শ্রীজগন্নাথ ও লক্ষ্মী দেবীর মানভঞ্জন
"অভিমানের মেঘ কেটে যখন অনুরাগের মিষ্টি সূর্য ওঠে, তখনই পূর্ণতা পায় ভালোবাসা।"
রথযাত্রার আনন্দ-উৎসব শেষে শ্রীমন্দিরে ফিরেছেন ত্রিভুবনের নাথ শ্রীজগন্নাথ। কিন্তু সিংহদুয়ারের সুবিশাল কাঠের দরজা আজ সশব্দে বন্ধ! দেবী লক্ষ্মীর মনে জমেছে নয় দিনের তীব্র বিরহ আর অভিমানের মেঘ। অর্ধাঙ্গিনীকে একা ফেলে বোন সুভদ্রা আর দাদা বলরামকে নিয়ে মাসির বাড়ি আনন্দভ্রমণে যাওয়া—এ অপরাধ কি সহজে ক্ষমা করা যায়?
শেষমেশ অপরাধীর মতো মাটির হাঁড়ি হাতে সুস্বাদু, রসে টইটম্বুর রসগোল্লা নিয়ে ভালোবাসার মান ভাঙাতে হাজির স্বয়ং প্রভু। ভালোবাসা, অভিমান এবং মিষ্টি সমর্পণের এক অপূর্ব মুহূর্ত। 🌸🍯
শ্রীক্ষেত্রের শ্রীমন্দিরের বড় দেউলের ভারী কাঠের দরজাগুচ্ছের ওপাশে তখন থমথমে নীরবতা। দীর্ঘ রথযাত্রার পরম আনন্দ-উৎসব শেষে গুণ্ডিচা ঘর থেকে ঘটা করে নিজ ধামে ফিরেছেন তিন ভাই-বোন—বলরাম, সুভদ্রা এবং জগন্নাথ দেব।
সিংহদুয়ারে পৌঁছানো মাত্রই সেবায়েত ও ভক্তদের জয়ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত হয়ে উঠেছিল। উৎসবের আমেজে আনন্দে সবার চোখ ভিজে উঠেছিল। বড়ভাই বলরাম যখন বিশাল কায়ায় পরম স্নেহে মন্দিরে পা বাড়ালেন, দেবী লক্ষ্মী স্বয়ং আদর ও পরম সম্মানের সঙ্গে রত্নবেদীর পথ উন্মুক্ত করে দিলেন। কোনো বাধা ছাড়াই সুভদ্রাও মৃদু হেসে ভেতরে প্রবেশ করলেন।
কিন্তু বিপদ বাধল ঠিক তখনই, যখন ত্রিভুবনের নাথ জগন্নাথ দেব বিজয়ের হাসি হেসে শ্রীমন্দিরের দেউলে পা বাড়াতে গেলেন।
মুহূর্তের মধ্যে সশব্দে বন্ধ হয়ে গেল শ্রীমন্দিরের সুবিশাল কাঠের দুয়ার! ওপাশ থেকে একলহমায় নেমে এল এক অগাধ, নির্মম নীরবতার দেয়াল。
ভাই-বোনকে সঙ্গে নিয়ে গুণ্ডিচা মন্দিরে পরম আনন্দে কটা দিন কাটিয়ে এলেন, কিন্তু নিজের ঘরণীকে একবারের জন্যও সঙ্গে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না! এ কি যে-সে অপরাধ? গৃহিণীকে গৃহে একা ফেলে রেখে স্বজনদের নিয়ে আনন্দভ্রমণ কি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়? বিরহ ও উপেক্ষার আগুনে জ্বলতে থাকা অভিমানী লক্ষ্মী দেবী তাই আজ সিংহদুয়ার সশব্দে বন্ধ করে গুমরে বসে আছেন শ্রীমন্দিরের গহীন অন্তঃপুরে।
সেবায়েতরা ভয় ও আশঙ্কায় পিছিয়ে এলেন। কিন্তু ভক্তদের এক ডাকে যিনি ছুটে আসেন, সমগ্র জগৎসংসারের গুরুভার যাঁর কাঁধে ন্যস্ত, তিনি এখন নিজের স্ত্রীর বন্ধ দুয়ারের সামনে অপরাধীর মতো বড় বড় গোল চোখ করে দাঁড়িয়ে আছেন! এক হাতে তাঁর মাটির হাঁড়ি, আর তাতে খইখই করছে পুরীর সুস্বাদু, রসে টইটম্বুর রসগোল্লা।
জগন্নাথ দরজার কাঠে আলতো করে কড়া নাড়লেন। কণ্ঠে ভালোবাসা, আকুলতা আর তোষামোদ নিয়ে বললেন,
— "ওগো, একটু দুয়ারটা খোলো না?"
