রূপালী মেঘের আড়ালে: এক অসমাপ্ত অপেক্ষার গল্প
অজ্ঞাত
"রূপালী মেঘের আড়ালে: এক অসমাপ্ত অপেক্ষার গল্প"
সানাইয়ের সুর আর অতিথিদের কলরবে মুখরিত গোটা বাড়ি। চারদিকে উৎসবের আলো। বসার ঘরে থিকথিক করছে মেহমান। কাজী সাহেব তৈরি, বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন। পাত্র শৌমিক তার নিখুঁত স্বভাব-চরিত্র, শিক্ষা ও আভিজাত্য নিয়ে প্রস্তুত। সে লাজুককে মনেপ্রাণে ভালোবাসে, তার জন্য কোনো দরাদরি না করে পকেট উজাড় করে রেশম সুতোর পিকক ব্লু বিয়ের শাড়ি আর দামি গহনা কিনে এনেছে। পাত্রী হিসেবে ২৬ বছর বয়সী লাজুকের বয়সটা পাত্রের মা শাকিলার চোখে একটু বেশি ঠেকলেও, শৌমিকের ভালোবাসার কাছে সেসব নস্যি।
কিন্তু এই আনন্দঘন পরিবেশের মাঝেও একটা থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। কারণ, নববধূর সাজে সেজে থাকা লাজুক নির্বাক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে, বাবা করিমের নরম সুরের অনুরোধ কিংবা মেজো বোন মৌমিতার সোহাগভরা আশ্বাসেও তার ঠোঁট দুটো খুলছে না। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে—কখন লাজুক ‘কবুল’ বলবে।
লাজুকের এই নীরবতা মেহমানদের মনে বিরক্তি ধরাচ্ছে। পাত্রের মা শাকিলা তো বলেই বসলেন, মাঝরাতে লুকিয়ে ছাদে অভিসারে যাওয়ার কথা মনে ছিল, আর এখন কবুল বলতে যত নখরা! শৌমিক মায়ের এমন কথায় নিজের আত্মসম্মানে আঘাত পেলেও পরিস্থিতির খাতিরে চুপ করে রইল। লাজুকের মা নাফিসা আর বাবা করিম বছরের পর বছর ধরে মানুষের কত তিক্ত কথাই না হজম করে আসছেন, আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। এদিকে কাজী সাহেব তাড়া দিচ্ছেন, এশার ওয়াক্ত হয়ে আসছে, আজানের আগেই বিয়ে পড়াতে হবে।
লাজুকের নিস্তব্ধতা যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন কাকা আবিদ এসে তার মাথাটা সোজা করে বসালেন। কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা নাফিসা ও বোন নিমিতা। ঠিক তখনই সবাইকে চমকে দিয়ে লাজুক মুখ খুলল। কিন্তু সে ‘কবুল’ বলল না।
আবিদকে উদ্দেশ্য করে তার কাঁপা গলার একমাত্র প্রশ্ন ছিল—**“কাকু তোমার ছোট ভাই কোথায়?”**
প্রশ্নটা করা মাত্রই যেন পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল। আবিদের মুখে কোনো কথা সরল না। ঠিক সেই মুহূর্তে বাসার কলিংবেলটা বেজে উঠল—টুং-টুং!
কারও অনুমতির অপেক্ষা না করে, পরনের মেরুন রঙের শাড়ির আঁচল মাথায় চেপে দরজার দিকে ছুটল লাজুক। এলোমেলো পায়ে দৌড়াতে গিয়ে তার দীঘল কালো চুলের খোঁপা খুলে পিঠময় ছড়িয়ে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে দরজা খুলতেই লাজুকের সামনে এসে দাঁড়াল এক ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মানুষ—যেন আস্ত একটা পাহাড় ধসে পড়েছে।
তাকে দেখামাত্রই বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে, ঠোঁট উল্টে গলা ছেড়ে কেঁদে উঠল লাজুক। তার সেই করুণ কান্নায় যেন পুরোনো দ্বিতল বাড়িটার প্রতিটি ইট-পাথর কেঁদে উঠল। বসার ঘরের সবাই উৎসুক হয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার ওপাশে দাঁড়ানো মানুষটির পথ আগলে, কাঁপতে কাঁপতে অঝোরে কেঁদে চলেছে লাজুক। কে এই রহস্যময় মানুষ, যার অপেক্ষায় লাজুক নিজের বিয়ে ভাঙতেও দ্বিধা করল না?
চলবে...
সংগৃহীত