শ্রীক্ষেত্র ধামের অলৌকিক লীলা
যখন পরম ভক্তের রূপে ফিরে এলেন মা যশোদা
বর্ষার স্যাঁতসেঁতে ভেজা হাওয়া আর সমুদ্রের উত্তাল গর্জন বুকে নিয়ে পুরীর সমুদ্রসৈকত তখন এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। পাথরের ওপর গুটিসুটি মেরে বসেছিলেন এক চাদর জড়ানো পথিক। গায়ে তাঁর প্রচণ্ড জ্বর, তপ্ত শরীরটা যেন অপার্থিব এক বেদনায় শিউরে উঠছে বারবার। চারিদিকে জমাট অন্ধকার, কেবল দূরের ঢেউয়ের মাথায় জোনাকির মতো এক ফালি আলো দপদপ করে জ্বলছে আর নিভছে। সেই রূপের দিকে তাকিয়ে তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন নিজের ভাবনায়। কতক্ষণ কেটেছে জানা নেই, হঠাৎ এক খড়মড় শব্দে তাঁর ধ্যান ভাঙল।
চোখ মেলে তিনি দেখলেন, ধুধু সৈকতে এক নোংরা, মলিন পোশাক পরা মেয়ে প্লাস্টিকের বোতল আর কাগজ কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে। মেয়েটি অবয়ব স্পষ্ট হতেই পরম পুরুষের সামনে এসে সে চমকে উঠল, ভয় পেয়ে দুই পা পিছিয়ে চেঁচিয়ে বলল— "কে গা তুমি!" পরক্ষণেই ভূতের ভয়ে দৌড়ে পালাতে গেল সে।
পথিক তাঁর শান্ত, গম্ভীর অথচ পরম আশ্বস্তকারী স্বরে ডাক দিলেন, "আমি ভূত নয় গো, ভয় পেয়ো না।" সেই কণ্ঠস্বরের ওজনে এক অদ্ভুত মায়া ছিল। মেয়েটি থমকে দাঁড়াল। কিন্তু তার চোখে তখনো অবিশ্বাস। সে তটস্থ গলায় বলল, "না গো ভূতের ভয় নয়। ভূতের চেয়ে মানুষ বড় ভয়ংকর। তুমি কে গো? কথা শুনে তো ভালো মানুষের ছানা বলেই মনে হচ্ছে। নেশা ভাঙ না করে যাও না বাড়ি।"
পথিক মনে মনে একটু হাসলেন, কৌতুকভরা গলায় বললেন, "আমি নেশাভাঙ করি না।"
পায়ে পায়ে এগিয়ে এল কাগজকুড়ানি মেয়েটি। কাঁধে তার একটা মস্ত বস্তা, তাতে ভরা কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিকের বোতল আর আবর্জনা। সে সন্দিগ্ধ চোখে পথিকের দিকে তাকিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল— "ও ছেলে তুমি কী সুইসাইড করতে এয়েছ না-কি!" বলেই কিছু বুঝে ওঠার আগে পথিকের হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিল সে। আর হাত ছোঁয়া মাত্রই মেয়েটি চমকে উঠল— "তোমার তো গা গরম গো খোকা!"
পথিক মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, "হ্যাঁ গো মা খুব জ্বর।"
মেয়েটি এবার ঝাঁজিয়ে উঠল, "আর এ অবস্থায় তুমি এখানে বসে আছ! জ্বর বাড়বে তো... এই পাতলা চাদরে হয়?"
পথিক ম্লান হেসে পরম অসহায়তায় বললেন, "আমার যে এ ছাড়া আর কিছু নেই।"
তাঁর নিরাভরণ, কালো অবয়বের দিকে khanik-ক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সেই নোংরা পোশাকের মেয়েটি। অবহেলা আর দারিদ্র্যের মাঝে লুকিয়ে থাকা এক মাতৃ হৃদয় যেন হঠাৎ জেগে উঠল তার ভেতর। সে জিজ্ঞেস করল, "সত্যিই নেই?" পথিক নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন।
তখনই ঘটল সেই অলৌকিক ঘটনা। মেয়েটি তার নোংরা বস্তার ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা প্লাস্টিকে মোড়ানো একেবারে নতুন চাদর বের করে আনল। সে পরম স্নেহে বলল, "আজ মন্দিরে স্নানযাত্রা ছিল না? একজনের মানসিক ছিল, অনেক চাদর বিলি করেছে আমি এইটা পেয়েছিলুম। এইটে নাও তুমি। নতুন চাদর গো, প্লাস্টিকের ভেতর একদম ভালো অবস্থায় আছে। এইটা খুলে গায়ে দিও। আর এখানে বসে না থেকে নিজের যত্ন নিও।"
কথা কটি বলেই, যেভাবে আচমকা এসেছিল, সেভাবেই অন্ধকারের বুকে মিলিয়ে গেল সেই অবহেলার পাত্রী, সমাজচ্যুত এক কাগজকুড়ানি।
কিন্তু সৈকতে বসে থাকা সেই পথিক স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর মুখে কোনো ভাষা সরল না। যে চাদরটি মেয়েটি দিয়ে গেছে, তা তো কোনো সাধারণ চাদর নয়, তা যেন সাক্ষাৎ মাতৃস্নেহের ওম। পরম মমতায় সেই নতুন চাদরের ওপরে হাত বোলাতে বোলাতে শ্রীক্ষেত্রের সেই নাথ ফিসফিস করে উঠলেন— "যসোদা... মা'য়েরও তবে পূর্ণজন্ম হল।"
তাঁর চোখ বেয়ে দু ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল সেই চাদরের ওপর। ঠিক তখনই যেন প্রকৃতির বুক চিরে ভীষণ শব্দে মেঘ গর্জন করে উঠল আকাশে, আর মুষলধারে বৃষ্টি নামল পুণ্যभूमि শ্রীক্ষেত্র ধামে। স্নানযাত্রার পর জ্বরে কাতর জগন্নাথ দেবের শ্রীঅঙ্গ যেন জুড়িয়ে গেল মায়ের দেওয়া চাদরের স্পর্শে।
দৃঢ় পদক্ষেপে মন্দিরের দিকে ফিরে চললেন তিনি। এতক্ষণ যে চোয়াল নরম ছিল, তা এখন শক্ত। মায়ের চোখে যে মানুষের প্রতি ভয়ের রূপ তিনি দেখেছেন, তা তাঁকে বিচলিত করেছে। জগৎসংসারে তাঁর যে এখনও অনেক কাজ বাকি। মা যশোদা তো আবার ফিরে এসেছেন এই মর্ত্যে, এবার তাঁরও যে কল্কি রূপে ফিরে আসার সময় হয়ে গেল!
জয় জগন্নাথ! 🙏
সংগৃহীত