নীরবতার চেয়ে বড় প্রতিশোধ আর কিছু হয় না (পর্ব - ০১)
"আমার স্বামী নিজের পুরোনো প্রেমিকাকে আমাদের নতুন বাসার দাওয়াতে ডাকল... আমি যখন বললাম এটা স্বাভাবিক না, তখন সে শুধু ঠান্ডা গলায় বলেছিল— 'ভালো না লাগলে দরজা খোলা আছে।' সেদিন আমি চিৎকার করিনি... কান্নাও করিনি। শুধু এমন একটা উত্তর দিয়েছিলাম, যেটা শুনে তার মুখের রঙ বদলে গিয়েছিল..."
নতুন ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের ঠান্ডা মেঝের ওপর হাঁটু মুড়ে বসে ছিলাম আমি। মাথার চুলগুলো কোনোমতে এলোমেলো করে খোঁপা করা, গায়ে জড়ানো পুরোনো একটা সুতির কামিজ। হাতজোড়া ডিটারজেন্ট আর পাইপের ময়লায় মাখামাখি। সকাল থেকেই বেসিনের নিচের পাইপটা চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ছিল, দেখতে দেখতে পুরো রান্নাঘর পানিতে ভেসে গেছে। হাতে একটা রেঞ্জ নিয়ে কোনোমতে সেটা ঠিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম।
ঠিক তখনই... ধাম করে দরজা লাগার একটা শব্দে পুরো ফ্ল্যাটটা যেন কেঁপে উঠল। ড্রইংরুমের দেয়ালে টাঙানো শখের ফ্রেমগুলো পর্যন্ত সেই শব্দের ধাক্কায় দুলে উঠল। আমি বেসিনের নিচ থেকে মাথাটা বের করে তাকাতেই দেখলাম— রায়হান দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সেই চেনা, পরিচিত কঠিন ভাব... যেন অফিসের কোনো বড় বস তার অধিনস্থ কর্মচারীকে জেরা করতে এসেছেন।
দুই হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে, একদম ঠান্ডা এবং নিরুত্তাপ গলায় সে বলল, — "মেহরীন, শনিবারের ব্যাপারে আমাদের কথা বলা দরকার।"
শনিবার। অর্থাৎ আর মাত্র দুদিন পর আমাদের নতুন বাসার গৃহপ্রবেশের দাওয়াত। গত একটা মাস ধরে এই একটা দিনের জন্য আমি কতটা খেটেছি, তা শুধু আমিই জানি। কত রাত না ঘুমিয়ে জানালার পর্দা মিলিয়েছি, দেয়ালের পারফেক্ট রঙটা খুঁজে বের করেছি, নিজের হাতে কুশনের কাভারগুলো সেলাই করেছি।
আমি ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে তার দিকে তাকালাম। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, — "কী হয়েছে শনিবারে?"
সে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে এমন একটা ভাব নিল, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত কথাটি বলতে যাচ্ছে। — "আমি একজনকে ইনভাইট করেছি... ওর আসাটা আমার জন্য খুব ইম্পর্ট্যান্ট। তাই চাই তুমি সেদিন কোনো সিন ক্রিয়েট করবা না। ম্যাচিউরলি হ্যান্ডেল করবা। না পারলে... সেটা কিন্তু বড় সমস্যা হবে।"
কথাটা শুনতেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধপ করে উঠল। একটা অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধল মনে। আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম, — "কে?"
সে এক সেকেন্ডও দেরি করল না। চোখের পলক না ফেলে উত্তর দিল, — "তৃষা।"
শব্দটা কানে আসতেই মনে হলো কেউ আমার বুকের ভেতর আস্ত একটা কাঁচের গ্লাস আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলল। তৃষা! রায়হানের এক্স-ফিয়ঁসে। যার নামটা আমাদের বিয়ের পর এই তিন বছরেও আমাদের সংসারের ভেতর থেকে কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। যে মেয়ের ফেসবুক পোস্টে রায়হান আজও 'পুরোনো বন্ধু' বলে রিঅ্যাক্ট দেয়। যার ছবি স্ক্রিনে দেখলে সে এখনও চুপচাপ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। যার নামটা আমাদের সংসারের ভেতর এমনভাবে মিশে ছিল... যেন আগুন নিভে যাওয়ার পরও ঘরের কোণে কিছু কালো ধোঁয়া রয়ে যায়।
আমার হাত থেকে লোহার রেঞ্জটা টাইলসের ওপর পড়ে টুং করে শব্দ হলো। আমি নিজের ভেতর সবটুকু শক্তি সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে বললাম, — "তুমি তোমার পুরোনো প্রেমিকাকে আমাদের বাসার অনুষ্ঠানে ডাকছ?"
