সম্মানহীন সংসারে ভালোবাসা

⏳ অধ্যায় ১: ছকে বাঁধা জীবনের অহংকার

আফতাব সাহেবের কাছে সংসার মানেই ছিল একটা ছকে বাঁধা, নিয়মতান্ত্রিক রুটিন। প্রতিদিন সকাল ঠিক আটটায় ডাইনিং টেবিলে ধোঁয়া ওঠা কফি, নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা শার্ট আর পরিপাটি করে গোছানো একটা চার কোণো স্টিলের টিফিন ক্যারিয়ার। গত দশ বছর ধরে তানিয়া এই কাজটা ঘড়ির কাঁটার মতো নির্ভুলভাবে করে আসছে। এই দশ বছরে কত ঋতু বদলাল, শহরের রাস্তাঘাট বদলাল, কিন্তু আফতাব সাহেবের সকালের এই চেনা চিত্রে কোনো হেরফের হয়নি। আর এই প্রতিদিনের রুটিনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল সেই টিফিন বক্সের ঢাকনা খুললেই ভেতরে পাওয়া যাওয়া চার ভাঁজ করা ছোট একটা কাগজের চিরকুট।

আফতাব সাহেব কোনোদিন সেই চিরকুটগুলো পড়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। তাঁর পুরুষতান্ত্রিক অহংকার আর যান্ত্রিক মানসিকতার কাছে এগুলো ছিল নেহাতই মধ্যবিত্ত আবেগের আদিখ্যেতা ও ন্যাকামি। অফিসের ডেস্কে বসে দুপুরের লাঞ্চের সময় বক্সটা খুলেই তিনি চিরকুটটা না পড়ে, অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে দিতেন পাশের প্লাস্টিকের ডাস্টবিনে। সহকর্মীরা মাঝে মাঝে টিফিন বক্স থেকে চিরকুট বেরোতে দেখে হাসাহাসি করলে তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলতেন, "আরে ধুর! বিয়ে হয়েছে দশ বছর হয়ে গেল, এখনো ওসব সস্তা রোমান্টিকতার ভূত মাথা থেকে গেল না। মেয়েমানুষের মাথায় বুদ্ধি একটু কমই থাকে।"

🤒 অধ্যায় ২: এক অদ্ভুত দুপুর ও জমানো ক্ষতের সন্ধান

কিন্তু নিয়তির খেলা বড় অদ্ভুত। আজ সকাল থেকেই আফতাব সাহেবের শরীরটা ভীষণ ম্যাজম্যাজ করছিল। দুপুরের দিকে থার্মোমিটারের পারদ ১০৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেল। প্রবল জ্বরের ঘোরে কাঁপতে কাঁপতে তিনি আর অফিসে যেতে পারেননি। তানিয়া সবসময় যেমনটা করে—অত্যন্ত শান্ত মুখে তাকে ওষুধ দিল, পরম যত্নে কপালে জলপট্টি দিয়ে দিল। ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় শুয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে তিনি ঝিমুচ্ছিলেন। তানিয়া তখন হয়তো রান্নাঘরে দুপুরের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত ছিল, কিংবা ঘর গোছাচ্ছিল।

দুপুরের দিকে তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল আফতাব সাহেবের। গলাটা শুকিয়ে কাঠ। টলমল পায়ে, দেওয়াল ধরে ধরে কিচেনের দিকে যাওয়ার সময় ডাইনিং রুমের কোণে থাকা ডাস্টবিনটার দিকে হঠাৎ তাঁর নজর পড়ল। গতকালকের টিফিন বক্সটা তিনি অফিস থেকে ফেরত এনেছিলেন ঠিকই, কিন্তু গতকালকের চিরকুটটা অফিসের ডাস্টবিনে না পড়ে ভুলে ব্যাগের এক কোণায় রয়ে গিয়েছিল, যা আজ সকালে তানিয়া ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। মনের কোনো এক গহীন কোণে হঠাৎ তীব্র ও অদ্ভুত এক কৌতূহল জাগল তাঁর। গত দশ বছরে যে কাগজগুলোকে তিনি আবর্জনা ভেবেছেন, আজ এই জ্বরের ঘোরে কেন যেন মনে হলো—তানিয়া আসলে কী লেখে ওসব চিরকুটে? একটু দেখা যাক না!

কাঁপাকাঁপা হাতে ডাস্টবিনের ময়লা সরিয়ে গতকালকের চিরকুটটা কুড়িয়ে নিলেন আফতাব সাহেব। হলদেটে কাগজের ভাঁজ খুলতেই তাঁর দুই ভ্রু কুঁচকে গেল। সেখানে কোনো রোমান্টিক কবিতা ছিল না, ছিল না কোনো "ভালো থেকো" বা "তোমাকে ভালোবাসি"র মতো আবেগঘন কথা। চিরকুটে নীল কালিতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিল শুধু একটা তারিখ এবং একটি বাক্য:

"১৫ই আগস্ট, ২০১৭। আজ তুমি আমার বাবার পেশা আর আমাদের মধ্যবিত্ত অবস্থা নিয়ে তোমার বন্ধুদের সামনে আমাকে চরম উপহাস করেছো।"

📜 অধ্যায় ৩: অপমানের এক দীর্ঘ মহাফেজখানা

আফতাব সাহেবের বুকের ভেতরটা যেন আচমকা ধক করে উঠল। গায়ের জ্বর নিমেষে উধাও হয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া বেয়ে। কৌতূহল এবার আতঙ্কে রূপ নিল। তিনি পাগলের মতো ডাস্টবিনের নিচে চাপা পড়ে থাকা গত কয়েকদিনের আরও কিছু চিরকুট খুঁজতে শুরু করলেন। আবর্জনার স্তূপ ঘেঁটে একে একে তিনি বেশ কয়েকটি চিরকুট বের করলেন এবং কাঁপতে কাঁপতে সেগুলোর ভাঁজ খুললেন:

