অহংকারের লড়াই ও এক ঝুড়ি ডিম
ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতেই হয়!
টম অ্যান্ড জেরির মতো অহংকার আর খুনসুটির এক জমজমাট লড়াই
গ্রামের প্রভাবশালী মুরুব্বি মকবুল ভুঁইয়ার ড্রয়িংরুমে তখন গমগম করছে পরিবেশ। সোফায় বেশ আয়েশ করে, বুকে হাত বেঁধে বসে আছে এক শহুরে তরুণ। তার চোখেমুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই। মকবুল ভুঁইয়ার গম্ভীর গলার প্রথম প্রশ্ন ধেয়ে এলো, "নাম কী?"
ছেলেটির পুরো নাম শাহরিয়ার আলম চৌধুরী, কিন্তু ছোটবেলায় একটু বেশি গোলগাল আর সুন্দর ছিল বলে মা ভালোবেসে ডাকতেন 'শুভ্র'। সেই থেকে ক্লাস-ক্যাম্পাস সব জায়গায় সে শুভ্র নামেই পরিচিত। শুভ্রর চোখ অবশ্য ঘরের আভিজাত্যের দিকে ছিল না, তার নজর ছিল ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা হানিরার দিকে। হানিয়া এই বাড়িরই মেয়ে, যার বিয়ে ঠিক হয়েছে শুভ্রর বন্ধু সাব্বিরের সাথে। হানিয়া তখন রাগে দাঁতে দাঁত পিষছে আর চোখ বড় বড় করে শুভ্রর দিকে তাকাচ্ছে।
মকবুল ভুঁইয়া একের পর এক প্রশ্ন করে চললেন— বাড়ি কোথায়? বাবার নাম কী? পড়াশোনা কতদূর? শুভ্রও বেশ ঠান্ডা মাথায় জবাব দিচ্ছিল— পুরান ঢাকা, বাবার নাম ফজলে আলম চৌধুরী, পড়াশোনা শেষ। কিন্তু গোল বাধল যখন প্রশ্ন হলো, "কী করো?" শুভ্র একগাল হেসে বলল, "কী করি সেটা বড় কথা নয়, আসল কথা হলো আমি এখনও বাবার হোটেলে থাকি!"
এই কথা শুনে মকবুল ভুঁইয়ার চোখ চড়কগাছ! শুভ্র এখানেই থামল না, সে আরও বাড়িয়ে বলল যে যেদিন সে বাংলাদেশের একমাত্র আম্বানি হয়ে রাজপ্রাসাদ বানাবে, সেদিন নিজের ঢাক পিটাবে। মকবুল ভুঁইয়া রেগে গিয়ে বললেন, "আমি এখানে সিরিয়াস কথা বলতে বসেছি, মশকরা করতে আসিনি!" ঠিক তখনই হানিয়ার বাবা আকবর ভুঁইয়া মূল ক্ষোভটা উগরে দিলেন, "আমাদের বাড়ির মেয়েকে রাস্তায় ধাক্কা দিয়েছ কেন? আবার তাকে কাজের মেয়ের সাথে তুলনা করলে কেন?"
শুভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল, "বেখেয়ালিতে ধাক্কা লেগে গেছে। আর বিয়ের কনে তো সাধারণত বাড়ির ভেতরে থাকে, রাস্তায় কাদামাটি মেখে ঘুরে বেড়ায় না। ওকে দেখে তো কোনো পরীস্থানের পরী মনে হয়নি, যা মনে হয়েছে তাই বলেছি।"
এই নিয়ে ড্রয়িংরুমে তুমুল ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। হানিয়া রেগে চিৎকার করে বলল, "আপনি একটা অসভ্য!" শুভ্রও কম যায় না, সে প্রত্যুত্তরে বলল, "জি, আর আপনি ভীষণ সভ্য! সভ্যতার প্রমাণ তো অলরেডি পেয়ে গেছি।" মকবুল ভুঁইয়া গর্জে উঠলেন, "খামোশ! এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। এখানে এভাবে বেয়াদবি অ্যালাও না। শুভ্র, ক্ষমা চাও!" শুভ্র সাফ জানিয়ে দিল, "ভদ্রতা আগে আপনার বাড়ির মেয়েকে শেখান। ও ক্ষমা না চাইলে আমিও চাইব না।"
শুভ্রর বন্ধু সাব্বির এবং ভাই শোয়েব পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল। আকবর ভুঁইয়াও বুঝলেন দুজনেই সমান ঘাড়ত্যাড়া, কেউ হার মানবে না। তাই তিনি সাব্বিরকে বললেন শুভ্রকে নিয়ে চলে যেতে। যাওয়ার আগে হানিয়া তুড়ি বাজিয়ে হুমকি দিল, "এই যে মিস্টার, আপনাকে আমি দেখে নেব।" শুভ্রও শার্টের হাতা গুটিয়ে, চুলে হাত বুলিয়ে শাহরুখ-সালমানের মতো পোজ মেরে বলল, "দেখুন না! কোন নায়কের মতো লাগছে বলুন তো?" হানিয়া ত্যক্তবিরক্ত হয়ে 'অসহ্য' বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শুভ্ররাও বিদায় নিল, কিন্তু মকবুল ভুঁইয়ার মনে অপমান আর রাগের আগুন জ্বলতে থাকল।
