দুপুরের বড্ড চড়া রোদটা সবে একটু নরম হতে শুরু করেছে। জানলার ফাঁক দিয়ে আসা সোনালী আলোটা ঘরের মেঝেতে একটা অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করেছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মিহি একবার তার মায়ের দিকে তাকালো। মা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মিহির মুখে খেলে গেল এক চিলতে দুষ্টুমির হাসি। সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে, অত্যন্ত সাবধানে, পা টিপে টিপে বিছানা থেকে নেমে পড়লো। নিজের ছোট্ট পায়ের পাতা দুটোর ওপর ভর দিয়ে, প্রায় নিঃশব্দে ঘরের দরজাটা খুলে সে বাইরে বেরোলো।
সামনেই জেঠিমার ঘর। মিহি দরজার কাছে গিয়ে একবার থমকে দাঁড়ালো। ঘরের বাইরে কোথাও কেউ নেই, চারদিক নিঝুম। সে সাবধানে নিজের ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিল, যাতে একটুও শব্দ না হয়। তারপর জেঠিমার ঘরের বন্ধ দরজায় কান পাতলো। ভেতর থেকে পুরনো সিলিং ফ্যানের একটা চেনা ‘ঘড়ঘড়’ শব্দ ভেসে আসছে। মিহি মনে মনে ভাবলো, "না, ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দটা তো আসছে, তার মানে জেঠিমাও ঘুমে কাদা! এটাই সুযোগ, আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে।"
বলেই, সাত বছরের ছোট্ট মিহি এক ছুটে চললো সোজা রান্নাঘরের দিকে। তার লক্ষ্য আজ অনেক বড়। রান্নাঘরে ঢুকে সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে মিটকেসটা খুললো। তার ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর, অবশেষে তাকের ওপর থেকে আটার বড় বয়ামটা পেড়ে আনতে গিয়ে টাল সামলাতে পারলো না। ঝনঝন শব্দ না হলেও, হুড়মুড় করে বয়ামটা উল্টে গিয়ে সারা মেঝেতে সাদা আটা ছড়িয়ে পড়লো। মিহির হাত, মুখ, জামা—সব মুহূর্তের মধ্যে সাদা ভূতের মতো হয়ে গেল।
ঠিক সেই সময়ই, বাইরের সানসেটের দিক থেকে বেশ তাড়াহুড়ো করে, টলমল পায়ে ছুটে আসলেন ঠাকুমা সন্ধ্যা দেবী। তিনি দূর থেকে শব্দ পেয়েই ভেবেছিলেন অন্য কিছু। রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, "এই মিনি টাকে নিয়ে আমি আর পারি না! এ নিশ্চয়ই আবার রান্নাঘরে মাছ খুঁজতে ঢুকে কিছু একটা ওলটপালট করেছে!"
কিন্তু রান্নাঘরে ঢুকেই সন্ধ্যা দেবীর চোখ তো ছানাবড়া! মিনি বিড়াল নয়, সেখানে বসে আছে তাঁর নিজের ছোট নাতনি। আটা মুখে-হাতে মেখে, ভয় পেয়ে কোনোমতে বয়ামটা সোজা করার চেষ্টা করছে সে। সন্ধ্যা দেবী কৃত্রিম রাগের মুখোশ পরে একটু ধমকের সুরে বললেন, "দিদিভাই! কী হচ্ছেটা কী শুনি? আমি তো ভাবলাম নিশ্চয়ই আমাদের মিনি বিড়ালটা কোনো ঘোঁট পাকিয়েছে। কিন্তু তুমি আটার কৌটো উল্টে ফেললে কী করে? দাঁড়াও, আজকে তোমার বাবা অফিস থেকে আসুক, তারপর দেখাচ্ছি মজা!"
