রক্তের বন্ধন বনাম স্বার্থের দেয়াল

সানাইয়ের সুরটা যখন বাড়ির প্রতিটি কোণায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, নোভার মনে হচ্ছিল সেই সুর যেন ধারালো তীরের মতো তার বুক চিরে চলে যাচ্ছে। আজ তার চোখের সামনেই তার আট বছরের ভালোবাসার মানুষ, তার প্রাক্তন প্রেমিক রফিক আর তার আপন চাচাতো বোন শান্তার ধুমধাম করে বিয়ে হচ্ছে। নোভার নিজের বাবা-মা, যারা একদিন তাকে আগলে রাখতেন, আজ তারা নোভার এই বুকফাটা কষ্টে সম্পূর্ণ উদাসীন ও নির্লিপ্ত। এই স্বার্থপর পরিবারের মাঝে নোভার আজ কেবল একটাই আশ্রয়—তার আপন বড় ভাই নাভেদ, যে তার চেয়ে মাত্র তিন বছরের বড় হলেও বন্ধুর মতো ছায়ার মতো পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

নাভেদ নোভার পাশে এসে দাঁড়িয়ে হালকা দুষ্টুমির সুরে বলল, "কী রে বোনু, তোর ওই বিশ্বাসঘাতক এক্সের জন্য কাঁদতেছিস নাকি?"

নোভা চোখের জল মুছে ক্ষোভের সাথে জবাব দিল, "ওই শুয়োরের বাচ্চার জন্য কাঁদবে আমার জুতো! ও তো আমার জুতারও যোগ্য না।"

নাভেদ তখন রহস্যের ছলে বলল যে সে শুনেছে রফিক নাকি সরকারি চাকরি পেয়েছে, আর সেই লোভেই নোভার বাবা ও চাচা শান্তাকে ওই বাড়িতে সাগ্রহে বিয়ে দিচ্ছেন। নিজের বাবা-মায়ের এমন লোভী মানসিকতায় ক্ষুব্ধ হয়ে নাভেদ বলেই ফেলল যে এমন বাবা-মা যেন কোনো শত্রুর কপালে ও না জোটে।

অতীতের একটা স্মৃতি নোভার চোখের সামনে ভেসে উঠল। যেদিন শান্তার বিয়ের কথা পাকা হচ্ছিল, তখন নাভেদ শান্তাকে ভালোবাসত বলে নিজের বাবা আর চাচার পা জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল। কিন্তু নোভার বাবা নিহাল হোসেন নিজের ছেলের বুকে লাথি মেরে অপমান করে বলেছিলেন, "শুয়োর, তোর কিসের যোগ্যতা রে আমার মেধাবী সুন্দরী ভাতিজিরে বিয়ে করার? এখনো তো বাপেরটা খাস। যা ভাগ এখান থেকে!" নাভেদ তখন প্রতিবাদ করে বলেছিল যে রফিক আট বছর নোভার সাথে সম্পর্ক রেখে তাকে ঠকিয়েছে, তাহলে বাবা কীভাবে এই অন্যায় মেনে নিচ্ছেন? তখন নিহাল হোসেন নিষ্ঠুরভাবে উত্তর দিয়েছিলেন যে নোভার যোগ্যতা নেই বলেই রফিক তাকে ছেড়েছে, আর বিয়ের আগে পুরুষ মানুষের একটু-আধটু কাহিনী থাকেই!

অতীত থেকে বর্তমানে ফিরে এসে নোভা নাভেদকে জিজ্ঞেস করল, "ভাই, শান্তার জন্য কষ্ট হচ্ছে?"

নাভেদ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল যে প্রথম প্রথম কষ্ট হলেও, যখন সে শান্তাকে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, তখন শান্তা নাভেদকে 'বেকার' বলে তার সাথে কোনো ভবিষ্যৎ নেই বলে প্রত্যাখ্যান করে। তখন নাভেদ চিৎকার করে বলেছিল, "আলহামদুল্লাহ! তোর মতো লোভী থেকে আল্লাহ আমায় বাঁচিয়েছেন।"

ঠিক তখনই নাভেদ নোভার জীবনে এক মহাবিস্ময়ের এবং আনন্দের খবর শোনাল। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে একমুখ হাসি নিয়ে বলল, "বোনু, আমি ঢাকার একটা কোম্পানিতে জব পেয়েছি। স্টার্টিং এ ৩০ হাজার দিবে বলেছে, পরবর্তীতে পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে বেতন বাড়বে।" নোভা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। নাভেদ জানাল, এক মাস আগে সে কাউকে না জানিয়ে ঢাকায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল, যাতে চাকরি না পেলে বাবা আবার খোঁটা দিতে না পারেন। কারণ বাবা শুনলে বলবেন যে মাত্র ৩০ হাজার টাকা বেতন, অথচ চাচার ছেলে বুয়েট পাস করে মাসে দেড় লাখ টাকা পায়!

নাভেদের মলিন মুখ দেখে নোভা আনন্দের সাথে বলল, "ভাই তোর তো লটারি লেগে গেল রে! ঢাকায় কত সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে! অবশেষে মুক্তি পাবি এই জাহান্নাম থেকে। আমাকেও নিয়ে যা প্লিজ!"

নাভেদ পরম মমতায় বোনের মাথায় হাত রেখে বলল, "তবে তাই হব! যা কাপড় গোছা, কাল সকালেই বের হব। তোর তো ফাইনালও শেষ!"

ভাইয়ের এই কথায় নোভার চোখে মুখে আনন্দের অশ্রু নেমে এলো। এতদিনের অন্ধকার আর অবহেলার পর, সে কি সত্যিই এই পরিবার নামক অভিশাপ থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে চলেছে? এক নতুন ভোরের আশায় দুই ভাই-বোন তৈরি হতে লাগল এক নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে।


সংগৃহীত