নারীর তেজ: সমাজের বিষ বনাম আত্মরক্ষার বঁটি

কথাটা প্রথমে শুনেই কানে খট করে লেগেছিল ত্রিনয়নীর। তখন হয়তো এর গভীরতা এতটা বোঝেনি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই কথাগুলো সারা শরীরে তিল তিল করে বিষের মতন ছড়িয়ে পড়ছে। এ রকম পুরুষতান্ত্রিক শ্লেষ মাখানো কথা শুনে মোটে অভ্যস্ত নয় ত্রিনয়নী। ওর বাপের বাড়ি শালীনতা আর সমাধিকারে বিশ্বাসী, তাই শৌর্যের মুখের কথাগুলো প্রথম প্রথম ওর কানে বড্ড বেশি বাজত।

সেদিন খাবার টেবিলে বসে মাছের মুড়োটা সবে শৌর্যের পাতে দিয়েছিল ত্রিনয়নী। মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে নেহাত মজার ছলে বলেছিল, "জানো, একবার কী হয়েছিল? রুদ্র তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে, আর আমি নাইনে। তা মাছ খেতে বসে বাবা হঠাৎ বলল—আজ মুড়োটা ত্রিনয়নীকে দাও। শুনে রুদ্রর সে কী গোসা! বলে কেন? দিদি কেন খাবে? আমি খাব!"

কথাটা ত্রিনয়নী বলেছিল একান্তই নিজের কিশোরবেলার দিনগুলোর স্মৃতি রোমন্থন করে। বিয়ের পর নতুন সংসারে এসে বাবা-মা, ভাইয়ের কথা তো অহরহই মনে পড়ে! এটা তো খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ভাত ভাঙতে ভাঙতে শৌর্য যেভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে উত্তরটা দিল, তাতে কোনো তরল কৌতুক ছিল না। শৌর্য বলেছিল, "আমাদের বাড়িতে মা ছেলেদের পাতেই মাছের মুড়োটা দিতেন। দিদিকে কোনো দিনও পাতে মুড়ো নিয়ে বসতে দেখিনি।"

কথাটার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন শ্লেষ আর তাচ্ছিল্য মাখানো ছিল। মনে হচ্ছিল, পাতে মাছের মুড়ো নিয়ে বসা মেয়েরা যেন বড্ড লোভী বা হ্যাংলা হয়, আর ছেলেদের পাতে সেটা দেওয়াই যেন জগতের একমাত্র শাশ্বত নিয়ম।

তবু প্রথম প্রথম গায়ে মাখেনি ত্রিনয়নী। বিয়ে হয়েছে সবে ছ’মাস। এখনও শৌর্যকে পুরোপুরি বোঝা বাকি, আর নিজেকে শৌর্যের কাছে চেনানোও বাকি। দুই পরিবারের সংস্কার, রুচি, নিয়মকানুন সবই তো ভিন্ন। বিয়ে তো আর শুধু দুটো মানুষের মাঝে হয় না, তার সঙ্গে দুই ভিন্ন রুচি ও সংস্কারের গাঁটছড়া বাঁধা হয়।

ত্রিনয়নী ভাবেনি এত হুট করে তার বিয়ে হয়ে যাবে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে এদিক-ওদিক টুকরো কোর্স করছিল আর একটা ভালো চাকরির তল্লাশি চালাচ্ছিল। এর মধ্যে বাবার খুড়তুতো ভাই রথিন কাকা হঠাৎ করেই নিয়ে এল এক সম্বন্ধ। ছেলে রেলে চাকরি করে, সুপুরুষ চেহারা, নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার। বাড়ি শালকিয়া হলেও ছেলের পোস্টিং অণ্ডালে। ওখানে রেল কোয়ার্টারে থাকে, বিয়ের পর বউ নিয়ে ওখানেই থাকবে। শুনে ত্রিনয়নীর বাড়ির লোক তো হাতে স্বর্গ পেল। শ্বশুর-শাশুড়ির ঝামেলাবিহীন ছিমছাম স্বাধীন সংসার—এই তো চায় সব মা-বাপ! মেয়ে শান্তিতে থাকবে, তৃতীয়-চতুর্থ ব্যক্তির কলকাঠি নাড়ানোর বাইরে গিয়ে নিজের মতো সংসার গুছিয়ে নেবে। তাছাড়া সরকারি চাকরি, মোটা মাইনে, রিটায়ারমেন্টের পর মোটা টাকা—মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য আর কী-ই বা চাই!

