নিঝুম রাতের পিঠা আর বেলগাছের বাসিন্দা

আগের দিনের গ্রাম অঞ্চল বলে কথা! তখন মানুষের চেয়ে জীন-ভূতের বসতিই যেন বেশি ছিল। এখনকার জেনারেশনের কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, "ভাই, কখনো ভূত দেখছেন?"—কয়জন যে 'হ্যাঁ' বলবে তা জানা নেই। সংখ্যাটা যে খুব বেশি হবে না, তা নিশ্চিত। কিন্তু আপনার দাদী কিংবা নানীকে জিজ্ঞেস করে দেখেন, সকলেই এক বাক্যে উত্তর দেবে। কেউ বলবে, "হুম দেখেছি," কেউ বলবে, "আরে আমার তো দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে!" আবার কারও কারও মুখে শুনবেন, স্বয়ং ভূত নাকি ঘাড়ে নিয়ে ঘুরেছেন, কেউ বা ভূতকে তাড়া করে দূরদূরান্ত পার করে দিয়েছেন! ঠিক তেমনি আমার নানীও একবার এক ভূতকে আচ্ছা দৌড়ানি দিয়েছিলেন। নানীর ছোটবেলা থেকেই পিঠা বানানোর বড্ড শখ। আমাদের আম্মা আবার অলস প্রকৃতির, তিনি কখনো কষ্ট করে আমাদের পিঠা বানিয়ে খাওয়াননি। তাই যখনই আমাদের পিঠা খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা হতো, আমরা সব ভাইবোন আর কাজিনরা মিলে সোজা নানুর বাড়ি চলে যেতাম। তেমনি এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে আমরা সব কাজিনরা নানুর বাড়ির উঠোনে, চুলার পাশে নানীর গা ঘেঁষে বসেছিলাম। নানী পরম মমতায় মেরা পিঠা বানাচ্ছিলেন। কুয়াশা ভেদ করে আসা উত্তুরে হাওয়া আর চারপাশের গম্ভীর পরিবেশ দেখে হঠাৎ নানীকে বললাম, "নানী, একটা গল্প বলো না!" নানীও অমত করলেন না, চুলার আগুনে কাঠ ঠেলতে ঠেলতে শুরু করলেন। তবে তিনি কোনো রাজা-রাণীর গল্প বলেননি। নানী শুরু করলেন তাঁর জীবনের এক হাড়হিম করা ভূতের অভিজ্ঞতার গল্প। ওমা! রাতের বেলা ঠান্ডা কুলকুলে বাতাসের মধ্যে চারপাশের পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে গেল। গল্প শুনতে শুনতে অদ্ভুত একটা ফিলিংস হচ্ছিল—মনে হচ্ছিল এই বুঝি পেছন থেকে কেউ এসে জড়িয়ে ধরবে, নয়তো গলা টিপে ঘাড়টা মটকে দেবে!

