নিজের জন্য বাঁচা (পর্ব ১)
ত্যাগের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার গল্প— "নিজের জন্য বাঁচা"
সব দায়িত্ব পালনের পরও কি একজন মায়ের নিজের একটু আকাশ পাওয়ার অধিকার নেই?
রাত তখন সাড়ে নয়টা। সংসারের সারাদিনের ক্লান্তি শেষে মাত্রই একটু গুছিয়ে বসেছিলাম। এমন সময় ছেলের ফোন এলো। ওপাশ থেকে কোনো কুশল বিনিময় নেই, সরাসরি একটা রুক্ষ আদেশ ভেসে এলো— “মা, কালকের ফ্লাইট ক্যানসেল করে দাও। তোমাকে জরুরি দরকার।”
কথাটা অনুরোধের ফ্রেমে বাঁধা ছিল না, ছিল এক চরম আধিপত্যের সুর। আমি কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে গেল। এর কিছুক্ষণ পরেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার মেসেজ— “এত স্বার্থপর হয়ো না। পরিবারের আগে কোনো কিছু নয়।”
মেসেজটা পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। বুকের ভেতরটা এক অজানা অভিমানে মুচড়ে উঠল। কারণ, পরদিন ভোরেই আমার আর আমার স্বামীর কক্সবাজার যাওয়ার কথা ছিল। বিয়ের দীর্ঘ ৩০টা বছর পার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে জীবনে প্রথমবার আমরা শুধু নিজেদের জন্য সাত দিনের একটা ছোট্ট ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলাম।
এই ভ্রমণটা আমাদের কাছে কোনো বিলাসিতা ছিল না। এটা ছিল দীর্ঘ পাঁচ বছরের অপেক্ষা, পাঁচ বছরের তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় আর অসংখ্য ত্যাগের ফসল। কখনো ছেলের সংসারের প্রয়োজনে, কখনো নাতি-নাতনির দেখাশোনার জন্য, কখনো কারো চিকিৎসা বা পারিবারিক সমস্যার কারণে আমরা নিজেদের সব ইচ্ছা বারবার পিছিয়ে দিয়েছি। প্রতিবারই আমার স্বামী দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা কথাই বলতেন— “থাক, পরে না হয় যাব।”
সেই ‘পরে’ শব্দটা বাস্তব রূপ নিতে আমাদের পাঁচ-পাঁচটি বছর লেগে গেল। সেদিন রাতে আমি বিছানার ওপর আনন্দের সাথে শাড়িগুলো গুছিয়ে রাখছিলাম। আমার স্বামী টিকিট আর হোটেল বুকিংয়ের কাগজগুলো বারবার দেখছিলেন আর মৃদু হাসছিলেন। তাঁর মুখের সেই হাসি দেখে মনে হচ্ছিল, যেন বহু বছর ধরে বুকে লালন করা একটা স্বপ্ন পূরণ হতে দেখছেন কোনো অবোধ শিশু। ঠিক তখনই ছেলের সেই ফোন।
আমি ভেবেছিলাম, হয়তো ও আমাদের শুভযাত্রা জানাতে ফোন করেছে। কিন্তু সে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে বলল, “মা, ঈশিতার অফিসে এক সপ্তাহের ট্রেনিং। তুমি কোথাও যেতে পারবে না। বাচ্চাদের সামলাতে হবে।”
আমি নিজের গলাটা যতটা সম্ভব শান্ত রেখে বললাম, “বাবা, কাল ভোরেই তো আমাদের বাস।”
সে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ও ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, “জানি।”
এই ‘জানি’ শব্দটাই আমার বুকের ভেতর সবচেয়ে বেশি আঘাত করল। সে জানত! সবকিছু জেনেশুনেও সে একদম শেষ মুহূর্তে এসে আমাদের এই সামান্য আনন্দটুকুকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। তারপর সে একের পর এক যুক্তি দেখাতে শুরু করল— বেবিসিটার রাখলে অনেক খরচ হবে, ঈশিতা এই সুযোগ বা ট্রেনিং মিস করতে পারবে না, নাতনি স্কুলে যাবে, আর নাতি নাকি রাতে আমাকে ছাড়া ঘুমায় না।
সব কথাই সত্যি ছিল। তাই ‘না’ বলাটা আমার জন্য ভীষণ কঠিন হয়ে উঠেছিল। কারণ, আমি তো শুধু একজন মা নই, আমি একজন দাদিও। আর আমাদের সমাজে মায়েদের ছোটবেলা থেকেই একটা অলিখিত নিয়ম শেখানো হয়— নিজের আগে সবসময় সবাইকে রাখতে হয়। নিজের সুখের কোনো আলাদা অস্তিত্ব থাকতে নেই।
কিন্তু সেদিন হঠাৎ আমার মনে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন জাগল… আমি কি কোনো দিন নিজের জন্য বেঁচেছি? আমি কি কখনো আমার স্বামীর প্রাপ্য সময়টুকু তাকে দিতে পেরেছি?
