অতীতের ক্ষত এবং একটি নীরব প্রতিশোধের গল্প
"কোনো মেয়েই খারাপ হয়ে জন্মায় না, পরিস্থিতি আর চারপাশের মানুষ তাকে বদলে দিতে বাধ্য করে। অতীত যখন ক্ষতের মতো গভীরে বসে যায়, তখন বর্তমানের উপচে পড়া ভালোবাসাও মনে হয় এক নির্মম প্রহসন।"
আমার একটি ছোট বোন আছে। দেখতে দেখতে সে আজ জীবনে অনেক বড় জায়গায় পৌঁছে গেছে। খুব ভালো একটা চাকরি করে, মাসে প্রায় লাখ খানেক টাকা আয়। ওর জীবন এখন বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এক্কেবারে নিখুঁত। কিন্তু ওর ভেতরের একটা অন্য রূপ আমাকে প্রায়ই ভাবিয়ে তোলে।
সে তার শ্বশুরবাড়ির কাউকে সহ্য করতে পারে না। শাশুড়ী, ননদ—কাউকেই না। এমনকি তারা চোখের সামনে এলে বা তাদের কথা শুনলেও ও চরম মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। ও কোনোভাবেই চায় না যে তারা ওর সাজানো ফ্ল্যাটে আসুক কিংবা একটা দিনও এসে থাকুক।
একদিন ওর মুখে এসব কথা শুনে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম। আমি নিজের কৌতুহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা রে, তোর জামাই কি এসব জানে? ও কিছু বলে না?"
আমার বোন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিতকুটে হাসল। বলল, "হ্যাঁ আপু, ও খুব ভালো করেই জানে। ওর মা, বোন—ওরাও খুব ভালো করে জানে যে আমি ওদের কতটা ঘৃণা করি। আর আমার বর কিছু বলে না, কারণ সে নিজের চোখে দেখেছে ঠিক কতটা অত্যাচারিত আর নিপীড়িত আমি হয়েছি ওদের দ্বারা।"
এরপর বোন একে একে খুলে দিল তার স্মৃতির সেই অন্ধকার সিন্দুক, যা এতদিন সে বুকের ভেতর চেপে রেখেছিল।
সেদিনগুলো ছিল অন্যরকম। যখন ওর বিয়ে হয়েছিল, তখন ও আর ওর হাজবেন্ড দুজনেই ছিল নিতান্তই স্টুডেন্ট। আর্থিক কোনো সচ্ছলতা ছিল না। আর ঠিক এই সুযোগটাই নিয়েছিল ওর শ্বশুরবাড়ির মানুষজন। আমার বোন আর ওর ননদ ছিল সমবয়সী। কিন্তু সমবয়সী হলে কী হবে, ননদের সাথে ওর আচরণ করা হতো চাকরানির মতো। ননদের হাত-পায়ে সাবান মেখে দেওয়া, ও গোসল করে আসার পর ওর কাপড় ধুয়ে দেওয়া ছিল আমার বোনের রোজকার ডিউটি। বোনের নিজের বলতে কোনো শখের জিনিস থাকত না, যা ভালো লাগত সেটাই ননদ জোর করে ছিনিয়ে নিত।
একটা কাজের মেয়ের মতো ট্রিট করা হতো ওকে। প্রতিদিন যখন ননদ রিকশায় চড়ে রাজকীয় হালে কলেজে যেত-আসত, তখন আমার বোন মাইলের পর মাইল হেঁটে কলেজে যেত, আবার হেঁটে ফিরে এসে বুয়ার মতো সংসারের সব কাজ করত। ননদ ঘরে ফেরার পর তার খাবার বেড়ে একদম সামনে এনে পরিবেশন করতে হতো ওকে।
ছুটির দিনেও একটু শান্তির ঘুম ছিল ওর কপালে নিষিদ্ধ। কোনো বন্ধের দিন যদি ও ভুলে একটু বেশি ঘুমে তলিয়ে যেত, সকাল ৮টা বেজে যেত, সেদিন আর রক্ষে থাকত না। শাশুড়ী এসে ওর বাবা-মাকে তুলে জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন। ফুটপাত থেকে সস্তা ড্রেস কিনে এনে দেওয়া হতো ওকে, অথবা শাশুড়ী-ননদের পরে থাকা পুরনো বা বাতিল জামাকাপড় ওকেই পরতে হতো। তখন ওর হাজবেন্ড নিরুপায় হয়ে শুধু একটা কথাই বলত, "একটু ধৈর্য ধরো।"
একদিন দুপুরের একটি ঘটনা বোনের মনে আজীবন দাগ কেটে রেখে গেছে। দুপুরের খাবারের পর শরীরটা খুব খারাপ লাগায় ও বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। পাশে বসেই ননদ টিভি দেখছিল। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ৬টা বেজে গেল, কিন্তু শরীর এতই দুর্বল যে বোন বিছানা থেকে উঠতে পারছিল না। ওদিকে শাশুড়ী এসে দরজার বাইরে থেকে নোংরা ভাষায় গালাগালি শুরু করে দিলেন। অথচ তারা একবারও ফিরে দেখল না যে মেয়েটা কেন উঠছে না। বোন তখন তীব্র জ্বরে কাঁপছিল, কিন্তু সেই অবস্থায়ও কারও মনে একটুও দয়া হয়নি।
তারা নিজেরা কত সুন্দর সুন্দর দামি ড্রেস পরত, শপিং করে এনে একে অপরকে দেখাত, আর আমার বোন একটা জীর্ণ কাপড়ে কাজের মেয়ের মতো এক কোণে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাদের সেই আনন্দ দেখত।
আজ দিন বদলেছে। বোন নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত, ওর হাজবেন্ডও এখন খুব ভালো চাকরি করে। এখন ওদের টাকা-পয়সা, প্রাচুর্য সব আছে। আর এই রূপান্তর দেখেই আজ সেই শাশুড়ী আর ননদ ওর দিকে উপচে পড়া ভালোবাসা দেখাতে আসে।
বোন আমাকে প্রশ্ন করল, "এখন ওরা এত ভালোবাসা দেখাতে কেন আসে আপু? তখন তো দেয়নি। এখন আমি ওদের এই মেকি ভালোবাসা দিয়ে কী করব?"
বোনের কথাগুলো শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। সত্যি তো, কোনো বউই প্রথম থেকে খারাপ হয়ে আসে না, তাদের দিনের পর দিন অবহেলা আর অত্যাচার করে খারাপ হতে বাধ্য করা হয়। অতীতের সেই ক্ষতগুলো যখন পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়, তখন আর সেখানে কোনো ক্ষমার জায়গা থাকে না।
সংগৃহীত