মোবাইলের শেষ ভিডিও
অজ্ঞাত
"কলেজ স্ট্রিটের এক পুরোনো দোকান থেকে কেনা সেকেন্ড-হ্যান্ড ফোন, আর তার গ্যালারিতে লুকিয়ে থাকা ৩৮ সেকেন্ডের একটা অভিশপ্ত ভিডিও! সিম কার্ড ছাড়াই মাঝরাতে আসা একটি মেসেজ বদলে দিল অর্ণবের জীবন। জানালার ওপারে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে ও কে হাতছানি দিচ্ছে? পড়ুন এক হাড়হিম করা রহস্যের প্রথম পর্ব..."
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। কলকাতা শহরের চেনা ব্যস্ততা কিছুটা থিতিয়ে এসেছে, তবে কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের পাড়া আর গলির মোড়গুলোতে এখনো মৃদু কোলাহল। বুকপকেটে হাত দিয়ে অর্ণব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাত্র দুদিন আগেই তার সাধের ফোনটা বাস থেকে চুরি হয়ে গেছে। পকেটের আর্থিক অবস্থাও এই মুহূর্তে বেশ টানটান। তাই বাধ্য হয়েই কলেজ স্ট্রিটের একটা অন্ধকার গলির ভেতর পুরোনো মোবাইলের দোকানটায় ঢুকেছিল সে। বেশ কম দামেই একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মার্টফোন পেয়ে গেল।
ফোনটা হাতবদল করার সময় বয়স্ক দোকানদার চশমার ওপর দিয়ে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, "দ্যাখেন বাবা, ফোনটা এমনিতে বেশ ভালোই। শুধু মাঝে মাঝে কেমন যেন নিজে নিজেই গ্যালারিটা খুলে যায়। ও কিছু না, একটু সফটওয়্যারের গণ্ডগোল হয়তো।"
অর্ণব হালকা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, "ধুর মশাই! এ আবার কোনো সমস্যা নাকি? অনায়াসে চলে যাবে।"
সেই হাসির আড়ালে যে কী মারাত্মক বিপদ লুকিয়ে ছিল, তা টের পাওয়ার জন্য অর্ণবকে আরও কয়েকটা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো।
বাড়ি ফিরে অর্ণব ফোনটা চার্জে বসাল। স্ক্রিনটা অন হতেই সে খেয়াল করল, ফোনের আগের মালিকের বেশ কিছু ছবি আর ভিডিও এখনো ডিলিট করা হয়নি। ফোন মেমোরি ঘাটতে ঘাটতে সে ভাবল, আজ রাত হয়ে গেছে, কাল সকালে উঠে সব একেবারে ফরম্যাট করে ফেলবে।
রাত বারোটার কাঁটা ছুঁইছুঁই। বিছানায় শুয়েও অর্ণবের চোখে কোনো ঘুম নেই। ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ যেন নিস্তব্ধ ঘরটাকে আরও ভারী করে তুলছে। বিরক্তি কাটাতে সে নতুন কেনা ফোনটা হাতে নিয়ে গ্যালারিটা খুলল। স্ক্রিনজুড়ে ভেসে উঠল অচেনা কিছু মানুষের পুরোনো সেলফি, কয়েকটা ঝাপসা পার্টির ছবি, আর কিছু অস্পষ্ট এদিক-ওদিক তোলা ভিডিও। স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ করেই একটা ভিডিও ফাইলের ওপর তার চোখ আটকে গেল।
ফাইলটার নাম লেখা— LAST_VIDEO.mp4।
ভিডিওটির সময়কাল মাত্র ৩৮ সেকেন্ড। এক অদ্ভুত কৌতুহল আর মৃদু অস্বস্তি নিয়ে অর্ণব প্লে বাটনে চাপ দিল।
মুহূর্তের মধ্যে স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা মেয়ের মুখ। বয়স বড়জোর তেইশ-চব্বিশ হবে। কিন্তু সেই মুখে কোনো স্বাভাবিকতা নেই; চোখে-মুখে চরম আতঙ্কের ছাপ, গালে-কপালে ধুলোবালি মাখা, আর মাথার চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ব্যাকগ্রাউন্ডের আবছা আলো দেখে মনে হচ্ছিল মেয়েটি কোনো অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে জায়গায় আটকে আছে।
মেয়েটি অত্যন্ত কাঁপানো, রুদ্ধশ্বাসে বলতে শুরু করল— "যদি তুমি এই ভিডিওটা দেখো... তাহলে দয়া করে আমাকে বাঁচাও! আমার নাম মেঘলা। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আমি... আমি একটা পুরোনো লাল বাড়ির বেসমেন্টে বন্দি আছি..."