ছেলের ছবি দেখে ত্রিনয়নীরও খারাপ লাগেনি। শাল-সেগুনের মতন শরীরের বাঁধন, গায়ের রঙ যেন পাকা সোনা. ঘন চুল, গভীর কালো চোখ, টানা ভুরু আর খাড়া নাক। এক কথায় সুদর্শন পুরুষ। ফেসবুকে তল্লাশি চালিয়েও শৌর্য দেবের একই রূপ দেখেছিল সে। কিন্তু তখন সে বুঝতে পারেনি যে, এই বাহ্যিক সুন্দরের আড়ালে মানসিকতার একটা বিরাট অন্ধকার ফারাক লুকিয়ে আছে।

সেই ভ্রম ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। একদিন শীতের সকালে বারান্দায় বসে দুজনে চা খাচ্ছিল। কোয়ার্টারের বাগানময় রোদের ছড়াছড়ি, দেশি গোলাপ গাছটায় ফুলের তুবড়ি ছুটেছে। বাতাসে মিঠে সুবাস। ত্রিনয়নী গায়ের শালটা জড়িয়ে রোদের দিকে পিঠ করে বসেছিল। হঠাৎ শৌর্যের চোখে বিরক্তি আর ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি দেখে ত্রিনয়নী পেছনে তাকাল। দেখল, রাস্তা দিয়ে দুটো মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে, দুজনের পরনেই টাইট জিনস আর টপ।

শৌর্য চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "প্যান্ট পরে মেয়েরা কি নিজেদের ছেলে মনে করে? মেয়েদের প্যান্ট-বুট পরা আমি একদম পছন্দ করি না।" ত্রিনয়নী অবাক হয়ে বলেছিল, "এ কোন যুগের কথা বলছ? মেয়েরা ছেলেদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সব কাজ করবে সে বেলা ঠিক আছে, আর প্যান্ট পরলেই দোষ?" শৌর্য ঝাঁজের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল, "মেয়েরা মেয়েদের মতন থাকলেই ভালো। লেখাপড়া শিখছে ঠিক আছে, কিন্তু তাই বলে সব ব্যাপারে পুরুষের সঙ্গে কম্পেয়ার করলে চলে? মেয়েদের শান্ত, মার্জিত, স্নিগ্ধ হলেই ভালো লাগে। মেয়েদের শরীরে পুরুষালী গন্ধটা আমার পোষায় না।" ত্রিনয়নী মৃদু প্রতিবাদ করে বলেছিল, "এটা কি খুব ব্যাকডেটেড চিন্তাধারা নয়?" শৌর্য ফুঁসে উঠে বলেছিল, "ব্যাকডেটেড বলে কিছু হয় না। মেয়েদের যে এত রেপ, কিডন্যাপ, খুন হচ্ছে—তার জন্য কি মেয়েদের এই ঔদ্ধত্য আর জীবনশৈলী দায়ী নয়? নারী স্বাধীনতা মানে তো আর নারী স্বৈরাচারিতা নয়!" "তোমার মনে হয় মেয়েরা প্যান্ট পরে বলেই তাদের রেপ হয়?" ত্রিনয়নী স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। শৌর্য মুখ কুঁচকে বলেছিল, "মেয়েরা ডাল হয়। কী বলছি আর কী ভাবছ!"

ত্রিনয়নী আর তর্ক করেনি। শৌর্যের বিরক্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত যুক্তি প্রকাশের ইচ্ছেটাই মরে গিয়েছিল। সে শুধু ভাবছিল, এই আধুনিক যুগে এসেও একটা শিক্ষিত ছেলে এত হীনমন্য আর পিছিয়ে থাকা মানসিকতার হয় কী করে?