রায়হান একটুও লজ্জিত না হয়ে অবহেলা ভরে কাঁধ ঝাঁকাল। — "হ্যাঁ। আমরা এখন খুব ভালো বন্ধু। আর যদি এটা নিয়ে তোমার সমস্যা হয়, তাহলে সেটা তোমার ইনসিকিউরিটি। আমার না।"
তার মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিটা শব্দ ছিল অপমানের চাবুকের মতো। এটা কোনো আলোচনা ছিল পণ্ডিতদের... এটা ছিল আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
সে আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে অহংকারের সুরে বলল, — "আমি চাই তুমি একটু ক্লাসি বিহেভ করো। পারবা তো?"
সে হয়তো আশা করেছিল আমি এবার চিৎকার করব, কান্নাকাটি করব, কিংবা তার সাথে তুমুল ঝগড়ায় মেতে উঠব। কিন্তু আমি তাকে সেই সুযোগটা দিলাম না। আমি শুধু হাসলাম। খুব ছোট, ভীষণ শান্ত একটা হাসি। আমার সেই হাসিটা এতটাই নির্লিপ্ত ছিল যে রায়হান নিজেই এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
আমি বললাম, — "অবশ্যই। তুমি যেহেতু এত চাইছ... উনি অবশ্যই আসবেন।"
রায়হান ভুরু কুঁচকে তাকাল, যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। — "মানে? এত সহজে মেনে নিলা?"
আমি নরম গলায় বললাম, — "তোমার গুরুত্বপূর্ণ মানুষ... আপ্যায়ন তো করতেই হবে।"
সে কয়েক সেকেন্ড আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। যাওয়ার সময় পকেট থেকে মোবাইল বের করল। হয়তো তৃষাকে মেসেজ দিচ্ছে— "সব কন্ট্রোলে আছে।"
রুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হতেই আমি আমার ফোনটা হাতে নিলাম। সবার আগে কল দিলাম সাদিয়াকে। আমার কলেজ লাইফের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। ওপাশ থেকে ওর ঘুম জড়ানো গলা ভেসে এল, — "হ্যালো? কী হয়েছে?"
আমি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললাম, — "তোর বাসার গেস্টরুমটা খালি আছে?"
সাদিয়া ওপাশে একদম চুপ হয়ে গেল। তারপর ধীরে বলল, — "মেহরীন... কী হয়েছে?"
আমি জানালার বাইরে তাকালাম। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে নিভে গিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। — "শনিবারের পর হয়তো কিছুদিন থাকতে হবে।"
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর খুব আস্তে উত্তর এল— — "চলে আয়।"
পরদিন থেকে রায়হান যেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। অফিস থেকে বারবার ফোন করছে— "কাবাব নাকি রোস্ট ভালো হবে?" "ফুল সাদা নাকি লাল আনব?" "প্লেলিস্টটা একটু শুনে দেখো তো!" তার চোখেমুখে এমন উত্তেজনা... যেন এটা আমাদের যৌথ কোনো সংসারের অনুষ্ঠান না, বরং তার ব্যক্তিগত কোনো বিরাট সাফল্য।
আর আমি? আমি তখন রায়হানের অলক্ষ্যে আলাদা একটা তালিকা বানাচ্ছিলাম। আমার দরকারি জিনিসপত্রের তালিকা। আমার জামাকাপড়। আমার ল্যাপটপ। মায়ের দেওয়া সোনার চুড়ি। বাবার পুরোনো ঘড়ি। নিজের টাকায় কেনা কফি মেশিন। আমার প্রিয় বইগুলো। এমনকি ড্রইংরুমের ছোট কাঠের চেয়ারগুলোও... যেগুলোর কভার আমি নিজের হাতে বানিয়েছিলাম আর রায়হান দেখে হেসে বলেছিল— "গ্রামের মতো লাগে।"
সেদিন রাতেই আমি চুপচাপ নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আমার জমানো সব টাকা সরিয়ে নিলাম। বাসার যাবতীয় খরচের হিসাব করে আমার অংশের টাকাটা মিটিয়ে দিলাম। যেন পরে রায়হান বা তার পরিবার কোনোদিন বলতে না পারে— "আমি ওর ঘাড়ে বসে খেয়েছি।"
