কিছু প্রথম প্রেম অদৃশ্য গভীরতায় মনে রয়ে যায় চিরকাল
সিলেট শহরের আকাশটা তখন থেকেই কেমন যেন রুক্ষ হতে শুরু করেছিল। রোদের প্রখর তাপে মাঠঘাট শুকিয়ে খরখরে, জনজীবন দুর্বিষহ। কিন্তু ঠিক তখনই, সব নিয়ম ভেঙে আকাশের বুক চিরে নেমে এসেছিল এক পশলা আকস্মিক বৃষ্টি। গ্রীষ্মের উত্তপ্ত রোদকে বিদায় জানিয়ে রিমঝিম শব্দে বর্ষা তার আগমনী সুর বাজিয়েছিল। ঠিক তেমনি এক ঝোড়ো সময়ে আমার জীবনেও একটা রূপান্তর আসছিল।
আমি প্রত্যুষ। তখন সদ্য আঠারোয় পা দিয়ে অনার্সের প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি। সদ্য যৌবনে পদার্পণ করার যে চপলতা থাকে, আমার জীবনে তা ছিল না। কারণ, তার ঠিক এক বছর আগে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় আমার বাবা মারা যান। বাবা ছিলেন আমাদের পরিবারের বটগাছ। তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়াটা আমার প্রাণচঞ্চল মাকে এক জীবন্ত লাশে পরিণত করেছিল। মা কথা বলা বন্ধ করে ঘরের কোণায় বসে একদৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতেন—কখন বাবা ফিরবে, সেই আশায়। মায়ের এই অসুস্থতা এবং গ্রামে চাচাদের সাথে বাবার সম্পত্তি নিয়ে নোংরা ঝামেলার কারণে ডক্টরের পরামর্শে আমরা গ্রাম ছেড়ে সিলেট শহরের চারতলার এক ফ্ল্যাটে চলে আসি।
আমার জগৎটা তখন সীমাবদ্ধ ছিল—ভার্সিটি, মায়ের সেবাযত্ন আর একাকীত্ব। মা ভালো করে খেতেন না বলে কাজের মহিলা রাখা হয়েছিল, আমি বাকি সময়টা মায়ের ঘরে গিয়ে বসে থাকতাম। মা শুধু ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। এই নিস্তব্ধতায় এপ্রিলের ১ তারিখে বসন্তের বাতাসের মতোই একটা পরিবর্তন এলো।
অনুর আগমন
আমাদের নিচের ফ্ল্যাটে, অর্থাৎ দোতলায় নতুন ভাড়াটিয়া এলেন। তিনজনের পরিবার—স্বামী, স্ত্রী আর একটি ছোট মেয়ে। গৃহকত্রী শিরিন আন্টি ছিলেন ভীষণ মিশুক আর মার্জিত স্বভাবের। ওনার স্বামী আরাফাত আঙ্কেল বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন বলে প্রায়ই শহরের বাইরে থাকতেন। প্রতিবেশী হিসেবে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তাঁদের ঘরের বাজারের দায়িত্বটা আমার ওপর আসে। আর এই সুবাদেই আলাপ হলো তাঁদের একমাত্র মেয়ে অহনার সাথে। ভালোবেসে সবাই ওকে ডাকত "অনু"।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সমাজ একে 'নিব্বা-নিব্বির প্রেম' বলে হাসাহাসি করতেই পারে। পাক্কা নয় বছরের বড় একটা ছেলে, নয় বছরের একটা ফ্রক পরা মেয়ের প্রেমে পড়েছে—শুনতে অদ্ভুত এবং হাস্যকর লাগাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনুই ছিল আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভালোবাসা।
অনু তখন ক্লাস ফোরে পড়ে। পড়াশোনায় ভীষণ মেধাবী। শিরিন আন্টি একদিন আমাকে খুব অনুরোধ করলেন অনুকে একটু গাইড করার জন্য। আমার নিজের পড়াশোনা এবং মায়ের অবস্থা সামলে সময় দেওয়া কঠিন ছিল বলে প্রথমে না করেছিলাম। কিন্তু আন্টির জোরাজুরিতে রাজি হতে হলো—"ভার্সিটি থেকে এসে মাত্র ৩০টা মিনিট একটু দেখিয়ে দিও প্রত্যুষ।"
ব্যস, সেই ৩০ মিনিটই আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হয়ে উঠল। প্রথম প্রথম ও আমাকে 'স্যার' বলতে চাইত না। শিরিন আন্টি বকা দিলে ওর চটপটে উত্তর ছিল—"স্কুলের সব স্যাররা রাগী আর গম্ভীর হয়। প্রত্যুষ ভাই সুন্দর করে হাসে, কথা বলে। আমি ওকে ভাইয়া বলেই ডাকব।" ওর সেই বাচ্চা বাচ্চা কণ্ঠে 'প্রত্যুষ ভাই' ডাকটা আমার কানে অমৃতের মতো শোনাত।
অনু প্রায়ই আমাদের ফ্ল্যাটে চলে আসত। মায়ের ঘরে গিয়ে উঁকি দিত, কিন্তু মা চুপচাপ থাকায় ও বেশি সময় কাটাত আমার ঘরে। আমার বিছানায় বসে ছোট ছোট পা দুলিয়ে ফোনে কার্টুন দেখত, সারা ঘর জুড়ে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াত। আমি যখন পড়ার টেবিলে বসে ওঁর এই খিলখিল হাসি আর দুষ্টুমি দেখতাম, আমার অজান্তেই আমার ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠত। জলের ওপর ভেসে থাকা একজোড়া পদ্মর মতো ওর সেই শান্ত চোখ, কোমর অবধি বেণি করা চুল আর মায়াবী মুখশ্রী থেকে আমি চোখ ফেরাতে পারতাম না।