ভেতর থেকে প্রথমে ভেসে এল একরাশ হিমশীতল নীরবতা।
দেবীর উত্তর না পেয়ে জগন্নাথ দেব আবারও বললেন,
— "দেবী... বড়দা আর সুভদ্রাকে তো বেশ সানন্দে ঢুকতে দিলে, কেবল আমাকেই এভাবে খোলা আকাশের নিচে পথে দাঁড় করিয়ে রাখবে?"
নীরবতা ভেঙে রত্নখচিত স্বর্ণালঙ্কারের মৃদু নূপুরধ্বনি আর রেশমি শাড়ির খসখস শব্দের সঙ্গে ভেসে এল দেবী লক্ষ্মীর তীক্ষ্ণ, সুরেলা কণ্ঠ।
— "বড়দা আর সুভদ্রা তো আমার ওপর কোনো অন্যায় করেননি, তারা আমার আপনজন, তাঁদের পথ আটকাব কোন অপরাধে?"
জগন্নাথ দেব মুচকি হেসে কপট রাগ দেখিয়ে বললেন,
— "আচ্ছা। তারা তোমার আপনজন আর বুঝি পর?"
ওপাশ থেকে দেবী কোনো উত্তর দিলেন না। জগন্নাথ দেব আবারও বললেন,
— "দেখো, শ্রী! তোমার জন্য পুরীর সবচেয়ে সুস্বাদু, সুবাসিত আর রসে টইটম্বুর মিষ্টি নিয়ে এসেছি!!"
— "মিষ্টি? এত কষ্ট করে মিষ্টি নিয়ে আসার কোনো প্রয়োজন ছিল না, প্রভু!"
— "আহা! রাগ করো না!"
— "গুণ্ডিচায় মাসির বাড়িতে ভাই-বোনের সঙ্গে তো বেশ রাজকীয় আনন্দে দিন কাটল! সেখানে তো এই অভাগী ঘরণীর কথা একবারের জন্যও মনে পড়েনি! বিরহে আমার দিন কীভাবে কাটছিল, সেই খোঁজ নেওয়ার সময় কি আপনার ছিল? আজ উৎসব শেষে গৃহে ফেরার পথ আটকেছি বলে মিষ্টির হাঁড়ি হাতে এত সাধু সাজা হচ্ছে?"
জগন্নাথ নিজের গোল গোল চোখ দুটো দুয়ারের সূক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে ভেতরের রূপটা দেখার ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। সেখানে বেগুনী রঙের মহার্ঘ বেনারসি শাড়িতে নিজেকে মুড়ে, মুখখানি গম্ভীর করে বসে আছেন তাঁর দেবী শ্রী। রূপোর প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় তাঁর সুকোমল গালে রক্তিম আভা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
— "আহা, অমন রাগ করছ কেন বলো তো, প্রিয়তমা?"
দুয়ারের কাঠের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন জগন্নাথ। তারপর মৃদু হেসে কণ্ঠে এক অপূর্ব সুর সঞ্চার করে বললেন,
— "বিশ্বসংসারের প্রতিটি অণু-পরমাণু জানে, লক্ষ্মী ছাড়া জগন্নাথ অসম্পূর্ণ, অর্থহীন। আমি তো ভক্তদের ব্যাকুল আকুতি আর ভালোবাসার প্রেমডোরে বাঁধা পড়ে গিয়েছিলাম গো! তাছাড়া তুমি যদি আমার সঙ্গে রথে চেপে চলে যেতে, তবে এই সুবিশাল শ্রীমন্দিরের নিত্যসেবা, দরিদ্রের অন্নসংস্থান আর রত্নভাণ্ডারের দেখভাল... এসব কে সামলাত বলো তো? তোমার এই অনুপস্থিতিই আমাকে পুরীর প্রতিটি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিয়েছে, তুমি আমার অস্তিত্বের কতটা গভীর জুড়ে আছ। তুমি ছাড়া তো আমি কেবলই এক প্রতিমা!"
