সম্রাটের আলেয়া
"সমাজে ঘুরে বেড়ানো হাজার হাজার সম্রাটের আলেয়ার মতো মিথ্যে প্রতিশ্রুতির গহন ফাঁদে হয়তো এভাবেই অনেক সাথীর জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে..." 🚂💔
ট্রেন ধরতে তাড়াতাড়ি করে স্টেশনে উঠে থমকে গেলো সাথী। রোজই স্কুল শেষে পা চালিয়ে স্টেশনে এসে ট্রেন ধরতে একটু দৌড়াদৌড়ি হলেও আজ যেন একটু তার মস্তিস্ক তার চলনশক্তিকে শিথিল করে দিয়েছে। চোখের সামনে দিয়ে ট্রেনটা বেরিয়ে গেলেও আজ তার পা থমকে গেছে।
গত পনেরো বছর ধরে যেন তার সময় কোথাও একটা গিয়ে যেন থেমে রয়েছিল এতকাল। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগেও কোথায় যেন হারিয়ে গেছিলো তার প্রাণের মানুষটা। সে যে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে তার ঠিক উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে তখন বসে একমনে ফোন দেখে যাচ্ছে বছর আটত্রিশের এক ভদ্রলোক। লোকটি আর কেউ না, বছর পনেরো আগে হারিয়ে যাওয়া সাথীর প্রাণের মানুষ, সম্রাট। কলেজে পড়ার সময় সামাজিক মাধ্যমে আলাপ সম্রাটের সাথে সাথীর। গিটার বাজানো ছবি দেখে প্রাথমিক ভালোলাগা আর তারপর হাই, হ্যালো, নিয়মিত কথা হওয়া থেকে একে ওপরের জন্যে সারাজীবন থাকার প্রতিশ্রুতি থেকে শেষে হঠাৎ করেই বিচ্ছিন্নতা এবং এক অন্তহীন অপেক্ষা। সাথী অনেক খুঁজেছিলো, অনেকভাবে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে খুঁজে পায়নি। কিন্তু কেন? অনেক কিছুর প্রশ্নর উত্তর তার অজানা। কম বয়সের অপরিপক্কতায় নেওয়া হয়নি ফোন নাম্বার, জানা হয়নি ঠিকানা। শুধু মনের কথার আদান প্রদানের মাঝেই যেন সে সব ভুলে গেছিলো।
পরবর্তী সময়ে যখন সে এই সমস্ত কথা মনে করেছে তার নিজেকে মস্তিস্কহীন ছাড়া কিছুই মনে হয়নি। তবু তার জীবনপথ যেন স্থির রয়ে গেছে কোনো এক অন্তহীন অপেক্ষায়। কিন্তু তার দেওয়া শেষ কথা "আমি কোনোদিন তোমায় ছেড়ে যাবোনা" সে ভোলেনি। তাই আজও সে অবিবাহিত। কোনো সম্পর্কে জড়ায়নি আর বিয়েও করেনি।
এতো বছর পরে কেন সে আবার নিজেকে হারিয়ে ফেলছে? কেন সেই পুরোনো ছেঁড়া সুতোগুলো এক অদম্য ইচ্ছে তৈরী করছে নতুন করে জোড়া লাগবার? আবারো অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের কথা উপেক্ষা করেই সেই ধীরে ধীরে পা বাড়ায় উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মের দিকে যেখানে বসে আছে তার এককালের স্বপ্নের মানুষটা। কিছুটা কম্পিত পায়েই সে উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে সম্রাটের থেকে কিছুটা দূরে থমকে দাঁড়িয়ে থাকে। সম্রাট ফোন দেখতে দেখতে একবার মুখ তুলে চারদিকে দেখতে গিয়ে তার দিকে তাকিয়ে চিনেও যেন চিনে নিতে পারলোনা। এতটা ভুলে মানুষ কিভাবে যেতে পারে? সে কি তাহলে ভুল মানুষকে দেখছে? এবার সে কাছে এগিয়ে যায়।
- এক্সকিউস মি।
- (মুখ তুলে) ইয়েস!
- কেমন আছেন মিস্টার সম্রাট? আমাকে চিনতে পারছেন?