বাবার নাম শুনতেই মিহির বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠলো। সে আর কালবিলম্ব না করে ঠাকুমার শাড়ির লাল পেড়ে আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরলো। তারপর নিচের ঠোঁটটা উল্টে, চোখ দুটো ছলছল করে আদুরে গলায় বললো, "ও ঠাম্মা! আমি সত্যি বলছি, আমি কিচ্ছু করিনি... তুমি শুধু বাবাকে কিচ্ছু বোলো না প্লিজ। তাহলে বাবা রাগ করে আমার পিঠের ছাল তুলে নেবে। আর মা তো জানতে পারলে আজকে রাতে আমাকে একদম খেতেই দেবে না! মা তো বলেছিল, আজকে দুপুরে আমি যদি ভালো করে রাইমস্ মুখস্ত করে নিই, তবে আমাকে ওই যে কৌটোর আমূল দুধটা আছে না, ওটা খেতে দেবে। আমি তো শুধু ওটাই খুঁজছিলাম..."
সন্ধ্যা দেবী নাতনির এই সাদা ভূত মার্কা চেহারা আর কাঁচুমাচু মুখ দেখে নিজের হাসিটা কোনোমতে চেপে রাখলেন। গম্ভীর হওয়ার ভান করে জিজ্ঞেস করলেন, "ও আচ্ছা! দিদিভাই, তুমি তাহলে দুধ চুরি করে খেতে এসেই এই আটার কৌটোটা উল্টেছ, তাই তো?"
মিহি তার ছোট্ট বুড়ো আঙুলটা গালে পুরে, মাথা নিচু করে বললো, "আমার ভুল হয়ে গেছে ঠাম্মা, আর কখনো এমন করবো না। লক্ষ্মী ঠাম্মা আমার!"
সন্ধ্যা দেবী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাতনির গাল থেকে আলতো করে আটাটুকু মুছে দিয়ে বললেন, "তোমার বাবা তোমাকে বারবার বলেছে না, ওই গুঁড়ো দুধ এমনি এমনি মুখে পুরে খেলে দাঁতে পোকা হয়? তাও আবার তুমি লুকিয়ে খেতে এসেছ! যাকগে, এবারকার মতো ছেড়ে দিলাম। এরপর যদি আবার এমন করেছ, আর কিন্তু আমি তোমার কোনো ওকালতি শুনবো না, সোজা বাবাকে বলে দেবো। এখন আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না, যাও, চুপ করে ওই কলতলা থেকে হাত-মুখ ধুয়ে এসো। মাথার চুলগুলোর দিকে তাকিয়েছ কখনো? যেন বাবুই পাখির বাসা হয়েছে! জলদি মুখ ধুয়ে এসে দাবায় (বারান্দায়) ওই আসনটায় গিয়ে বোসো, আমি চুলটা ভালো করে বেঁধে দেবো। আমি এই মেঝে থেকে আটাটা তুলেই আসছি, বুঝলে দিদি?"
ঠাকুমার এই শর্তসাপেক্ষ ক্ষমার আশ্বাস পেয়ে মিহির মুখে আবার হাসি ফুটলো। সে ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে কলতলায় হাত-মুখ ধুয়ে আসলো। তারপর বারান্দায় পাতা আসনটায় ধপ করে বসে পড়লো।
কিছুক্ষণ পর, সন্ধ্যা দেবী হাতে একটা কাঠের চিরুনি আর নারকেল তেলের শিশি নিয়ে আসতে আসতে আপনমনেই বললেন, "সত্যি বাপু! তোকে নিয়ে আমি আর পারি না। একটা সাত বছরের মেয়ে এতো দুষ্টুমি করে দিদি!"
ঠাকুমার কাছে একদম শান্তশিষ্ট মেয়ের মতো পিঠ ফিরিয়ে বসে মিহি অল্প হেসে আলতো গলায় বললো, "তুমি তখন রান্নাঘরে খুব রেগে গেছিলে, তাই না ঠাম্মা? নাহলে তুমি তো আমায় সচরাচর ‘তুই’ ছাড়া ‘তুমি’ বলো না... যখন খুব রাগ হয়, তখনই শুধু তুমি আমায় ‘তুমি’ বলো!"
