অপূর্ণতার ওপারে তুমি: এক অন্য ভালোবাসার গল্প

সৌন্দর্য তো কেবল আয়নায় থাকে না, আসল সৌন্দর্য থাকে সেই চোখে—যা শরীর নয়, মন দেখে ভালোবাসতে জানে। নিবেদিতা আর অনিন্দ্যর এক মানবিক প্রেমের গল্প।


ছোটবেলা থেকেই নিবেদিতার নামের সাথে একটা অলিখিত তকমা জুড়ে গিয়েছিল—সে একটু মোটা। কথাটা শুনতে যতটা সহজ, সমাজ আর চারপাশের মানুষের ব্যবহারে তা সহ্য করা ততটাই কঠিন ছিল। পাড়ার কোনো অনুষ্ঠানে গেলে কেউ গাল টিপে বলত, "একটু কম খা মা!" আবার আত্মীয়স্বজনরা বাঁকা হেসে খোঁচা দিত, "এইভাবে বাড়তে থাকলে বিয়ে হবে কী করে?" এমনকি মা যখন ভালোবেসে থালায় একটা বাড়তি মিষ্টি বা মাছের বড় টুকরোটা তুলে দিতে যেতেন, তখনও চারপাশ থেকে উড়ে আসত মন্তব্য, "ওকে আর দিও না, আরও মোটা হয়ে যাবে!"

ধীরে ধীরে নিবেদিতা নিজের ইচ্ছেগুলোকে লুকিয়ে ফেলতে শিখল। মনের কোণে জমে উঠল একরাশ হীনমন্যতা। প্রিয় রসগোল্লাটা সামনে থাকলেও সে হাত বাড়াত না। পুজোয় নতুন জামা কেনার আনন্দটাও মাটি হয়ে যেত, কারণ দোকানে পা রাখলেই প্রথম প্রশ্ন শুনতে হতো—"এত বড় সাইজ আছে তো?"

সবচেয়ে বেশি কষ্ট সে পেয়েছিল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। বন্ধুদের আড্ডায় সে হয়ে উঠেছিল অনাবিল হাসি-মজার প্রধান বিষয়বস্তু। করিডোর দিয়ে হেঁটে গেলে পেছন থেকে ফিসফিসানি ভেসে আসত, "এই মোটি কার কপালে যে জুটবে!" সবাই হাসত, যেন একটা মানুষের আত্মসম্মান নিয়ে ঠাট্টা করাটাই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক নিয়ম। নিবেদিতা বাইরে থেকে হালকা হাসত ঠিকই, কিন্তু রাতের অন্ধকারে ওর বালিশটাই জানত, কতটা কান্না আর অপমান জমে আছে সেখানে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকেই দোষারোপ করত। ভাবত, হয়তো সুন্দর মুখাবয়ব থাকলেও একটু বাড়তি ওজন থাকলেই মানুষ আর মানুষ থাকে না—একটা সস্তা ঠাট্টার পাত্র হয়ে যায়। তাই সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল এক অদৃশ্য দেওয়ালে।

পড়াশোনা শেষ করে নিবেদিতা একটি স্কুলে শিক্ষিকার চাকরি পেল। আর সেখানেই তার জীবনে প্রথম আগমন ঘটল অনিন্দ্যর। প্রথম দিন থেকেই অনিন্দ্য লক্ষ্য করেছিল, মেয়েটা সবার সঙ্গে ভীষণ ভদ্রভাবে কথা বলে, কিন্তু নিজের সম্পর্কে কিছুই প্রকাশ করে না। কেউ প্রশংসা করলে নিবেদিতা শুধু মৃদু হেসে এড়িয়ে যায়। টিফিনের সময় নিজের খাবারটুকুও অর্ধেক রেখে দেয়, আর অন্যদের খেতে দেয়।

একদিন অনিন্দ্য হেসেই জিজ্ঞেস করল, "তুমি নিজে কিছু খাও না কেন?"
নিবেদিতা এক গাল ম্লান হেসে উত্তর দিল, "আরে আমার অভ্যাস হয়ে গেছে... বেশি খেলেই সবাই বলে আরো মোটা হয়ে যাচ্ছি।"
সেদিন অনিন্দ্য আর কিছু বলেনি। কিন্তু সে মনে মনে বুঝেছিল, এই মেয়েটার ক্ষুধা শুধু খাবারের নয়—একটু নিঃশর্ত ভালোবাসার, একটু সম্মানের।

দিন যত এগোতে লাগল, অনিন্দ্য আরও গভীরভাবে নিবেদিতাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। নিবেদিতা নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলে না, অথচ অন্যের দুঃখে সবার আগে পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। কাউকে সাহায্য করতে হলে নিজের ক্লান্তিটুকুও ভুলে যায়। তার হাসির মধ্যে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব ছিল, আর মনটা ছিল অনবদ্য সুন্দর।