ধীরে ধীরে শৌর্যের এই পুরুষতান্ত্রিক রূপটা আরও স্পষ্ট হতে লাগল। আরেকদিন রাতে লেপের তলায় বসে ত্রিনয়নী রসিয়ে গল্প করছিল তার জেঠতুতো তাপসী দিদির সাহসের কথা। একবার চলন্ত লোকাল ট্রেনে এক লোক অসভ্যতা করায় তাপসী দিদি নাকি লোকটার কলার ধরে ট্রেন থেকে নামিয়ে ব্যাগ দিয়ে দুমদাম মার লাগিয়েছিল। লোকটা ভয়ে দৌড়াচ্ছিল আর দিদি ব্যাগ ঘোরাতে ঘোরাতে তার পেছনে ছুটছিল।

গল্পটা শুনে শৌর্য হাসেনি, বরং ভুরু কুঁচকে বলেছিল, "মেয়েমানুষের অত তেজ ভালো না। তেজ দেখালে সংসার সুখের হয় না। পুরুষ রোজগার করে, সম্পত্তি করে, বউকে নিরাপত্তা দেয়। তার পরিবর্তে মেয়েদের कर्तव्य ধৈর্যশীল ও মার্জিত হওয়া। সংসার টিকিয়ে রাখতে গেলে মেয়েদের অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।"

ত্রিনয়নী যখন বলেছিল, আজকাল মেয়েরাও চাকরি করছে, দেশ সামলাচ্ছে; তখন শৌর্য তাচ্ছিল্য করে বলেছিল, "তাদের নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। যে সব মেয়েরা শুধুই ঘর সামলায়, তাদের অত তেজ মানায় না।" ত্রিনয়নী মনে মনে শিউরে উঠেছিল—এ কোন মধ্যযুগীয় মানুষের সঙ্গে তার জীবন বাঁধা পড়ল!

ত্রিনয়নী নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করত, হয়তো শৌর্যকে বুঝতে তার ভুল হচ্ছে। ও তো অশিক্ষিত নয়। একবার ভেবেছিল শৌর্য হয়তো অতীতে কোনো মেয়ের কাছ থেকে আঘাত পেয়েছে, তাই হয়তো এমন নারী-বিদ্বেষী। এই ধারণার সত্যতা যাচাই করতে সে একদিন শৌর্যের পরম বন্ধু সত্যব্রত শিকদারের মুখোমুখি হয়েছিল, যে কলকাতায় থাকে এবং অণ্ডালে মাসির বাড়ি বেড়াতে এসে শৌর্যের কোয়ার্টারে এসেছিল।

বিকেলের দিকে ত্রিনয়নী নিজের হাতে ভেজিটেবল চপ বানিয়ে সত্যব্রত আর শৌর্যের সামনে এনে দিয়েছিল। সত্যব্রত চপ খেতে খেতে gratification বই দেখে ত্রিনয়নীকে জিজ্ঞেস করেছিল, "বউদির বই পড়ার শখ আছে? তা কী রকম লেখা পড়েন? আমি শুনেছি মেয়েরা প্রেমের উপন্যাস পড়তে বেশি পছন্দ করে!" ত্রিনয়নী বলেছিল, "মেয়ে আর ছেলে ভেদে কি বইয়েরও ভাগ হয়?" সত্যব্রত তখন নিজের তথাকথিত পুরুষালী জ্ঞান জাহির করে বলেছিল, "আরে না, তবে কিছু জিনিস তো আলাদা হয়। এই যেমন মেয়েরা টক খেতে ভালোবাসে, আড্ডা পেলে পিএনপিসি করতে ভালোবাসে, সাজতে গিয়ে লেট করে, আর সবসময় বয়স লুকিয়ে বলে!"

শৌর্যও বন্ধুর এই সস্তা রসিকতায় হাসছিল। ত্রিনয়নী নিজের রাগ চেপে হেসে বলেছিল, "মনে হয় আপনি বা আপনার বন্ধু college লাইফে কোনো সুন্দরী মেয়ের কাছে আচ্ছা করে ল্যাং খেয়েছিলেন, সেই থেকে এই অ্যান্টি-ফেমিনিজম মেন্টালিটির জন্ম!" সত্যব্রত তখন অহংকার করে তার এক কলেজ জীবনের গল্প শোনাল, যেখানে এক মেয়েকে সে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে সবার সামনে লাল গোলাপ দিতে বাধ্য করেছিল, শুধু মেয়েটার তেজ ভাঙার জন্য।

ত্রিনয়নী চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে সত্যব্রতকে সোজাসুজি অপমান করে বলেছিল, "যারা ভালো বই পড়ে, তারা এত কাঁচা গল্প সাজায় না সত্যব্রত বাবু। আজকালকার দিনে এত মহিলা-বিদ্বেষ নিয়ে চললে বউ জুটবে না, আর জুটলেও টিকবে না। আর হ্যাঁ, মেয়েরা ছেলেদের দেখানোর জন্য সাজে না, নিজেদের আত্মتৃপ্তির জন্য সাজে। আর বললেন মেয়েরা বয়স লুকোয়? মেয়েরা বয়স লুকোয় আর পুরুষেরা মেয়ের বয়সী নারীর দিকে তাকানোর সময় নিজের বয়সটাই ভুলে যায়!"

