মিথ, মিথ্যা ও মানুষের মন

অনেকের মতে মিথ্যা থেকেই 'মিথের' জন্ম। তাদের মতে মিথ শব্দে 'ম' আর 'থ' দুটো ই রয়েছে আবার মিথ্যা তেও ম আর থ অক্ষর দুটি রয়েছে। সুতরাং বলা যেতেই পারে--- যে কোন মিথ বা কিংবদন্তী মিথ্যাকেই আশ্রয় করে গড়ে ওঠে।

কিন্তু গভীর ভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় মানুষের মস্তিষ্ক নিছক তথ্য দিয়ে বাঁচে না; সে বাঁছে গল্পে। একটি ঘটনা যতবার বলা হয়, ততবার তার সঙ্গে নতুন নতুন রং মেশে। অল্প সত্য, সামান্য ভুল, একটু ভয়, কিছু আবেগ---এসব মিলিয়েই জন্ম নেয় কিংবদন্তি।

মনোবিজ্ঞানে একে Memory Reconstruction বা স্মৃতির পুনর্গঠন বলা হয়। মানুষ কোনো ঘটনা হুবহু মনে রাখে না; প্রতিবার স্মরণ করার সময় সে নিজের বিশ্বাস, ভয়, আশা এবং কল্পনা দিয়ে ঘটনাটিকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়।

আরেকটি বিষয় হলো Confirmation Bias। মানুষ যে কথাটি আগে থেকেই বিশ্বাস করতে চায়, সে সেই বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন ঘটনাই বেশি মনে রাখে। ফলে একটি অপ্রমাণিত গল্পও ধীরে ধীরে সমাজে সত্যের মর্যাদা পেয়ে যায়।

এই কারণেই বহু কিংবদন্তির পেছনে হয়তো একফোঁটা বাস্তব ঘটনা ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাতে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য অলংকার। শেষ পর্যন্ত মানুষ আর ইতিহাসকে নয়, গল্পকেই বিশ্বাস করেছে।

তাই প্রতীকী অর্থে বলা যায়--- মিথ অনেক সময় মিথ্যার আশ্রয়ে বড় হয়, কিন্তু তার আসল খাদ্য হলো মানুষের বিশ্বাস। মিথ্যা তাকে জন্ম দিতে পারে, কল্পনা তাকে বড় করে, আর সমাজ তাকে অমর করে।

এ কারণেই প্রতিটি মিথকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করাও ঠিক নয়, আবার অবহেলা করাও ঠিক নয়। কারণ মিথের ভেতরে কখনও ইতিহাসের ক্ষীণ ছাপ থাকে, কখনও মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরে সত্য লুকিয়ে থাকে।

মোট কথা--- "মিথের শক্তি তার সত্যে নয়, মানুষের বিশ্বাসে। আর বিশ্বাস যখন যুক্তিকে ছাড়িয়ে যায়, তখনই একটি গল্প ইতিহাসের চেয়ে দীর্ঘজীবী হয়ে ওঠে।"


কাঞ্চন চক্রবর্তী