১২ই মার্চ, ২০১৯: "আজ আমি মা হতে না পারার জন্য চিকিৎসকের রিপোর্টের তোয়াক্কা না করেই আমাকে 'বন্ধ্যা' বলে বাড়ির সবার সামনে গালি দিয়েছ।"

৪ঠা জানুয়ারি, ২০২২: "তুমি হয়তো ভুলে গেছো, কিন্তু আজ আমার জন্মদিনে তুমি আমাকে সজোরে চড় মেরেছিলে, কারণ তাড়াহুড়ো করে রান্না করা তরকারিতে নুন সামান্য কম ছিল।"

২৮শে নভেম্বর, ২০২৪: "আজ তোমার প্রমোশনের পার্টিতে আমার পোশাক আধুনিক নয় বলে তুমি আমাকে কাজের লোকের মতো আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছিলে।"

প্রতিটি কাগজে কোনো ভালোবাসা ছিল না; বরং গত দশ বছরের একেকটি নির্মম অবহেলা, মানসিক নির্যাতন আর অপমানের ক্ষত খোদাই করা ছিল। আফতাব সাহেব স্তম্ভিত হয়ে দুপুরের সেই নিস্তব্ধ মেঝেতে বসে পড়লেন। তিনি কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেননি, যে চিরকুটগুলোকে তিনি তুচ্ছ ও সস্তা মনে করে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন, সেগুলো আসলে কোনো প্রেমপত্র ছিল না—সেগুলো ছিল তানিয়ার বুকে জমানো বিষ আর কান্নার একেকটি bloody দলিল। সে প্রতিদিন তার অপমানের হিসাব লিখে রাখত, এই আশায় যে কোনো একদিন হয়তো আফতাব সাহেব সেই কাগজটা খুলে নিজের ভুল বুঝতে পারবেন। কিন্তু আফতাব সাহেব তো কোনোদিন তা খুলেই দেখেননি!

🚪 অধ্যায় ৪: শেষ চিরকুট এবং একটি খাঁ খাঁ শূন্যতা

সবশেষে ডাস্টবিনের একবারে ওপরে তাঁর হাতে এল আজকের তারিখ লেখা একদম তাজা চিরকুটটি। টিফিন বক্স গোছানোর সময় তানিয়া হয়তো সকালেই এটি লিখে রেখেছিল। ভারী কাঁপা হাতে সেই শেষ কাগজের টুকরোটি মেললেন আফতাব সাহেব। সেখানে লেখা ছিল:

"আজকের তারিখটি আমার মুক্তির দিন। দশ বছরে ৩,৬১০টি চিরকুট লেখার কথা ছিল, কিন্তু তোমার অবহেলায় অনেকগুলো লেখা হয়নি। তবে আজকেরটিই শেষ। আলমারির সব গয়না আর টাকা ওখানেই আছে, আমি ওসবের লোভ কোনোদিন করিনি। আমি শুধু দশ বছর পর আমার হারিয়ে যাওয়া নিজের সম্মানটুকু সাথে নিয়ে যাচ্ছি।"

পড়ার সাথে সাথে আফতাব সাহেব হন্তদন্ত হয়ে ড্রয়িংরুমে ছুটে এলেন। "তানিয়া! তানিয়া!" বলে সমস্ত ঘর কাঁপিয়ে চিৎকার করলেন তিনি। কিন্তু বিশাল, পরিপাটি ফ্ল্যাটটা তখন খাঁ খাঁ করছে। এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা গ্রাস করেছে চারপাশকে। শোবার ঘরের আলমারিটা হা করে খোলা, তানিয়ার একটা কাপড়ও সেখানে নেই। ড্রয়িংরুমের প্রতিটি আসবাবপত্র যেন স্তব্ধ হয়ে তাকে ব্যঙ্গ করছে。

হঠাৎ বাথরুমের দরজার সামনে নজর যেতেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। মেঝেতে সাদা সাবানটা পড়ে আছে। হয়তো শেষবার গোসল করে এই বাড়ি থেকে চিরকালের মতো বেরোনোর সময় তানিয়া তাড়াহুড়োয় ওটা ওভাবেই ফেলে রেখে গেছে। ঠিক যেভাবে গত দশটা বছর ধরে তার জীবনের প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি অধিকারকে আফতাব সাহেব চরম অযত্নে আর অবহেলায় ফেলে রেখেছিলেন।

শূন্য ঘরটায় দাঁড়িয়ে আফতাব সাহেবের মনে হলো, জ্বরটা এখন আর তাঁর শরীরে নেই, বরং তা সারা অস্তিত্বে ছড়িয়ে পড়েছে এক দীর্ঘস্থায়ী, জমাটবদ্ধ শীতলতা হয়ে। তানিয়া চলে গেছে, চিরকালের জন্য চলে গেছে। কিন্তু রেখে গেছে দশ বছরের অপমানের এক বিশাল, অদৃশ্য মহাফেজখানা। আফতাব সাহেব ডাস্টবিনের পাশে বসে সেই কাগজের টুকরোগুলো বুকে চেপে ধরলেন, কিন্তু তানিয়া তো আর কোনোদিন ফিরবে না...

...চলবে...

সংগৃহীত