সত্যব্রত রাগে কিড়মিড় করে উঠেছিল। সে চলে যাওয়ার পর ত্রিনয়নী শৌর্যকে বলেছিল, "এ সব কেমন বন্ধু তোমার? এত মিন মেন্টালিটি?" শৌর্য তখন উল্টে ত্রিনয়নীকেই বাচাল বলে গালাগাল দিয়েছিল এবং চরম নারী-বিদ্বেষীর মতো বলেছিল, "সমাজটা ছেলেরাই চালায়। দেশের সীমান্ত পুরুষরাই রক্ষা করে। পুরুষরা এগিয়ে এসে তোমাদের লেখাপড়া না শেখালে আজও তোমরা দশে-পঞ্চাশের বউ হতে আর জ্যান্ত চিতায় ঝলসাতে! কোনো স্ত্রী এসে তোমাদের উদ্ধার করেনি, করেছে পুরুষেই!" ত্রিনয়নী অবাক হয়ে বলেছিল, "তবে তোমরা নারী মূর্তির পুজো করো কেন?" শৌর্য ঠান্ডা মাথায় জবাব দিয়েছিল, "নারী কেন? সাপেরও তো পুজো হয়। তা বলে কি সাপকে আদর্শ প্রাণী বলব?" ত্রিনয়নীর মনে হয়েছিল শৌর্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুরুষ হওয়ার অন্ধ অহংকার আর নারীকে তাচ্ছিল্য করার বিষাক্ত প্রবৃত্তি মিশে আছে। শৌর্য আরও বলেছিল, "তোমার জেঠতুতো দিদি তাপসীদির তো ডিভোর্স হচ্ছে শুনলাম। ওই তেজের জন্যই সংসারটা ভাঙল।"

ত্রিনয়নী জানত দিদির ডিভোর্সের কথা। দিদি চাকরি করতে চেয়েছিল, কিন্তু শ্বশুরবাড়ি তা করতে দেয়নি। অথচ শৌর্যের চোখে দোষটা দিদির তেজের, শ্বশুরবাড়ির অন্যায়ের নয়! শৌর্য রোজকার মতো রাতে ক্লাবে চলে গেল তাস খেলতে।

ত্রিনয়নীর মাথাটা তখন প্রচণ্ড ভার। মনে হচ্ছিল সে যেন কোনো এক অজ্ঞাত যানে চড়ে মধ্যযুগের কোনো অন্ধকার গুহায় এসে পড়েছে। হঠাৎ অণ্ডালের সেই নিঝুম কোয়ার্টারে লোডশেডিং হলো. ঘরময় নেমে এল ঘুটঘুটে অন্ধকার। কাজের মাসি মোক্ষদা বিকেলে এসে সারা রাত থাকে, সে মেঝেতে শতরঞ্চি পেতে ঝিমোচ্ছিল। ত্রিনয়নী ইমার্জেন্সি লাইট জ্বেলে রান্নাঘরে গিয়ে মোক্ষদার জন্য কফি বানাল।

কফির কাপ মোক্ষদার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ত্রিনয়নী জিজ্ঞেস করল, "বরের সঙ্গে ঝগড়া করো মাসি? তোমার বর রাগী? ভয় পাও না?" মোক্ষদা কফিতে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে খাঁটি গ্রামীণ সত্যটা উচ্চারণ করল, "বিটিছিলার ত্যাজটাই আসল গো দিদিমণি। উটা না থাইকলে পায়ে পিষে দিবে সবাই। যেমন সাপের থাকে বিষ, গুলাপ ফুলের কাঁটা আর হরিণের সিং..." মোক্ষদার এই একটা কথা ত্রিনয়নীর বদ্ধ মনের কুঠুরিতে যেন মুক্ত বাতাসের ছোঁয়া এনে দিল। এই অশিক্ষিত বুড়িটাও জীবনের আসল সত্যটা জানে, অথচ educated শৌর্য তা জানে না!

