অন্ধকার চেম্বার এবং একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস
অহংকারের পতন ও জীবনের জয়
গল্প ডেস্ক
ডাক্তারের চেম্বারে বসা আশাবরী দেবীর একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস আর অনুশোচনার এক গল্প। ১২ বছর আগে অহংকারবশত করা ভুল কীভাবে তাঁর নিজের জীবনে একাকীত্বের ছায়া নিয়ে এল?
ডাক্তারের চেম্বারে বসে একা অপেক্ষা করছিলেন আশাবরী দেবী। বেশ কিছুদিন ধরে বুকে চাপ ধরা ব্যথা, মাথায় যন্ত্রণা। ছেলে গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টও করে দিয়েছে, কিন্তু নিজে কিংবা তার বউমার সময় হয়নি মায়ের সাথে আসার। দুজনের কেউই অফিস থেকে ছুটি পায়নি, তাছাড়া স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যেও সম্পর্কের টানাপোড়েন চরমে।
এমন সময় চেম্বার থেকে এক বয়স্ক মহিলা বের হলেন, যাঁর সঙ্গে তাঁর ছেলে এবং বউমা দুজনেই এসেছেন এবং অত্যন্ত যত্নে তাঁকে আগলে রেখেছেন। সেই মহিলার সাথে আলাপে আশাবরী দেবী যখন শুনলেন যে বুকে ব্যথার কথা শুনেই বউমা নিজে তড়িঘড়ি করে ছেলেকে অফিস থেকে ডেকে এনে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছে, তখন তাঁর নিজের বুকটা ব্যথায় মুচড়ে উঠল। নিজের পছন্দ করে আনা বউমার সাথে তাঁর বনিবনা হয়নি, আর ছেলেও আজ যান্ত্রিক কর্তব্যের বাইরে মায়ের পাশে দাঁড়ানোর সময় পায় না。
অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ এবং ১২ বছরের পুরনো অতীত
হঠাৎ ডাক্তারের ঘর থেকে বের হয়ে এল এক তরুণী— চন্দ্রিমা। আশাবরী দেবীকে একা বসে থাকতে দেখে সে চমকে উঠল এবং এগিয়ে এসে কুশল জিজ্ঞেস করল। চন্দ্রিমা জানতে পারল আশাবরী দেবীর ছেলে শুভেন্দু আসেনি, তিনি একাই এসেছেন। চন্দ্রিমা তখন নিজের স্বামী সোমনাথকে (যে শুভেন্দুরই ক্লাসমেট ছিল) নিজের মায়ের সাথে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে নিজে থেকে গেল আশাবরী দেবীকে সাহায্য করার জন্য。
এই উদারতা দেখে আশাবরী দেবীর চোখ জলে ভরে উঠল। ঠিক ১২ বছর আগে এই চন্দ্রিমা আর শুভেন্দুর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আশাবরী দেবী চন্দ্রিমার জন্মতারিখ ও কোষ্ঠী বিচার করে দাবি করেছিলেন যে মেয়ের ‘ভৌমদোষ’ আছে, এই বিয়ে হলে তিনি নাকি ছেলের মরা মুখ দেখবেন! চন্দ্রিমার কান্না, অনুনয়-বিনয় কোনো কিছুই সেদিন আশাবরী দেবীর অন্ধ জেদ আর অহংকারকে টলাতে পারেনি। শুভেন্দুও মায়ের কথামতো সহজেই চন্দ্রিমাকে ছেড়ে অন্য জায়গায় বিয়ে করে নিয়েছিল。
অহংকারের পতন ও জীবনের জয়
ডাক্তার দেখানোর পর জানা গেল আশাবরী দেবীর হাই প্রেসার ও গ্যাসের সমস্যা। চন্দ্রিমা নিজের মেয়ের মতো করে ডাক্তারের থেকে সব ওষুধপত্র বুঝে নিল এবং তাঁকে গাড়িতে করে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে এল। বাড়ির গেটের সামনে এসে অপরাধবোধে দগ্ধ আশাবরী দেবী চন্দ্রিমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, "ক্ষমা... ক্ষমা কোরো আমাকে মা।"
কিন্তু চন্দ্রিমা আজ এক শান্ত, পরিণত নারী। সে মৃদু হেসে আশাবরী দেবীর হাতে আলতো চাপ দিয়ে জানাল, তার মনে কোনো ক্ষোভ নেই। সোমনাথের মতো জীবনসঙ্গী পেয়ে সে আজ ভীষণ ভালো আছে। সোমনাথ চন্দ্রিমার কোষ্ঠীর দোষের কথা জেনেও তাকে বিয়ে করতে দুবার ভাবেনি। চন্দ্রিমা বলল, "এখন বুঝি যা হয় মঙ্গলের জন্য... আমার মনের মধ্যে তো আর কোনো অভিযোগ নেই কাকিমা, আপনারা ভালো থাকুন।"
উপসংহার
চন্দ্রিমা হাসিমুখে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে চলে গেল নিজের সুখী গৃহকোণের দিকে। আর পেছনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন আশাবরী দেবী— যাঁর সাজানো সংসার আজ একাকীত্বে ভরা, আর যাঁর তথাকথিত "ভৌমদোষযুক্ত" মেয়েটি আজ অন্যের সংসার আলো করে প্রকৃত সুখের স্বাদ পাচ্ছে। কুষ্ঠির কাগজের চেয়ে যে মানুষের মন আর নিয়তি অনেক বড়, তা প্রমাণ করে দিয়ে গেল চন্দ্রিমা。
সংগৃহীত