অবহেলার মূল্য

"রক্ত যখন স্বার্থের কাছে হেরে যায়, তখন এক অচেনা ভাগ্য এসে নতুন যুদ্ধের ডাক দেয়! দেখুন অবহেলার চরম মূল্য।"

সিএমএইচের (CMH) একটা ঠান্ডা কেবিনে বসে যখন আমি নিজের পা বাঁচানোর শেষ লড়াইটা লড়ছিলাম, তখন বুঝতে পারিনি যে আমার নিজের রক্তই আমার সবচেয়ে বড় শত্রু। সেনাবাহিনীর পোশাকটা তখনো আমার গায়ে জড়ানো। যে দেশের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে এক মুহূর্ত ভাবিনি, আজ সেই নিজের পা দুটোকে সচল রাখার জন্য মাত্র পাঁচ লাখ টাকার অভাবে আমি নিস্প্রাণ পাথরের মতো পড়ে আছি। হাঁটুর মোটা ব্রেসটা কামড়ে ধরছিল, আর যন্ত্রণায় পুরো শরীর কাঁপছিল। ডাক্তার পরিষ্কার বলে দিয়েছেন—সঠিক সময়ে অপারেশন না হলে আমি চিরদিনের মতো পঙ্গু হয়ে যাব।

অথচ ঠিক ওই মুহূর্তে আমাদের বাড়িতে চলছিল এক রাজকীয় উৎসব। আমার ছোট বোন মেহরিনের জন্য বাবা-মা দেড় কোটি টাকা দিয়ে একটা বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন। শ্যাম্পেনের বদলে দামি জুস আর কেক কেটে আনন্দ-উল্লাস চলছে। আমি বুক ভরা আশা আর তীব্র দ্বিধা নিয়ে বাবাকে ফোন করেছিলাম।
কাঁপছে গলায় বললাম, "বাবা, ডাক্তার বলেছেন খুব দ্রুত অপারেশন করতে হবে। পাঁচ লাখ টাকা লাগবে। আমি কখনো কিছু চাইনি, কিন্তু এবার সত্যিই তোমাদের সাহায্য দরকার।"

ফোনের ওপার থেকে কোনো সান্ত্বনা এলো না। কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভেসে এলো শুধু আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর হাসির আওয়াজ। তারপর বাবার বিরক্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "জয়, এখন এসব বলার সময় না। আজ তোর বোন মেহরিনের জন্য দেড় কোটি টাকার গাড়ি কিনেছি। সবাই খুব ব্যস্ত আছি।"

আমি স্তম্ভিত হয়ে শুধু বলতে পারলাম, "গাড়ি?"
পাশ থেকে মা হেসে উঠে টিপ্পনী কাটলেন, "ওকে বলো, এত নাটক না করতে!"
এরপর মেহরিন ফোনটা কেড়ে নিয়ে নির্দয়ভাবে বলল, "ভাইয়া, প্লিজ! আমার আনন্দের দিনটা নষ্ট কোরো না। একটা ব্যথার জন্য এত ড্রামা করার কী আছে? ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।"

একটি কথাও আর না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দিলাম। সেদিন টের পেয়েছিলাম, যে ছেলে দেশের জন্য জীবন বাজি রাখে, নিজের পরিবারের কাছে তার জীবনের মূল্য পাঁচ লাখ টাকাও নয়।

কিন্তু রক্তের সব বাঁধন তো আর এক হয় না। দুদিন পর আমার বাসার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। দরজা খুলে দেখি আমার ছোট ভাই রায়ান দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো লাল, মুখটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। ওর হাতে ছিল একটা পুরনো খাম।

খামটা আমার হাতে দিয়ে নিচু স্বরে বলল, "ভাইয়া... এখানে ৮৪ হাজার টাকা আছে।"
আমি অবাক হয়ে তাকাতেই রায়ান মাথা নিচু করে বলল, "দাদুর রেখে যাওয়া গ্যারেজের সব যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিয়েছি।"

আমার বুকটা হাহাকার করে উঠল। ওগুলো শুধু কিছু লোহা-লক্কড় ছিল না, ওটাই ছিল রায়ানের স্বপ্ন। একদিন নিজের একটা গ্যারেজ খুলবে—এই স্বপ্ন নিয়েই ও বড় হয়েছে। আজ আমার ভবিষ্যৎ বাঁচাতে ও নিজের স্বপ্নটাকেই বেঁচে দিল!

এরপর পকেট থেকে একটা লটারির টিকিট বের করে আমার হাতে দিয়ে হেসে বলল, "বাকি টাকা দিয়ে এটা কিনেছিলাম। জানি না কেন... মনে হলো, আল্লাহ হয়তো আমাদের জন্য একটা অলৌকিক কিছু রেখে দিয়েছেন।"

পরদিন সকালে যখন লটারির ফলাফল মেলাচ্ছিলাম, আমার হাত কাঁপছিল। একবার মেলালাম... দুইবার মেলালাম... তারপর যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। প্রতিটা নম্বর হুবহু মিলে গেছে! আমি লটারিতে দুই কোটি চল্লিশ লাখ টাকা জিতে গেছি! রায়ান তখনো ক্লান্তিতে সোফায় ঘুমাচ্ছিল। আমি কাউকে জানালাম না—না বাবা-মাকে, না বোনকে। কোনো উৎসবও করলাম না।

হাঁটুর ব্রেস পরে, ক্রাচে ভর দিয়ে সোজা ঢাকার এক বিখ্যাত আইনজীবীর চেম্বারে গেলাম। টেবিলের ওপর লটারির টিকিটটা রেখে শক্ত গলায় বললাম, "আমি চাই এই টাকা সম্পূর্ণ গোপনে ক্লেইম করা হোক। আর আমার বাবা-মায়ের সব আর্থিক লেনদেন খুঁটিয়ে তদন্ত করা হোক।"

আইনজীবী বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকালেন, "আপনি জানেন, এর মানে কী?"
আমি শান্ত গলায় বললাম, "হ্যাঁ। এর মানে যুদ্ধ।"
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, "নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে?"

আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল বাবার ফোন কেটে দেওয়া, মায়ের সেই নিষ্ঠুর ঠাট্টা, আর বোনের উপহাস। আর তার পাশেই ভেসে উঠল ছোট ভাই রায়ানের চোখের জল, যে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিল।

আমি ধীরে মাথা নাড়লাম, "হ্যাঁ। সত্যটা যত গভীরেই লুকিয়ে থাকুক, আমি সব জানতে চাই।"

আইনজীবী একটা নতুন ফাইল খুললেন। ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। কয়েক সেকেন্ড কথা বলার পর আইনজীবীর মুখের রঙ পুরো বদলে গেল। তিনি ধীরে ফোনটা নামিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তার কণ্ঠে এমন এক গম্ভীরতা ছিল, যা বুঝিয়ে দিচ্ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর সত্যটি এখন প্রকাশ হতে যাচ্ছে।

তিনি বললেন, "জয়... আপনার এখনই এটা শোনা দরকার।"

চলবে......


সংগৃহীত