ওর প্রতি আমার এই অদ্ভুত যত্নশীলতা, এই তীব্র মুগ্ধতা যে আসলে কী—তা বুঝতে আমার নিজেরই একটা বছর কেটে গিয়েছিল। ততদিনে অনু ক্লাস ফাইভে উঠেছে। ওর শরীরে সামান্য পরিবর্তন এসেছে, একটু বড় হয়েছে। কেউ ওকে 'বাচ্চা' বললে ও গাল ফুলিয়ে বসে থাকত। কিন্তু ওর ভেতরের সেই অবুঝ দুষ্টুমিটা একই ছিল।
সেই বৃষ্টিভেজা বৃহস্পতিবার
দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা ছিল, দুপুরে আযানের পর থেকে শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। ভার্সিটির ক্যাম্পাসে ছাতা ছাড়া এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও যখন বৃষ্টি কমল না, তখন বাধ্য হয়ে ভিজে চুপচুপে হয়েই রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরলাম। শরীরটা কাঁপছিল, কয়েকটা হাঁচিও এল—বুঝলাম রাতে জ্বর আসবে।
ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে কাজের মহিলার রেখে যাওয়া খাবার গরম করে খেলাম। তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচে গেলাম অনুকে পড়াতে।
কলিং বেল বাজাতেই শিরিন আন্টি দরজা খুলে দিলেন। ওনার মুখে চিরপরিচিত অমায়িক হাসি। “আসসালামু আলাইকুম আন্টি।” “ওয়ালাইকুম সালাম, প্রত্যুষ। ভিতরে এসো। তোমার মায়ের শরীর কেমন এখন?” আমি একটু চিন্তিত গলায় বললাম, “শহরের সব ডাক্তারই দেখালাম আন্টি, কোনো উন্নতি নেই। ভাবছি সামনের মাসে একবার ঢাকায় নিয়ে যাব।” “হ্যাঁ, সেটাই করো। ঢাকার বড় ডাক্তার দেখাও, ভালো হবে।”
কথা বলতে বলতে আমার চোখ দুটো অনুকে খুঁজছিল। এই বৃষ্টির দিনে মেয়েটা গেল কোথায়? জিজ্ঞেস করতেই আন্টি হেসে উঠলেন, “আর বোলো না! তিন তলার স্নেহাদের বাসায় গেছে। আজ নাকি ওর পুতুলের বিয়ে! তাই ওনার খুব ব্যস্ততা।” আমিও না হেসে পারলাম না। মনে মনে ভাবলাম, এই অবুঝ মেয়েটার প্রতি আমি কীভাবে নিজের মন সঁপে দিলাম?
আন্টি ওকে ডাকতে গেলেন আর আমি অনুর ঘরে গিয়ে বসলাম। একটা ছোট্ট খাট, পড়ার টেবিল আর একটা আয়না। বারান্দার দিকে পা বাড়াতেই এক পরিচিত কণ্ঠস্বরের ডাক শুনলাম— “প্রত্যুষ! প্রত্যুষ এসেছে!” ডাকটা কোনো মানুষের নয়, অনুর পোষা টিয়া পাখিটার। লাল টুকটুকে ঠোঁট নেড়ে ও আমার নাম ধরে ডাকছে। অনুকে ওটা ওর বাবা কিনে দিয়েছিল। এর আগে একটা কোকিল পাখি আন্টি খাঁচা থেকে উড়িয়ে দেওয়ায় অনু কেঁদে চোখ-মুখ ফুলিয়ে ফেলেছিল। আমার কাছে এসে ঠোঁট উল্টে ওঁর সেই কান্নার ধরণ দেখে আমি হেসে ফেলেছিলাম বলে মহারানী আমার সাথে তিনদিন কথা বলেননি! পরে আইসক্রিম আর চকোলেট কিনে ওঁর রাগ ভাঙাতে হয়েছিল। পুরনো স্মৃতির কথা ভেবে আমি আনমনে হাসছিলাম।
এমন সময় অনু রুমে ঢুকল। টেবিলের সামনে চেয়ার টেনে ও খুব চুপচাপ বসল। মাথাটা নিচু। আন্টি চা-নাস্তা দিয়ে গেলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে অনুর? আজ এত চুপচাপ কেন?” অনু মুখটা আরও ভার করে বলল, “অনুর আজ মন খারাপ। ওর পুতুলের বিয়ে হয়ে গেছে। সবাই শ্বশুরবাড়ি চলে যায়।” আমি মজা করে বললাম, “বড় হলে তো সবাই চলে যায়, তুমিও যাবে।” ও চট করে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল। ওর সেই পদ্ম চোখের দৃষ্টি সোজা আমার বুকের গভীরে গিয়ে বিঁধল। ও বলল, “উঁহু, অনু যাবে না। অনুর বিয়ে হলে ও আম্মু-আব্বুকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।”
ওর মুখে বিয়ের কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে আবার হাসির ছলে জিজ্ঞেস করলাম, “অনুর বিয়ে হবে? অনু কেমন বর চায়?” ও খুব উৎসাহ নিয়ে বলল, “অনুর বড় হলে বিয়ে হবে। ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্র আসবে চলে...” “রাজপুত্র? অনুর রাজপুত্র চাই?” “হ্যাঁ চাই! অনুর রাজপুত্রের সাথেই বিয়ে হবে। বলো না প্রত্যুষ ভাই, হবে না?”
