবিত্র অনুভূতি নিয়ে খেলা করে—তখন ভুক্তভোগীর মনের গভীর হতাশা আর যন্ত্রণা একটা অদৃশ্য “অভিশাপের অনুভূতি” তৈরি করে। এটা কোনো অলৌকিক জাদু নয়, এটা হলো একটা ভাঙা আত্মার চরম আর্তনাদ।

আপনি একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন, চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছে যারা অন্য কাউকে তীব্র কষ্ট দিয়ে সাময়িকভাবে খুব ভালো বা সুখে থাকে। কিন্তু সময়ের চাকা ঘোরার সাথে সাথে তাদের জীবনে এক সময় অদ্ভুত সব অশান্তি ও বিপর্যয় নেমে আসে। কারণ, এই প্রকৃতি বা পৃথিবী সবসময় মানুষের ‘কর্মফল’ সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেয়। তাই কখনো কারও চোখের জলকে তার দুর্বলতা ভেবে ভুল করবেন না। কারণ যে মানুষটা চুপচাপ একা একা কাঁদে, সে হয়তো আপনার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধ নিতে জানে না বা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না; কিন্তু তার সেই নীরব কষ্টটা সরাসরি আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো—মানুষের মুখের রাগান্বিত অভিশাপের চেয়ে, বুক ভরা নীরব কষ্টের অভিশাপ অনেক বেশি গভীর এবং মারাত্মক হয়। কারণ মুখ তো শুধু রাগের মাথায় সাময়িক কথা বলে, কিন্তু চোখের জল সরাসরি মানুষের আত্মা থেকে নিংড়ে বের হয়। তাই কাউকে কখনো এমন নিষ্ঠুরভাবে ভেঙে দিও না, যেন সে মাঝরাতে বালিশ ভিজিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুধু একটা কথাই বলে—“আমি তো জীবনে কাউকে এতটা কষ্ট দিইনি, তবে আমার সাথে কেন এমন হলো?” মনে রেখো, মনের উদারতায় ক্ষমা হয়তো সবাই করতে পারে, কিন্তু অতীতকে ভুলে যেতে সবাই পারে না। আর কিছু অভাগা মানুষের চোখের জল এমন থাকে, যেগুলো এক সময় চোখ থেকে শুকিয়ে গেলেও তার অদৃশ্য অভিশাপ আজীবন থেকে যায় অপরাধী মানুষের বিবেকে, তার ভাগ্যে আর জীবনের প্রতি মুহূর্তের নিঃশব্দ অশান্তিতে।

সংগৃহীত