সন্ধ্যা দেবী নাতনির এই সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ দেখে মনে মনে চমকে উঠলেন। তিনি চিরুনি দিয়ে মিহির জট পড়া চুলগুলো আলতো করে ভাগ ভাগ করতে লাগলেন। পরম মমতায় বিলি কেটে দিতে দিতে তিনি হঠাৎ কেমন যেন চুপ করে গেলেন। চারপাশের নিস্তব্ধতা আর ঠাকুমার এই হঠাৎ নীরবতা মিহিকে অস্থির করে তুললো। সে ছটফট করে মাথাটা চিরুনির বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে ঠাম্মার দিকে তাকালো। অভিমানের সুরে বললো, "তুমি আবার রাগ করলে তো? রাগ করেছ বলেই কথা বলছ না আমার সঙ্গে! যাও, তুমি যদি কথা না বলো, আমিও আর তোমার সঙ্গে আড়ি, কোনো কথা বলবো না।"
সন্ধ্যা দেবী এবার হেসেই ফেললেন। নাতনির চিবুকটা ছুঁয়ে আদর করে বললেন, "দুষ্টু মেয়ে! দুষ্টুমি করে আবার আমার ওপর টেক্কা দেওয়া হচ্ছে? জানিস দিদি, আজ রান্নাঘরে তোকে অমন আটা মেখে অপরাধীর মতো বসে থাকতে দেখে না, আমার নিজের খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো।"
ঠাকুমার মুখে ছোটবেলার কথা শুনে মিহির চোখ দুটো কৌতুহলে চকচক করে উঠলো। বারান্দার এক কোণে মিনি বিড়ালটা রোদ পোহাচ্ছিল। মিহি মিনিকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে তার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে উৎসাহী গলায় বললো, "তাই? সত্যি ঠাম্মা? তুমিও আমার মতো কখনো এতোটুকু ছোট ছিলে গো? একদম আমার মতো দেখতে ছোট, নাকি আমার চেয়ে আরও অনেক ছোট ছিলে তুমি? আচ্ছা ঠাম্মা, তুমিও কি আমার মতো এরকম দুপুরে সবাই ঘুমালে লুকিয়ে লুকিয়ে রান্নাঘরে খাবার খেতে যেতে? তোমার বাবা তোমাকে কিচ্ছু বলতো না? দাঁড়াও, আমি আজকেই বাবা আসুক, বাবাকে সব বলে দেবো যে তুমিও ছোটবেলায় এসব করতে! তাহলে বাবা শুধু আমাকে বকবে না, ওমা, বাবা তোমাকেও বকবে!"
নাতনির এই নিষ্পাপ ও মজার কথা শুনে সন্ধ্যা দেবী খিলখিল করে হেসে উঠলেন। বিকেলের নরম আলোয় তাঁর চোখের কোণে যেন স্মৃতির এক টুকরো নদী বয়ে গেল। তিনি বললেন, "এই বয়সে তোকে আর কী বলবো দিদি! আমরা ছোটবেলায় যে কী মারাত্মক সব কাণ্ডকারখানা করতাম, সে কি আর আজকের দিনে তোকে বলতে পারি রে? আর তুই আমায় যে বাবার ভয় দেখাচ্ছিস, ও তো আমারই পেটের ছেলে! ও নিজে ছোটবেলায় কী কী কীর্তি ঘটিয়েছে, শুনলে তুই নিজের কানকেও বিশ্বাসই করবি না।"
মিহি সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করলো, "কী করতো বাবা? বলো না ঠাম্মা!"