ঠিক তখনই বাইরের দরজায় সজোরে কড়া নাড়ার শব্দ হলো. ত্রিনয়নী মোক্ষদাকে বলল জিজ্ঞেস করে দরজা খুলতে। কিন্তু মোক্ষদা দরজা খোলার সাথে সাথেই একটা আর্তচিৎকার করে উঠল। ত্রিনয়নী তড়িঘড়ি বারান্দায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

সামনে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘকায়, পাহাড়প্রমাণ লোক। চেহারায় একটা আদিম হিংস্রতা, চোখে কুৎসিত লালসা। লোকটা গায়ের জোরে মোক্ষদাকে ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকছে। মোক্ষদা মাথায় চোট পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছে। ত্রিনয়নীর গলা শুকিয়ে গেল, সে চিৎকার করে বলল, "কী চাই? বাইরে বেরোও!"

কিন্তু নিঝুম শীতের রাতে চারপাশ স্তব্ধ। কেউ শুনবে না তার চিৎকার। শৌর্য তখনও ক্লাব থেকে ফেরেনি। লোকটা ভকভক করে মদের গন্ধ ছাড়তে ছাড়তে মাতাল স্বরে বলল, "তোকে বিয়া করেছি। আজ আমাদের সোহাগ রাত হবে..."

লোকটার নোংরা চোখের চাহনি আর পেশীর আস্ফালন দেখে ত্রিনয়নীর সারা শরীরে যেন এক লহমায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। ভয়ের মেঘ কেটে গিয়ে তার ভেতরে জেগে উঠল এক আদিম চণ্ডী রূপ। সে তড়িৎ গতিতে রান্নাঘরে ছুটে গেল। আবছা আলোয় হাতড়ে পেয়ে গেল একটা ধারালো আঁশ-বঁটি। বহুদিনের অব্যবহারে ওটা এক কোণে পড়ে ছিল। বঁটিটা দু-হাতে শক্ত করে ধরে, কোপানোর ভঙ্গিতে উঁচিয়ে ত্রিনয়নী লোকটার সামনে এসে বুক চেরা গলায় গর্জন করে উঠল—"খবরদাররর! এক পা এগোলে কেটে দু-টুকরো করে দেব!"

ত্রিনয়নীর সেই রণমূর্তি, চোখের আগুন আর হাতের চকচকে ধারালো বঁটি দেখে লোকটা আচমকা থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য সে স্তব্ধ হয়ে গেল, তারপর আর সাহস পেল না। নিজের পিঠ দেখিয়ে সোজা সদর দরজা দিয়ে দৌড়ে পালালো।

ত্রিনয়নী বঁটিটা ফেলে এক ছুটে দরজার কাছে গিয়ে দেখল, তার চিৎকারে পাড়ার কয়েকজন লোক জমা হয়েছে এবং তারা গেটের কাছে লোকটাকে ধরে ফেলেছে। ঠিক তখনই দূর থেকে শৌর্যও হেঁটে আসছিল। পাড়ার লোকেরা লোকটাকে চড়-থাপ্পড় মারছে।

মোক্ষদা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে সবাইকে বলল, "এই দিদি বঁটি নিয়ে কাটতে গেছল, তাই ভয় পাইয়ে পালাচ্ছিল শয়তানটা!" পাড়ার একজন প্রতিবেশী শৌর্যকে দেখে বলল, "হেঁ মশাই, আপনার বউদি তো বিরাট সাহস দেখিয়েছেন! এই রকম মুহূর্তে বেশিরভাগ মেয়েরাই নার্ভ ফেল করে। এরকম তেজীয়ানই হওয়া দরকার। ভয় পেলে চলবে না।" আরেকজন বলল, "একদম! বউদির তেজ আছে। এই তেজটাই আজ সমাজটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নিজের অধিকার ও সম্মান রক্ষায় মেয়েদের এমন রুখে দাঁড়ানোই উচিত।"

শৌর্য সব শুনে স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল ত্রিনয়নীর দিকে। তার তথাকথিত পুরুষতান্ত্রিক অহংকার আর হীনম্মন্যতা সেদিন ওই ধারালো বঁটির ধারালো ইস্পাতের মুখে যেন এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে আর কোনো কথা বলতে পারল না। ত্রিনয়নী সেদিন গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিল, সমাজের বিষাক্ত কুৎসিত দৃষ্টিভঙ্গির সামনে মাথা নত না করে নিজের আত্মসম্মান আর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নারীর এই তেজের কোনো বিকল্প নেই। আর সেই তেজ কোনো বিষ নয়, বরং আত্মরক্ষার সবচেয়ে ধারালো ও নিরাপদ হাতিয়ার।

সংগৃহীত