শাশুড়ি মায়ের অলিখিত সংবিধান

সূচনা: নতুন বউয়ের রান্নাঘরে প্রথম পাঠ

নতুন বিয়ে হয়ে যখন শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলাম, তখন রান্নাবান্নার 'র' অক্ষরের সাথেও আমার ভালো পরিচয় ছিল না। আর এই আনাড়িপনা ঢাকতেই যেন পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আমার শাশুড়ি মা। তিনি হাত ধরে ধরে আমায় সব কাজ শেখাতে শুরু করলেন। মাঝে মাঝে হেসে খুন হয়ে বলতেন, “এই ইউটিউবের যুগের মেয়ে হয়েও রান্নাটা শিখতে পারলা না মা!”

লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে ঠোঁট টিপে হাসা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় থাকত না। কিন্তু তিনি পরম মমতায় অভয় দিয়ে বলতেন, “সমস্যা নাই, আস্তে আস্তে শিখে যাবা। আমিই তোমার ইউটিউব, রান্নার শিক্ষক। মাস শেষে বেতন দিও।” নতুন বাড়ির পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এই রসিকতা যেন ছিল এক জাদুকরী স্পর্শ। আমি বুঝতে পারছিলাম, তিনি আমার খুব কাছে আসতে চাইছেন, আমার মনে নিজের জায়গা করে নিতে চাইছেন এবং তাঁর বুকেও আমায় আগলে রাখছেন।


অতীত থেকে শেখা নতুন জীবনের পাঠ

আমার এই শাশুড়ি মা জীবনে অনেক কষ্ট করেছিলেন। বাপের বাড়িতে মেয়ে হিসেবে ছেলেদের তুলনায় ছোট হয়ে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। এমনকি বিয়ের পর নিজের শাশুড়িও তাঁকে সবসময় ছোট করে রাখতেন। কিন্তু তিনি নিজে সেই অন্ধকার চক্র ভেঙেছিলেন। যখন তাঁর নিজের শাশুড়ি শয্যাশায়ী হলেন, তিনি নিজে তাঁর সব সেবাযত্ন করেছিলেন। এমনকি বিছানায় মলমূত্র ত্যাগ করলে আমার শ্বশুরকে দিয়ে সেসব পরিষ্কার করিয়ে অভ্যস্ত করেছিলেন, নিজের মায়ের মর্যাদা বজায় রেখেছিলেন।

তিনি যখন নিজের সন্তান তথা আমার স্বামী ও ননদদের বড় করলেন, তখন বাড়ির পুরোনো সব নিয়ম ও বৈষম্য বদলে সম্পূর্ণ এক উল্টো নিয়ম চালু করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি আমার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “আমি তোমার উপর খুশি মা। আগের মানুষ তো, এসব শিক্ষা দীক্ষা কোনটাই আমার ছিল না। তুমি আমার চোখ খুলে দিছো মা। মরার আগে তোমার এসব দেখে মরতে পারতেছি এটাই শান্তি।”


সংসারের সেই অদ্ভুত ও সমতার "সংবিধান"

এই পরিবারে শাশুড়ি মায়ের তৈরি করা নিয়মগুলো সত্যিই ছিল অসাধারণ, যা আর দশটা সাধারণ বাড়িতে দেখা যায় না:


স্বাবলম্বী হওয়ার দীক্ষা ও মায়ের প্রস্থান

আমার শাশুড়ি মা সবসময় বলতেন, “আমি যেন কারো উপর নির্ভর না করে, কারো সহযোগিতা না নিয়ে জীবন পাড় করতে পারি!” ছেলেমেয়েরা সেবা করার সুযোগ না পেয়ে আফসোস করলে মা বলতেন, “মাকে খুশি করলেই জান্নাত পাবা। তোমাদের মা তখনই খুশি হবে যখন তোমরা সবাই নিজেরা নিজেদের দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করতে পারবা। কারোর উপর নির্ভরশীল না হবা।”

আল্লাহ তাঁর এই ইচ্ছে পূরণ করেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি একদিনের জন্যও বিছানায় পড়ে থাকেননি, কারো সেবার মুখাপেক্ষী হননি। পুরোপুরি সুস্থ অবস্থায় একদিন আসরের আজান হলে বাথরুমে গিয়ে অজু করে এলেন। নামাজ পড়বেন বলে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়াতে গিয়েই বললেন, শরীরটা দুর্বল লাগছে, মাথা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। বলতে বলতেই তিনি জায়নামাজে শুয়ে পড়লেন এবং সঙ্গে সঙ্গে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।


উপসংহার: প্রদীপের আলো জ্বলবে প্রজন্মান্তরে

মা মারা গেছেন আজ চার বছর হলো। দিনগুলো যেন লাগামহীন ঘোড়ার মতো দৌড়ে চলে গেছে। এরিমধ্যে আমার ঘর আলো করে এসেছে টুইন বাবু—একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। ওদের বয়স এখন দুই বছর; ওরা কথা বলতে, হাঁটতে এবং দৌড়াতে শিখেছে। আমি আমার শাশুড়ির শিক্ষায় সম্পূর্ণভাবে দীক্ষিত হয়েছি। তাঁর রেখে যাওয়া সুন্দর নিয়মের এক চুলও আমি এদিক-ওদিক হতে দিইনি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার সংসারেও আমার শাশুড়ির তৈরি সেই অলিখিত সুন্দর সংবিধান সবসময় বলবৎ থাকবে। আর এর চর্চা আমি শুরু করব আমার এই ছোট ছোট ছেলে-মেয়ের হাত ধরেই।

#সংসারের_সংবিধান


সংগৃহীত