সম্রাট খুব ভালো করে একবার মুখের দিকে তাকালো সাথীর। তারপর সে বললো-
- না ঠিক চিনলাম না।
- সাথীকে মনে পড়ছে? আজ থেকে পনেরো বছর আগে। ফেসবুক?
- (খানিকটা চোখ কুঁচকে) উমমম। ঠিক মনে পড়ছেনা।
- সব ভুলে গেলে? সব? কীভাবে? আর আমি তোমাকে দেওয়া কথাগুলো, স্মৃতি আঁকড়ে ধরে পনেরোটা বছর অপেক্ষা করছি!
ইতিমধ্যে ট্রেনের ঘোষণাও হয়ে যায়। এইবার সম্রাট নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে সাথীকে স্টেশনের একটু সাইডে নিয়ে আসে। সাইডে এসে সম্রাট বলে-
- হ্যাঁ মনে পড়েছে। সিন ক্রিয়েট করোনা। আর লিসেন আমি সম্রাট নই।
- মানে?
- আমি সম্রাট নই। আমার আসল নাম অন্য কিছু। কলেজে পড়ার সময় একটু মজা করার জন্যে ফেক আইডি বানিয়ে কয়েকটা মেয়ের সাথে আলাপ জমাতাম। তার মধ্যে তুমিও ছিলে একজন। ওটা মজা ছিল। যা হয়েছে বহু বছর আগে। ভুলে যাও। ওসব কথা এখন বলে লাভ নেই। কম বয়সের দোষ ওটা।
- পাশে থাকার কথা, একসাথে সারাজীবন চলার কথা মজা ছিলো? আমার অনুভূতি, আমার তোমাকে জড়িয়ে স্মৃতি, আমার পনেরোটা বছর.. সব.. সব মজা ছিল?
- হ্যাঁ কম বয়সে ওরকম একটু হয় সবারই। তোমার সাথে আমার দেখা, ফোন নাম্বার এক্সচেঞ্জ কোনোটাই হয়নি। অতএব এসব কথা এখন ভুলে যাও।
- ভুলে যাবো? আমাকে দেওয়া এতগুলো কথা... সব তাহলে মিথ্যে, ছলনা? এমনকি নামটাও? তোমার আসল নাম তাহলে কি?
- নাম জেনে করবে কি এখন? আর আমি এখন বিবাহিত, আমার মেয়ে আছে। এসব কথা আর বলবেনা আর আমার সাথে এভাবে রাস্তায় কথা বলবেনা।
বলেই সাথীর কিছু বলার আগেই স্টেশন থেকে ছাড়তে চলা চলন্ত ট্রেনে দ্রুত উঠে মিলিয়ে গেলো সম্রাট। খানিকটা অসহায়ের মতন আবার পনেরো বছর আগের পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে সাথী। সে যাকে ভালোবাসতো তার পরিচয়, তার দেওয়া প্রত্যেকটা মিথ্যে কথাকে সে সত্যি বলে এতো বছর ধরে লালন পালন করে এসেছে নিজের মধ্যে। সব হারিয়েও ভেবেছে যদি মানুষটা ফিরে আসে। নিজের মূল্যবান পনেরো বছর নষ্ট করে সে অপেক্ষা করেছে।
সমাজে ঘুরে বেড়ানো হাজার হাজার সম্রাটের আলেয়ার মতো মিথ্যে প্রতিশ্রুতির গহন ফাঁদে হয়তো এভাবেই অনেক সাথীর জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কে জানে? সম্রাটরা কোনোদিন ভালোবাসতে জানেনা, জানেনা আগলে রাখতে। শুধু তাঁদের কথার ফাঁদে আটকে থাকা পাখির মতন ছটফট করতে থাকে সাথীরা। দূরে মিলিয়ে যাওয়া ট্রেনের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে সাথী বলে ওঠে-
"ভগবানের কাছে প্রার্থনা করিনা, কিন্তু তোমার মেয়ের কপালেও যেন তোমার মতন একজন সম্রাট জুটুক। কারণ মানুষ নিজের নাহলে কোনোদিন অন্যের অনুভূতি বুঝতে পারেনা।"
সংগৃহীত