সন্ধ্যা দেবী স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বললেন, "জানিস দিদি, ছোটবেলায় একবার তোর বাবা বসে বসে দুধ-ভাত খাচ্ছিল। তা খেতে খেতে থালাটা একটু ছোট ছিল বলে সামান্য একটু ভাত মেঝেতে পড়ে গেছিলো। ব্যাস! তোর বাবার সে কী রাগ! রাগ করে কাঁসার থালাটাকে মেঝেতে এমন এক আছাড় মারলো যে, থালাটা এক্কেবারে ছিটকে গিয়ে দু-টুকরো হয়ে ভেঙে গেল!"
বাবার এই গল্প শুনে মিহি মিনি বিড়ালটাকে ছেড়ে দিয়ে নিজের পেটে হাত দিয়ে খিলখিল করে হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতেই বললো, "বাবা এতো দুষ্টু ছিল! তাহলে বাবা আমাকে কেন এতো বকে?"
সন্ধ্যা দেবী মিহির চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে আরও বলতে লাগলেন, "হ্যাঁ রে দিদি, সবাই আমরা একদিন তোর মতোই ছোট ছিলাম, তারপর আস্তে আস্তে বড় হয়েছি। জানিস, আমাদের সময়ে তো এখনকার মতো এতো রান্না করার গ্যাস, ওভেন এসব কিচ্ছু ছিলো না। আমরা মাঠে-ঘাটে কত গর্ত করে, কাঠ-কুটো কুড়িয়ে আগুন জ্বালিয়ে রান্না করেছি। আমরা তখন গ্রামে থাকতাম। আমাদের বাড়ির ওদিকে গঙ্গার ঘাটের কাছে এক ময়রার দোকান ছিলো, লোকটার নাম ছিলো হারু ময়রা। আমরা যখনই গঙ্গাস্নান করতে যেতাম, ফেরার পথে হারু ময়রার দোকানের গরম গরম রসালো রাজভোগ না খেয়ে কিছুমতেই বাড়ি ফিরতাম না। সে কী স্বাদ ছিল তার!"
মিহির মনের ভেতরের কৌতূল ও উত্তেজনার পারদ যেন প্রতি মুহূর্তে বেড়েই চলেছে। সে ঠাকুমার হাতটা ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো, "তাই গো ঠাম্মা? আর কী কী করতে তোমরা ছোটবেলায়? বলো না, বলো না..."
নাতনির এই মিষ্টি আবদারে সন্ধ্যা দেবী যেন এক্কেবারে নিজের সেই সত্তর বছর আগের ছটপটে, চঞ্চল শৈশবে ফিরে গেলেন। তাঁর গলার আওয়াজটাও যেন বদলে গেল। তিনি বললেন, "শোন তবে, একবার কী হয়েছিল। আমাদের পাড়ায় নকুল জেঠার একটা মস্ত বড় জমি ছিল, সেখানে সেবার প্রচুর মটরশুঁটি চাষ হয়েছিল। আমরা দুই বোন আর পাড়ার আরও কয়েকজন বন্ধু মিলে একদিন দুপুরে, যখন সবাই ঘুমাচ্ছিল, চুপিচুপি ওই জমিতে গিয়ে ঢুকলাম। তারপর গাছ থেকে মটরশুঁটিগুলো ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে নিজেদের ফ্রকের কোঁচড়ে করে গাদা গাদা নিয়ে চলে এলাম। মজার বিষয় কী জানিস? মটরশুঁটির ওপরের খোসাগুলো গাছের গায়ে তেমনই ঝুলছিল, কিন্তু ভেতরে দানা একটাও ছিল না! পরে সে যখন জমিতে এসে দেখেছে, তখন মালিকের কী হায় হায় অবস্থা! ওদিকে আমরা তো ওই চুরি করা মটরশুঁটি নিয়ে সোজা এক বান্ধবীর বাড়ি গিয়ে, একেবারে গরম তেলে কড়াই করে ভেজে, মুড়ি দিয়ে খেয়ে তবে বাড়ি ফিরেছিলাম!"
