নিজের রঙের খোঁজে
"সবার সাথে মিলেমিশে একাকার হওয়ার লোভে আমরা অনেকেই নিজের আসল পরিচয়টা হারিয়ে ফেলি। কিন্তু সত্যিটা হলো— জবরদস্তি করে অন্যের দলের অংশ হতে গেলে নিজের মৌলিকত্বটাই হারিয়ে যায়, তবুও তারা কোনোদিন আপন করে নেয় না।" 🎨🕊️
নিজের স্বাভাবিক সত্তাকে ভালোবাসুন। অন্যের চোখে সেরা হওয়ার চেয়ে নিজের কাছে খাঁটি থাকা অনেক বেশি দামী।
গভীর বনের এক প্রান্তে বাস করত একটি ছোট ধূসর পাখি—নীলকণ্ঠ। তার গায়ের রঙ খুব উজ্জ্বল ছিল না ঠিকই, তবে তার নিজের একটা আলাদা সৌন্দর্য আর মিষ্টি সুর ছিল। কিন্তু নীলকণ্ঠের সব সময়ের আফসোস ছিল, বনের রঙিন ময়না আর তোতাপাখিদের বিশাল দলটা তাকে কখনোই নিজেদের সাথে মেশাত না।
উজ্জ্বল লাল, সবুজ, হলুদ আর গাঢ় নীল পালকের তোতাপাখিরা যখন ডালপালা জুড়ে একসঙ্গে হুলস্থুল করত, নীলকণ্ঠ দূর থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। সে ভাবত, "ইস! আমার গায়ের রঙটাও যদি ওদের মতো সুন্দর হতো, তবে নিশ্চয়ই ওরা আমাকে ভালোবাসত, ওদের দলে টেনে নিত।"
অবশেষে একদিন নীলকণ্ঠ এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিল। বন থেকে খুঁজে খুঁজে নানা রঙের ফুলের রস আর প্রাকৃতিক রঙ এক জায়গায় জড়ো করল। তারপর তুলি হাতে নিয়ে নিজের ধূসর পালকের ওপর একে একে মেখে নিতে শুরু করল কৃত্রিম লাল, নীল আর হলুদের প্রলেপ।
রঙে রঙে নিজেকে সাজাতে সাজাতে মনে মনে সে এক চরম আত্মতুষ্টিতে ভুগছিল। নিজেকে আয়নায় দেখে সে ভাবল— "আর একটুখানি রঙ বাকি! তারপরই তো আমি ঠিক ওদের মতোই হয়ে যাব! তখন আর কেউ আমাকে আলাদা করতে পারবে না।"
কিন্তু তোতাপাখিদের ডালে গিয়ে যখন সে পৌঁছাল, দৃশ্যটা একদম অন্যরকম হয়ে দাঁড়াল।
তোতাপাখিরা তার কৃত্রিম রূপ দেখে তাকে আপন করে নেওয়ার বদলে হেসে উঠলো। একজন তাচ্ছিল্য করে বলল, "এ আবার কে রে?"
অন্যজন ঠাট্টা করে যোগ করল, "ও মনে হয় নিজেকে জোর করে আমাদের মতো বানানোর চেষ্টা করছে!"
নীলকণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে লক্ষ্য করল, তোতাপাখিদের আসল পালক থেকে যে স্নিগ্ধ সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে, তার গায়ে লেপে রাখা কৃত্রিম রঙে সেই মায়া নেই। বরং বৃষ্টির এক ফোঁটা জল পড়তেই তার গায়ের নকল রঙ ধুয়ে গিয়ে এক নোংরা রূপ ধারণ করল।
সেদিন বিকেলে কান্না ভেজা চোখে নদীর ধারে বসে নীলকণ্ঠ বুঝতে পারল—
জোর করে সবার মতো হতে গেলে নিজের আসল রঙটাই হারিয়ে যায়। এত চেষ্টা আর নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন দেওয়ার পরও ওরা তো তাকে আপন ভাবলই না, বরং সে নিজেও হারিয়ে ফেলল তার নিজস্ব পরিচয়।
সেই ঘটনার পর থেকে নীলকণ্ঠ আর কখনো নিজেকে বদলাতে যায়নি। সে নিজের ধূসর পালক আর নিজের মিষ্টি সুরটাকেই ভালোবাসতে শিখল। কারণ, বুনো বাতাসে ভেসে থাকা নিজের সুরটাই তার আসল পরিচয়, অন্যের ধার করা রঙ নয়।
সংগৃহীত