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে একটা ভারী ও কর্কশ পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। কেউ একজন মেয়েটির দিকে এগিয়ে আসছে। মেঘলা চরম ভয়ে পিছন ফিরে তাকাল। তার চোখের তারা দুটো আতঙ্কে ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম। সে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে ক্যামেরার দিকে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল— "ফোনটা যদি কারও হাতে পৌঁছায়, প্লিজ পুলিশকে বলো... ওরা—"
ঠিক তখনই ভিডিওটা মারাত্মকভাবে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনের ওপার থেকে বোঝা গেল কেউ একজন হিংস্রভাবে মেয়েটির দিকে দৌড়ে আসছে। এরপর শুধু একটা বুক ফাটানো, আর্তচিৎকার শুনতে পাওয়া গেল— "বাঁচাও!"
স্ক্রিনটা হঠাৎ করেই কালো হয়ে গেল। ভিডিও শেষ।
অর্ণবের হাতের তালু ঘামতে শুরু করেছে, সারা শরীর যেন এক নিমেষে ঠাণ্ডা বরফ হয়ে গেল। ঘরের ফ্যানটা ঘুরলেও তার দম আটকে আসছে বলে মনে হলো। সে স্তব্ধ হয়ে কয়েক সেকেন্ড ফোনের নিস্প্রাণ স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, 'এটা নিশ্চয়ই কোনো প্র্যাঙ্ক ভিডিও? কোনো শর্ট ফিল্মের শুটিং নয়তো? নাকি সত্যিই কোনো মেয়ে এভাবে বিপদে পড়েছে?'
ঠিক তখনই হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা তীব্রভাবে কেঁপে উঠল। নিস্তব্ধ ঘরে সেই কম্পনের আওয়াজ অর্ণবের বুকে হাতুড়ির মতো আঘাত করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে একটি নতুন নোটিফিকেশন।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের এবং ভয়ার্ত বিষয় হলো— ফোনটিতে কোনো সিম কার্ড লাগানো নেই, কোনো ওয়াই-ফাই কানেকশনও অন নেই! তবুও একটা মেসেজ এসেছে।
অর্ণব কাঁপতে কাঁপতে মেসেজটা খুলল। সেখানে লেখা—
"তুমি ভিডিওটা দেখে ফেলেছো... এবার তুমিও নিরাপদ নও।"
তার ঠিক নিচের লাইনে আরও একটা বাক্য জ্বলজ্বল করছে—
"জানালার বাইরে তাকাও।"
অর্ণবের হৃৎস্পন্দন যেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। ঘরের জানালাটা ঠিক তার বিছানার পাশেই। কাঁপতে কাঁপতে, কোনোমতে হাত বাড়িয়ে সে জানালার ভারী পর্দাটা সামান্য সরাল।
বাইরের রাস্তার আলো-আঁধারির দিকে তাকাতেই অর্ণবের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। রাস্তার ওপারে, একটা ল্যাম্পপোস্টের ঠিক নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সেই একই চেনা মুখ। ভিডিওর সেই মেয়েটি— মেঘলা।
কিন্তু তার চোখ দুটোর দিকে তাকাতেই অর্ণবের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে, মেঘলার চোখ দুটো স্বাভাবিক মানুষের মতো নয়, একদম অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাসে ও মণিহীন। আর সে অন্ধকারের মধ্য থেকে একদৃষ্টিতে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে, অত্যন্ত ধীরগতিতে হাত তুলে অর্ণবকে নিজের দিকে ইশারা করছে... হাতছানি দিয়ে ডাকছে!
চলবে...
সংগৃহীত