রক্তিম সৃষ্টি ও অলিখিত লক্ষ্মণরেখা

"দেবীর ঋতুস্রাব পবিত্র হলে, রক্তমাংসের মেয়ের রক্তিম সৃষ্টি কেন অশুচি?" — অম্বুবাচীর আবহে এক চিরন্তন প্রতিবাদের গল্প।

সকাল থেকেই সৃজনী লক্ষ্য করছিল তার চেনা ঘরটাতে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন। রান্নাঘরের চৌকাঠের বাইরে যেন কেউ একটা অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখা টেনে দিয়েছে। আজ অম্বুবাচী শুরু। মা সকাল থেকেই কড়া নির্দেশ জারি করেছেন—ঠাকুরের বাসন ছোঁয়া তো দূর অস্ত, তুলসী মঞ্চে জল দেওয়াও কঠোরভাবে বারণ। কারণটা সৃজনীর অজানা নয়। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে তার ‘শরীর খারাপ’ হয়েছে। আর এই রক্ষণশীল সমাজের চোখে সে এখন ‘অশুচি’, অপবিত্র।

অথচ আজ সৃজনীর জীবনে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। একটা বড় কর্পোরেট কোম্পানিতে আজ তার বড় প্রেজেন্টেশন আছে। পেটে হালকা মোচড় দেওয়া ব্যথা আর মনের ভেতর একরাশ ক্ষোভ নিয়ে যখন সে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল, তখন সে দেখল মা ঘরের এক কোণে থাকা সিংহাসনের সমস্ত দেবী মূর্তিদের মুখ পরম ভক্তিতে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিচ্ছেন। কামাখ্যা মায়ের মন্দিরে দেবীর ঋতুকাল শুরু হয়েছে, তাই মা পরম শ্রদ্ধায় কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম ঠুকলেন।

সৃজনী আর চুপ থাকতে পারল না। কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগটা তুলে নিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"

মা মূর্তির কাপড় ঠিক করতে করতে না তাকিয়েই উত্তর দিলেন, "কী রে? তাড়া আছে, তাড়াতাড়ি বল।"

সৃজনী মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে সোজা গলায় প্রশ্ন করল, "যে রক্তে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, যে রক্তবিন্দুর উদযাপন করতে তোমরা কামাখ্যা দেবীর পুজো করছ—সেই একই রক্ত যখন আমার শরীর থেকে বেরোয়, তখন আমি রান্নাঘরে যাওয়ার যোগ্যতাও হারাই কেন মা? দেবী ঋতুমতী হলে তিনি পূজনীয়া, আর তোমার নিজের মেয়ে ঋতুমতী হলে সে অপবিত্র?"

মায়ের হাতটা মাঝপথেই থমকে গেল। সৃজনী থামল না। সে প্রাচীন ইতিহাসের পাতা থেকে এক অমোঘ সত্য মনে করিয়ে দিয়ে বলল, "তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের ঋতুকালীন অশুচিতার গোঁড়ামি ভেঙে শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং মা সারদাকে বলেছিলেন, শরীরের ধর্মে মনের কোনো অশুদ্ধি হয় না। তাই সেই সময়েও তিনি মায়ের হাতের রান্না খেতেন এবং মা সারদাকে স্বাভাবিকভবে ঠাকুরের সেবা ও রান্না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।"

সুতো ছেঁড়া ঘুড়ির মতো একটা গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এল সেই চেনা ঘরটায়। মা নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সৃজনী আর উত্তরের অপেক্ষা করেনি। সে দ্রুত দরজার দিকে পা বাড়াল। তার পরনের লাল ওড়নাটা তখন যেন কোনো এক প্রাচীন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পতাকা হয়ে বাতাসে উড়ছিল। সৃজনী ভালো করেই জানে, শত শত বছরের এই কুসংস্কারের দেয়াল হয়তো এক দিনে ভাঙবে না, কিন্তু এই বদ্ধ ঘরে প্রশ্নটা তোলা খুব দরকার ছিল।

সৃষ্টির আদিম উৎস ও আমাদের দ্বিচারিতা

ঋতুস্রাব বা পিরিয়ডস কেবল কোনো সাধারণ শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, এ হলো সৃষ্টির আদিমতম উৎস। প্রতি বছর আষাঢ়ের যে দিনগুলোয় কামাখ্যা মায়ের মন্দিরের দুয়ার বন্ধ থাকে, আমরা বিশ্বাস করি ধরিত্রী মা ঋতুমতী হন—তাকে আমরা বলি অম্বুবাচী। কিন্তু পরম বিস্ময় ও ট্র্যাজেডির বিষয় হলো, যে রক্তকে আমরা দেবীর দেহে ‘পবিত্র’ মেনে পুজো করি, ঘরের মেয়ের শরীরে সেই রক্তবিন্দু দেখা দিলেই সমাজ তাকে ‘অপবিত্র’ বা ‘অশুচি’র তকমা দেয়। এই দ্বিচারিতা বন্ধ হোক, শুভবুদ্ধির উদয় হোক আমাদের সমাজে।


সংগৃহীত