নানী বলতে লাগলেন—তাঁর নাকি দিন-রাত জ্ঞান থাকত না, যখনই মন চাইত পিঠা বানানো শুরু করে দিতেন। তেমনি এক শীতের রাতে সারারাত ধরে তিনি পিঠা বানানোর তোড়জোড় শুরু করেন। শেষ রাতের দিকে যখন চারপাশ একদম নিঝুম, তখন তেলের পিঠা (মালপোয়া) বানানোর জন্য তিনি একাই রান্নাঘরে গিয়ে হাজির হন। তখনকার দিনের গ্রামের রান্নাঘর তো আর ঘরের ভেতর হতো না; বেশির ভাগই থাকত বাড়ির বাইরে, কোনো বেলগাছ কিংবা আমগাছের নিচে। নানীর রান্নাঘরটাও তেমনই একটা বড় বেলগাছের ঠিক নিচেই ছিল। নানী একা একা মনোযোগ দিয়ে তেলের পিঠার খামির কড়াইয়ে ছাড়ছেন, অমনি নাকি পেছন থেকে একটা অদ্ভুত মটমটিয়ে আওয়াজ শুরু হলো। মনে হলো, শুকনো পাটকাঠি বা খড়ি কে যেন বসে বসে ভাঙছে—পট পট, মট মট! নানী সাহসী মানুষ, ভারী গলায় প্রশ্ন করলেন, "কে ওখানে?" অন্ধকার থেকে একটা হালকা, চেরা সুরেলা কণ্ঠে উত্তর এলো, "আমি গো ভাবি, জয়নবের আম্মা।" নানী অবাক হয়ে উত্তর দিলেন, "তো এত রাত্রে এখানে কী করো? ঘর-সংসার নাই নাকি তোমার?" ওপাশ থেকে উত্তর এলো, "না গো ভাবি, পিঠা বানাইতাছো, যেই সুবাস ছাড়ছে! এই সুবাস পাইলে কি পুরা দুনিয়ার মানুষ আয়া পড়বো না? ভাবি, আমারে একটা পিঠা দিবা? আমি খামু..." নানী কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, "তাই বলে তুমি মাঝরাতে পিঠা খেতে চলে আসবে ও আরেক বাড়ির বেটির রান্নাঘরে? কিসের পিঠা দিব তোমারে? পিঠা এখনো হয় নাই, যাও!" এবার জয়নবের আম্মা অন্ধকার আর পাটকাঠির বেড়ার পেছন থেকে উঁকি মেরে তার মুখটা বের করল। উঁকি দিয়ে জ্বলজ্বলে চোখে পিঠার পাতিলের দিকে তাকাল, চোখ মিটমিট করে একটা রহস্যময় মুচকি হাসি দিল। পরক্ষণেই আবার সে বেড়ার আড়ালে মুখটা লুকিয়ে ফেলল। সে আড়াল থেকেই আবার বলতে লাগল, "এতগুলা পিঠা বানাইলা, একটাও দিতে পারবা না??" আনমনে বলতে বলতে আবারও শুরু করল খড়ি ভাঙা—পটাশ পটাশ! নানী এবার মনে মনে বেশ বুঝতে পারলেন, এই জয়নবের আম্মাকে এভাবে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দিলে কপালে দুঃখ আছে। এর চালচলন মানুষের মতো ঠেকছে না। নানী একটু বাঁকা হাসি হেসে বললেন, "জয়নবের আম্মা, তুমি কোন গাছ থেকে নাইমা আইছো? আম গাছ না বেল গাছ??" প্রশ্নটা শুনে জয়নবের মা আরেকটু উঁকি মেরে মুখটা বের করল, আবার লুকিয়ে ফেলল। তার কোনো জবাব নেই। এবার নানীর মাথা গেল চটে। তিনি তক্ষুণি চুলা থেকে পিঠার গরম কড়াই নামিয়ে নিলেন। পাশ থেকে একটা মাটির তাওয়া টেনে এনে মাটিতে আছাড় দিয়ে 'ঠাস' করে ভেঙে কতগুলো ধারালো টুকরো হাতে নিলেন। আর অন্য হাতে কিছু শুকনো পাটকাঠি ভেঙে নিয়ে চুলার আগুন থেকে সেটাতে দাউদাউ করে আগুন জ্বালিয়ে নিলেন। এরপর সেই জ্বলন্ত খড়ি আর মাটির চট চ্যালা হাতে নিয়ে জয়নবের মায়ের দিকে তেড়ে গিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, "নে তোর পিঠা! খাবি পিঠা? আজ তোরে পিঠা খাওয়ামু!" নানী ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে তাড়া করলেন এবং তার পশ্চাদ্দেশে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতে থাকলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে জয়নবের মা দে ছুট! সে সোজা পুকুরপাড়ের অন্ধকারের দিকে পালিয়ে গেল।