আমি বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে বললাম, “বাবা, তোমাদের কষ্ট আমি বুঝি। কিন্তু এবার আমি আমার ভ্রমণ বাতিল করব না।”
ওপাশে কিছুক্ষণ এক টানা নীরবতা। তারপর চরম ঠান্ডা গলায় ছেলে বলল, “ঠিক আছে। পরে তোমার কোনো দরকার হলে আমাদের কাছ থেকেও কিছু আশা করো না।”
আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে যদি এই কথাটা শুনতাম, আমি হয়তো কান্নায় ভেঙে পড়তাম। হয়তো স্বামীর কাছে ক্ষমা চেয়ে টিকিট বাতিল করে দিতাম। কিন্তু সেদিন আমি শুধু দৃঢ় গলায় বললাম, “তোমার কথাটা আমি মনে রাখব।” তারপর ফোনটা কেটে দিলাম।
রাতভর ছেলের আর পুত্রবধূর অসংখ্য ফোন আর মেসেজ আসতে লাগল— “মাত্র কয়েকটা দিনের ব্যাপার।” “আপনি না থাকলে আমরা কী করব?” “আমরা ভেবেছিলাম আপনার ওপর ভরসা করতে পারব।” আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
ভোরে যখন ফজরের আজান ভেসে আসছিল, রান্নাঘরে চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছিল, ঠিক তখন শেষ একটি মেসেজ এলো— “যদি আজ তুমি বেড়াতে যাও, তাহলে আর কোনো দিন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা কোরো না।”
মেসেজটা দেখে আমার বুকটা ছ্যাৎ করে কেঁপে উঠেছিল। আমার স্বামী আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে শান্ত গলায় বললেন, “চাইলে এখনো থেকে যেতে পারি।”
আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম। অতীতের সব ত্যাগের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠল। তারপর ফোনটা ব্যাগে রেখে শক্ত গলায় বললাম, “না… এবার আমরা যাব।”
বাড়ির দরজায় তালা লাগিয়ে যখন রওনা দিলাম, তখন আবার ফোনটা বেজে উঠল। অনেক বছরের পুরনো অভ্যাস ছিল— ছেলের ফোন মানেই সব কাজ ফেলে ছুটে যাওয়া। কিন্তু সেদিন… জীবনে প্রথমবার… আমি ফোনটা ধরিনি।
কারণ সেদিন আমি একটা কঠিন সত্য বুঝতে পেরেছিলাম— একজন মা সন্তানের জন্য সারাজীবন অকাতরে ত্যাগ করতে পারেন, কিন্তু সেই ত্যাগ যদি সন্তানের কাছে অধিকার বা আবদার না থেকে দাবি হয়ে দাঁড়ায়, তবে একদিন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য, নিজের জন্য বাঁচাটাও ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
(চলবে…)
সংগৃহীত