আমি শুধু মাথা নেড়ে বলেছিলাম, “হ্যাঁ, হবে।” তারপর ও অঙ্ক করতে বসল। আমি টেবিলে কনুই ঠেকিয়ে, গালে হাত দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আমার দেখার তৃষ্ণা মিটছিল না। আমি জানতাম না, এটাই আমার রাজকন্যাকে এত কাছ থেকে দেখার শেষ বিকেল হতে চলেছে।
বিচ্ছেদ ও অনন্ত এক অধ্যায়
তার ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যে মায়ের শরীর চরম আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ল। ডাক্তার বললেন অবিলম্বে ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। আমি তড়িঘড়ি করে গাড়ি ভাড়া করলাম। যেদিন আমরা চলে যাব, সেদিন গাড়িটা যখন আমাদের গেটের সামনে এসে দাঁড়াল, আমি দেখলাম অনু গেটের এক কোণায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি ওর কাছে গেলাম, কিছু একটা বলতে চাইলাম। কিন্তু অনু মাথা নিচু করে রইল। আমি স্পষ্ট দেখলাম, ওর চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। হয়তো একটা ছোট বাচ্চাও বুঝতে পেরেছিল যে ওর 'প্রত্যুষ ভাই' অনেক দূরে চলে যাচ্ছে। আমার বুকের ভেতরটা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছিল, কিন্তু মায়ের অসুস্থতার কারণে আমার কিচ্ছু করার ছিল না।
আমি গাড়ির পিছনের সিটে বসলাম। গাড়িটা যখন স্টার্ট দিল, আমি জানালার কাচ নামিয়ে শেষবারের মতো ওর দিকে তাকালাম। অনুও এতক্ষণে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাল। ওর চোখের সেই অশ্রুভেজা চাউনি দেখে আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।
গাড়ি চলতে শুরু করল। আমাদের মধ্যকার দূরত্বটা ক্রমশ বাড়তে লাগল... এক মিটার, দশ মিটার, এক কিলোমিটার...। আমি যতক্ষণ পেরেছিলাম জানালার বাইরে ঘাড় ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকিয়েছিলাম, যতক্ষণ না ও একটা বিন্দুর মতো মিলিয়ে গেল।
আজ দীর্ঘ ১০টি বছর কেটে গেছে। সেই ২০১৫ সালের পর অনুর সাথে আমার আর কোনোদিন দেখা হয়নি। ওরা কোথায় চলে গেল, অনু আজ কেমন আছে, কত বড় হয়েছে—আমি কিচ্ছু জানি কাশী জানি না। মাঝেমধ্যে ভাবি, এত গভীর ভালোবাসার পরও মানুষ কীভাবে জীবন থেকে এভাবে হারিয়ে যায়!
অনু হয়তো আজ সত্যি কোনো রাজপুত্রের প্রাসাদের রানী হয়েছে, হয়তো ও ওঁর প্রত্যুষ ভাইকে ভুলেই গেছে। কিন্তু আমার ঘরের অন্ধকারে, আজও যখন চোখ বন্ধ করি, সেই ক্লাস ফোরের ছোট্ট অনু, ওর সেই টিয়া পাখি আর পুতুলের বিয়ের গল্পটা অবিকল জীবন্ত হয়ে ওঠে। কিছু প্রথম প্রেম কখনো পূর্ণতা পায় না, তারা মনের এক অদৃশ্য গভীরতা হয়ে রয়ে যায়—যেখানে জল না থাকলেও ডুবে যাওয়াটা অনিবার্য।
সংগৃহীত