সারারাত ধরে পিঠা বানানো শেষ করে সকালবেলা নানী এক প্লেট গরম পিঠা হাতে নিয়ে আসল জয়নবের মায়ের খোঁজে গেলেন। সকালের আলোয় জয়নবের মা আর বেড়া ভাঙছিল না, পুকুরপাড়েও পালাচ্ছিল না; সে নিশ্চিন্ত মনে নিজের উঠানে বসে গোবরের ঘুঁটে দিচ্ছিল। নানী রাতে যা আন্দাজ করেছিলেন, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক দিলেন— "নেল্লো তোর পিঠা! সারারাত আমারে পিঠার জন্য জ্বালাইয়া খাইলি, এখন মন ভইরা পিঠা খা। সংসার নাই নাকি তোর যে রাতের বেলা উইঠা পিঠা খুঁজতে আরেক পাড়ায় চইলা যাস?" একথা শুনে আসল জয়নবের মা তো আকাশ থেকে পড়ল! সে চমকে উঠে বলল, "বলিস কী লো ভাবি?! আমি কি এতই লোভী আর নারোদ যে পিঠা খাইতে রাইতের বেলা তোর রান্নাঘরে চলে যাব? মানুষের নামে আকতা (মিথ্যা অপবাদ) তুলতেও তো তোর দুইবার ভাবা উচিত! এও তোমার পিঠা তুমি খাও।" লজ্জায় আর ক্ষোভে জয়নবের আম্মা আমার নানীর পিঠা নানীকেই ফেরত দিয়ে দিল। গল্পের এইটুকু শুনে আমরা কাজিনরা তো হা করে আছি। আমি নানীকে জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা নানী, বেল গাছ থেকে নাইমা আসা ওই নকল জয়নবের আম্মা কি ব্যাক্কল আছিল, নাকি তুমি আসল দাজ্জাল ছিলা?" নানী হেসে বললেন, "আরে না লো! বেল গাছের ওই আম্মা পরে আমার কাছ থেকে ঠিকই পিঠা উসুল করে নিছিল। হ্যালো, ওদের একবার যা মনে ধরে, সহজে ছাড়ে না। ওই সতিনের লাইগা আমারে তিন-চার মাস টানা একটা অদ্ভুত গান গাইতে হইছিল— সই ল সই, চুককা দই। নাইলা খেতে পানি নাই, ওযু করবা কই?"

পরে আমরা আমাদের আম্মার কাছ থেকে শুনেছিলাম, এই ঘটনার পর নানীকে নাকি কয়েক মাস সত্যিই ভূতে ধরেছিল! তখন নানী কেমন যেন ঘোরের মধ্যে থাকতেন এবং প্রত্যেকদিন রাতে উঠে একা একা পিঠা বানাতেন। সব কিছু শুনে আমরা সব ভাইবোন ভয়ে তখন চিপকে গেছি প্রায়। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে—বলেন কী! বুড়ি তো এখনো চুলায় পিঠাই বানাইতেছে! জয়নবের আম্মা যদি এখন গাছ থেকে নাইমা আমাদের পেছন থেকে খাবলা দিয়া ধরে? আমরা সবাই ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তখন নানীর একদম গা ঘেঁষে বসলাম। বাইরে তখন কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাসে বাঁশঝাড়টা শো-শো শব্দ করে দুলছিল। হঠাৎ, ঠিক তখনই দূরে কোথাও অন্ধকার থেকে—ঠক… ঠক… ঠক… করে শুকনো পাটকাঠি ভাঙার আওয়াজ ভেসে আসলো। আমাদের সবার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। আমরা সবাই একদম চুপ মেরে গেলাম। নানীও কেমন যেন পাথরের মতো স্থির হয়ে রান্নাঘরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঠিক তখনই, রান্নাঘরের ঠিক পেছনের বাঁশঝাড়ের দিক থেকে খুব ক্ষীণ, চেরা একটা নারী কণ্ঠ বাতাসে ভেসে আসলো— "ভাবি… একটা পিঠা দিবা…?" ভয়ে আমার ছোট কাজিনটা নানীর আঁচল শক্ত করে চেপে ধরে কেঁদে দিল। আর আমি স্পষ্ট দেখলাম—রান্নাঘরের ঠিক কোণায়, চাঁদের আবছা আলো আর কুয়াশার মাঝে একটা ধবধবে সাদা কাপড় পরা ছায়া দাঁড়িয়ে মিটমিট করে হাসছে...।

সংগৃহীত