দেবী লক্ষ্মী ঝটিতি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কিন্তু জগন্নাথের এমন আকুল প্রেমনিবেদনে ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা হাসির ক্ষীণ ঝিলিক আর বেশিক্ষণ চেপে রাখা গেল না। তবু গলার স্বর যথাসম্ভব কঠোর আর গম্ভীর করে বললেন,
— "এমন মিষ্টি মিষ্টি ছলাকলার কথা বলতে তো আপনার জুড়ি মেলা ভার! কিন্তু এই ছলনাসুধা দিয়ে এবার আর পার পাবেন না, নীলমাধব! আপনি ভাবছেন, কেবল দু-চারটি মিষ্টি কথা আর এক হাঁড়ি রসগোল্লায় আমার এই নয় দিনের বিরহযন্ত্রণা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে?"
জগন্নাথ আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। কৌশলে ভেজানো কাঠের ভারী দুয়ার আলতো হাতে ঠেলে ভেতরে পা রাখলেন। হাতে সেই মাটির হাঁড়ি, তাতে খইখই করছে ধবধবে সাদা, তাজা রসগোল্লার রস। তিনি নিঃশব্দে গিয়ে বসলেন মানিনী সোহাগী ঘরণীর ঠিক মুখোমুখি।
একটি গরম রসগোল্লা আলতো করে তুলে নিয়ে দেবী লক্ষ্মীর নরম ঠোঁটের কাছে পরম আদরে বাড়িয়ে ধরে বললেন,
— "যে পর্বতপ্রমাণ রাগ আর বিরহ আমার ওপর জমা করেছ, সে রাগ ভাঙানোর সাধ্য এই ত্রিভুবনের কোনো কিছুরই নেই, আমি খুব ভালো করেই জানি। তবে আমার মনে হয়, এই এক টুকরো মিষ্টিটা আর আমার অপরাধ স্বীকারের আন্তরিকতাই পারে আমার শ্রীর মনের অভিমানী মেঘ সরাতে। এবার নিজ হাতে তোমাকে মিষ্টি খাইয়ে এই বিরহ না ঘোচালে যে আমার নীলাদ্রি বিজয়ের সব পুণ্যই বৃথা হয়ে যাবে, প্রিয়তমা। দেখি, রাগ ভুলে একবার মুখটা হা করো তো..."
দেবী লক্ষ্মী এবার আর চোখ ফিরিয়ে রাখতে পারলেন না। জগন্নাথের সেই মায়ভরা, অপরাধীর মতো গোল চোখ দুটোর দিকে তাকাতেই তাঁর সব কৃত্রিম রাগ আর অভিমান নিমেষেই যেন গলে জল হয়ে গেল। এক অপূর্ব, নির্মল হাসি হেসে তিনি জগন্নাথের হাত থেকে রসগোল্লাটি নিজের মুখে তুলে নিলেন।
— "সবাই সত্যিই ঠিকই বলে! তবে কী জানেন তো... আপনি শুধু ননী-চোর নন, আপনি মানুষের মন আর ভালোবাসা চোর!"
মুখ টিপে হেসে দেবী অনুযোগের সুরে বলে উঠলেন।
জগন্নাথ তাঁর কোমল হাতটি পরম মমতায় নিজের হাতের মুঠোয় টেনে নিলেন। তারপর গভীর ভালোবাসায় বললেন,
— "সংসার, জীবন আর প্রেম... এই তিনটেই তো মিষ্টি ছাড়া একদম অসম্পূর্ণ, শ্রী! সাধে কি আর কবিরা বলেন, অভিমানে প্রেম আরও গাঢ় হয়! তুমি যদি এমন মধুর অভিমান না করতে, তবে কি আর এই মিষ্টি মানভঞ্জনের সুধা আমি আজ আস্বাদন করতে পারতাম?"
শ্রীমন্দিরের প্রদীপশিখা তখন মৃদু বাতাসে দুলছিল। চারদিকে ধূপের সুবাস আর রত্নবেদীর আলোয় ফুটে উঠল ত্রিভুবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রেমময় যুগলের এক চিরন্তন মাধুর্য।
যেখানে অভিমানের গভীরতা যত বেশি, অনুরাগের সমর্পণ ঠিক ততটাই মধুর, ততটাই পূর্ণ...
সংগৃহীত