রাতের দিকে রায়হান ড্রইংরুমে নতুন লাইটগুলো ঝোলাচ্ছিল। খুব খুশি গলায় আমাকে ডেকে বলল, — "এই লাইটগুলো ধরো তো একটু।"
আমি এগিয়ে গিয়ে ধরলাম। আমরা একসাথে টেবিল সাজালাম, শরবতের গ্লাস ধুয়ে রাখলাম, নতুন টেবিলক্লথ বিছালাম। সে তখন আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আদিখ্যেতা করে কথা বলছিল— — "দেখো মেহরীন... এই বাসা থেকে আমাদের নতুন জীবন শুরু হবে।"
আমি দেয়ালের দিকে তাকালাম। এই দেয়ালে আমার নিজের হাতের রঙ লেগে আছে। এই ঘরের কোণে কোণে আমার ঘাম, সময় আর স্বপ্ন সব মিশে আছে। আমি ধীরে বললাম, — "হ্যাঁ... শনিবারটা সত্যিই একটা টার্নিং পয়েন্ট হবে।"
রাতে হঠাৎ সে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল। — "তৃষা আসছে। আর বাসার জন্য নাকি অনেক সুন্দর একটা গিফটও আনছে।"
আমি পানির গ্লাসটা টেবিল নামিয়ে বললাম, — "বাহ। খুব ভালো।"
সে এবার একটু কৌতূহলী চোখে তাকাল। — "তুমি অদ্ভুত রকম শান্ত।"
আমি তার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে উত্তর দিলাম, — "তুমিই তো বলেছিলে ম্যাচিউর হতে।"
শনিবার। বিকেল চারটা। পুরো ফ্ল্যাট মানুষে ভর্তি। চারদিকে হাসির শব্দ, কাঁচের গ্লাসের টুংটাং, বিরিয়ানির গরম মসলার চেনা সুবাস... চারদিকে যেন একটা উৎসবের আমেজ। কিন্তু এই উৎসবের মাঝেও মানুষের ফিসফিসানি থামছিল না।
— "শুনছিস? ওর এক্স নাকি আসতেছে!"
— "ভাবী রাজি হলো কীভাবে?"
— "এই রায়হান ভাইও না..."
যখনই কেউ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে এসেছে, আমি শুধু আলতো হেসেছি আর বলেছি— — "সংসার টিকিয়ে রাখতে কিছু জিনিস মানিয়ে নিতে হয়।"
সাদিয়া আমার পাশে এসে দাঁড়াল। ও আমার চোখের দিকে তাকিয়েই আমার ভেতরের ঝড়টা সব বুঝে গেল। ধীরে ফিসফিস করে বলল, — "এটা তোর অনুষ্ঠান না মেহরীন... এটা ওর।"
আমি ঠান্ডা শরবতে চুমুক দিয়ে বললাম, — "তাই তো... শেষ পর্যন্ত উপভোগ করতে দে।"
পাঁচটার পর থেকে রায়হানের অস্থিরতা চরমে উঠল। সে বারবার নিজের শার্ট ঠিক করছে, ঘড়ি দেখছে, দরজার দিকে তাকাচ্ছে। যেন পুরো পার্টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এখনও এসে পৌঁছায়নি।
তারপর... টিং টং। কলিংবেলের শব্দে পুরো ঘরটা এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমন্ত্রিত সবাই উৎসুক হয়ে দরজার দিকে তাকাল। রায়হান তৃষাকে রিসিভ করার জন্য প্রায় দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি তার আগেই বড় বড় পা ফেলে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। রায়হানের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললাম, — "আমি খুলছি।"
পেছনে প্রায় ত্রিশজন মানুষ নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে। আর দরজার ওপাশে... সেই মেয়ে, যাকে দিয়ে আমার স্বামী আজ সবার সামনে আমাকে ছোট করতে চেয়েছিল, আমার আত্মসম্মানে আঘাত করতে চেয়েছিল। আমি দরজার হাতলে হাত রাখলাম। ধীরে ধীরে দরজাটা খুললাম। আর দরজার ওপাশে দাঁড়ানো তৃষার অহংকারী মুখটা দেখেই... আমি ঠিক বুঝে গেলাম, এই নতুন ফ্ল্যাটে দাঁড়িয়ে রায়হানের উদ্দেশ্যে আমার বলা প্রথম কথাটা ঠিক কী হতে চলেছে!
(চলবে...)
গল্পের এই পর্বটি আপনার কেমন লাগল? মেহরীন এরপর কী করবে বলে আপনার মনে হয়? কমেন্টে আপনার মতামত জানান!
সংগৃহীত