মিহি অবাক হয়ে শুনছিল। ঠাকুমার এই চুরির গল্প শুনে তার নিজের অ্যাডভেঞ্চার করার ইচ্ছে জেগে উঠলো। সে ঠাকুমার কোলের ওপর দু-হাত রেখে আবদার করে বললো, "ও ঠাম্মা, ঠাম্মা! তোমরা আর কী কী রান্না করতে গো ছোটবেলায়? আমাকেও একদিন ওইরকম গর্ত করে আগুন জ্বালিয়ে রান্না করতে দেবে? তোমরা তো করতে ঠাম্মা, আমি বেশিদিন করবো না, একদিনই খালি করবো, আর কখনো চাইবো না। দেবে তো... বলো না ঠাম্মা, দেবে তো?"
নাতনির এই জোরাজুরিতে সন্ধ্যা দেবী একটু গম্ভীর হলেন, তাঁর চোখে একটা হালকা বিষাদের ছায়া নেমে এলো। তিনি মিহির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "আচ্ছা, তুই আরেকটু বড় হ দিদি, তখন করবি। আমাদের সময়টা না একদম আলাদা ছিল রে দিদিভাই। আমাদের সময়ে মেয়েদের এই সাত-আট বছর বয়েস হতেই ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে যেত। শ্বশুরবাড়ি যেতে হতো বলে আমাদের ওইটুকু বয়স থেকেই কম-বেশি সব রান্নাবাড়া শিখে নিতে হতো, রান্নার কাজ করতে হতো, বুঝলি? এই যেমন এখন তোর বয়স ছ-সাত বছর, ঠিক এই বয়সেই আমার নিজের দিদিমা আমাদের সবাইকে ছেড়ে চিরকালের মতো চলে গেছিল। বুড়িটা না আমাকে বড্ড ভালোবাসতো রে জানিস!"
ঠাকুমার গলার সুর বদলে যেতে দেখে মিহির ছোট্ট মনটাও কেমন যেন ভারী হয়ে উঠলো। সে একটু দুঃখ দুঃখ মুখ করে ঠাকুমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।
সন্ধ্যা দেবী আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে বলতে লাগলেন, "সেই বুড়ির কাছে রাতে শুয়ে শুয়ে কত কী যে গল্প শুনতাম! শিয়াল পণ্ডিতের গল্প, ডালিমকুমারের গল্প, ডানাকাটা পরীদের গল্প... কত গল্প জানতো বুড়িটা! কিন্তু কী যে হলো, হঠাৎ একদিন গায়ে বড্ড জ্বর এলো, আর সেই দুদিনের জ্বরে বুড়িটা আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে একেবারে স্বর্গের সিঁড়ি ধরে ওপরে চলে গেল।"
মিহি ঠাকুমার হাতটা নিজের গালে ঠেকিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে বললো, "ঠাম্মা, তোমার দিদিমা চলে গেছে তো কী হয়েছে? তুমি তো আছ। আমাদিকেও তুমি শোনাবো তো ঠাম্মা, ওইসব পরী আর চালাক শিয়ালের গল্প? বলো না ঠাম্মা, আজ রাতেই শোনাবে তো?"
বিকেলের সূর্যটা তখন এক্কেবারে দিগন্তে ঢলে পড়েছে। সন্ধ্যা দেবী নাতনিকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে একটু আনমনা, দূরমনস্ক গলায় বললেন, "বেশ দিদিভাই, সে গল্প নাহয় আজ রাতে আরেকদিন তোকে মন দিয়ে শোনাবো..."
বারান্দার কোণে তখন তুলসী মঞ্চে প্রদীপ জ্বালার সময় হয়ে এসেছে, আর স্মৃতির আলো-আঁধারিতে মিশে যাচ্ছিল দুই প্রজন্মের এক অদ্ভুত সুন্দর বিকেল।
সংগৃহীত