একদিন স্কুল ছুটির পর অনিন্দ্য খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, "তুমি জানো, তোমার সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটা কী?"
নিবেদিতা লাজুক হেসে ভাবল রসিকতা করছে, বলল, "আমাকে নিয়ে মজা করছ!"
অনিন্দ্য মাথা নেড়ে অসম্মতি প্রকাশ করে গম্ভীর গলায় বলল, "উঁহু, তোমার মনটা আর তোমার মুখে যে শান্তিটা আছে, সেটা খুব কম মানুষের মধ্যে দেখি। তোমার শরীরের দিকে তাকিয়ে মানুষ যা খুশি বলতে পারে, কিন্তু আমি তোমার ভেতরের সততাকে দেখেছি। সেই মানুষটার প্রেমেই পড়েছি নিতু।"

সেদিন অনেক বছর পর নিবেদিতার চোখে জল এসেছিল। কিন্তু সে জল অপমানের নয়, বরং পরম প্রাপ্তির। কারণ অনিন্দ্য তাকে বলেছিল, "যারা শুধু শরীর দেখে বিচার করে, তারা কখনও মানুষের ভেতরটা দেখতে শেখে না..."

যে মেয়েটা একদিন ভাবত তার ভাগ্যে হয়তো কখনোই ভালোবাসা নেই, সেই মেয়েটাই বুঝল সত্যিকারের ভালোবাসা শরীরের মাপজোখ দেখে আসে না। সেদিনের পর থেকে নিবেদিতার জীবনটা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যে এতদিন শুধু নিজের খুঁতগুলোই খুঁজত, সে প্রথমবার নিজের ভেতরের সত্তাকে ভালোবাসতে শিখল। অনিন্দ্য প্রতিদিন ছোট ছোট যত্নে ওকে বুঝিয়ে দিত, ভালোবাসা মানে কাউকে বদলে দেওয়া নয়, তাকে যেমন আছে তেমনভাবেই আগলে রাখা।

স্কুলে যাওয়ার আগে অনিন্দ্যর স্পষ্ট মেসেজ চলে আসত—"ঠিকমতো খেয়ে নিও, আমি যা যা দেব।" টিফিনের সময় নিজের প্রিয় খাবারটা ভাগ করে নেওয়া কিংবা নিবেদিতার মন খারাপ বুঝে চুপচাপ পাশে বসে থাকা—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো নিবেদিতার বুকে জমে থাকা বছরের বছর অপমান আর হীনমন্যতার ক্ষতগুলোকে ধীরে ধীরে সারিয়ে তুলছিল। সে বুঝতে পারল, পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ আছে, যে তার শরীরের ওজন পরিমাপ করে না; বরং তার মুখে হাসিটা ঠিক আছে কিনা, সেটাই খোঁজে।

আজও হয়তো কেউ কেউ নিবেদিতাকে দেখে আড়ালে বলে, "একটু রোগা হলে আরও সুন্দর লাগত!" কিন্তু এখন আর সেই কথাগুলো তাকে আঘাত করতে পারে না। কারণ, সে জানে—বাড়িতে একজন মানুষ তার জন্য অপেক্ষা করে আছে, যে তার প্লেট থেকে শেষ রসগোল্লাটা কেড়ে নেয় না, বরং নিজের হাতেই তুলে দিয়ে বলে, "খেয়ে নাও। তুমি নিজের শরীরের যত্ন করছ না কিন্তু। তুমি তো জানো আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা তুমি। তোমার হাসিটা যেন কখনও না হারিয়ে যায়।"

ভালোবাসা তখনই পূর্ণ হয়, যখন একজন মানুষ অন্যজনের শরীরের মেদ নয়, তার বুকের ভেতরে জমে থাকা ভালোবাসা, অভিমান, চোখের জল আর নিঃস্বার্থ মনটাকে নিজের করে নিতে শেখে। অনিন্দ্য কখনও নিবেদিতাকে রোগা হতে বলেনি, নিজেকে বদলাতে বলেনি। বরং প্রতিদিন একটু একটু করে তাকে নিজের মতো করেই ভালোবাসতে শিখিয়েছে। সে সবসময় বলে, "গোটা পৃথিবী তোমাকে যেমনই দেখুক, আমি তোমাকে তোমার মন দিয়ে চিনেছি—আর সেই মনটার প্রেমেই পড়েছি।"

হয়তো এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা। যেখানে শরীরের মাপ নয়, হৃদয়ের গভীরতাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। সব ভালোবাসার গল্পে রাজকুমার আসে না। কিছু গল্পে এমন একজন সাধারণ মানুষ আসে, যে আপনার ভেঙে যাওয়া আত্মবিশ্বাসটা দু'হাতে আগলে রেখে কানে কানে বলে—"তুমি বদলে গেলে আমি ভালোবাসব না, তুমি যেমন আছ ঠিক তেমন ভাবেই তোমাকে আগলে রাখতে চাই।"


সংগৃহীত