পরদিন সকালে গ্রামে এক অন্য কাণ্ড ঘটল। শুভ্র আর শোয়েব বাজারে এসেছিল কিছু কেনাকাটা করতে। ফেরার পথে হুট করে শোয়েবের মনে পড়ল সে ডিম কিনতে ভুলে গেছে। বাড়িতে রান্নার জন্য বাবুর্চি অপেক্ষা করছে, দেরি হলে মানইজ্জত যাবে। শোয়েব তাড়াহুড়ো করে শুভ্রর হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলল, "তুই কয়েক ট্রে ডিম কিনে আয়, আমি সাইকেল নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি।" শুভ্রকে মাঝরাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে শোয়েব চম্পট দিল।
শুভ্র বেশ সাবধানে কয়েক ডজন ডিম কিনে আস্তে ধীরে হাঁটতে লাগল, যাতে একটা ডিমও না ভাঙে। কিন্তু গ্রামের পিচঢালা রাস্তায় কিছুটা আসতেই এক আজব বিপদ ঘটল। একদল দুষ্টু ছেলে একটা পাগলা কুকুরকে তাড়া করছিল, কুকুরের গলার লোহার চেইনটা হাত থেকে ফস্কে যেতেই কুকুরটি আচমকা শুভ্রর পেছনে তাড়া করল!
"ও বাবা গো, মা গো!" বলে হাতের ডিমের ট্রে নিয়ে শুভ্র দিল দৌড়। কিন্তু কুকুর তো থামার নামই নেয় না। ঘেউ ঘেউ শব্দে দিশেহারা হয়ে শুভ্র রাস্তার পাশে একটা ছোট ছড়ায় (পাহাড়ি বা গ্রামীণ নালা) ঝাঁপ দিল। আর সাথে সাথে সব ডিম ভেঙে পানির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল!
শুভ্র যখন মাথায় হাত দিয়ে কাদাপানিতে অর্ধডুবন্ত অবস্থায় বসে আছে, তখন পাড় থেকে ভেসে এল এক চেনা হাসির শব্দ। তাকিয়ে দেখে— সেখানে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং হানিয়া! কুকুরের চেইনটা তার হাতে। হানিয়া বিজয়ীর মতো হেসে বলল, "হিরোগিরি শ্যাষ?"
শুভ্রর বুঝতে বাকি রইল না যে এটা হানিয়ারই কারসাজি। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে কাদা থেকে উঠে বলল, "আপনার না বিয়ে? বিয়ের কনে এত নির্লজ্জ হতে পারে?" হানিয়াও ধমকে উঠে বলল, "খবরদার! এটা আমার এলাকা, এখানে আমি যা খুশি করব।"
শুভ্রও ছাড়ার পাত্র নয়। সে ভাঙা ডিমের ট্রে থেকে যতটুকু কুসুম আর কাদা অবশিষ্ট ছিল, তা তুলে ছুড়ে মারল হানিয়ার দিকে! মুহূর্তের মধ্যে হানিয়ার সুন্দর সাজানো শরীর ডিমের কুসুম আর কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল। শুভ্র হেসে বলল, "ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতেই হয়! এটা ভুলে যাবেন না।"
হানিয়া রাগে অন্ধ হয়ে হাতের মুঠোয় থাকা কুকুরের চেইনটা আবার ছেড়ে দিল। কুকুরটা আবারও ঘেউ ঘেউ করে শুভ্রকে তাড়া করল। জান হাতে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে শুভ্র চিৎকার করে বলল, "আপনি তো শয়তানের নানির চেয়েও ভয়ঙ্কর! সুযোগ আসুক আবার, দেখাব মজা..."
হানিয়া বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, "ঘোড়ার ডিম দেখাবেন আপনি আমায়!"
দৌড়াতে দৌড়াতে শুভ্র বলল, "আপনি এভাবে আমার পেছনে পড়েছেন কেন? আমি তো ক্যাটরিনা বা দীপিকার অপেক্ষায় আছি, কোনো জরিনা-ফরিনার পেছনে পড়িনি!"
হানিয়া জবাব দিল, "যেই না একখান চেহারা! কাজের মেয়ে রহিমাও আপনার দিকে ফিরে তাকাবে না।"
শেষমেশ শুভ্র একটা গাছের ডাল ভেঙে কুকুরটাকে থামানোর চেষ্টা করতে করতে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, "এর শোধ আমি তুলবই, মিস হানিয়া তাহসীন! আজ না হোক কাল, আপনাকে আমি পাল্টা দৌড় ঠিকই দেব।" দুজনের এই অহংকার আর মধুর প্রতিশোধের লড়াই যেন সহজে থামার নয়!
সংগৃহীত