মেঘবালিকার চিঠি

আষাঢ়ের দুপুরগুলো বরাবরই একটু অন্যরকম হয়। আকাশটা যেন অভিমানী কোনো কবির মতো মুখ ভার করে থাকে, দূরে কোথাও বাজ পড়ার শব্দ জমে, আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় ভেজা মাটির অদ্ভুত এক গন্ধ। এমনই এক দুপুরে মেঘাদ্রি তখন বসে বসে একটা পুরোনো ক্রিকেট বলের সেলাই খুঁটছিল। সদ্য মাধ্যমিক পাশ করেছে সে। ষোলো বছরের এক চঞ্চল ছেলে, যার পৃথিবীতে স্থির হয়ে বসে থাকার মতো কোনো প্রতিভাই নেই। পাড়ার কারও সাইকেলের চেন ছিঁড়লে মেঘকে ডাকে, কারও ঘুড়ি অন্যের ছাদে আটকে গেলে মেঘকে ডাকে, কারও বাজারের ব্যাগ ভারী হলে মেঘই দৌড়ে যায়। মনে হয়, ছেলেটার শরীরে রক্তের বদলে ছোটাছুটি বইছে।

মায়ের কথা শুনে সে আর দেরি করল না। লাফ দিয়ে উঠল, দুমদাম করে সিঁড়ি ভাঙতে লাগল। ঠিক তখনই... একটা বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ল তার গালে। তারপর আরেকটা। তারপর শত-সহস্র। এক নিমেষে আকাশটা ভেঙে পড়ল যেন। ঝোড়ো হাওয়ায় চারপাশের গাছগুলো কেঁপে উঠল। ছাদে পৌঁছোতেই তার চুল এলোমেলো হয়ে গেল, জামার কোণা উড়তে লাগল। সে তাড়াহুড়ো করে কাপড়গুলো তুলতে যাবে, এমন সময়... হঠাৎই তার চোখ পড়ল পাশের বাড়ির ছাদে। সময় যেন কিছুক্ষণের জন্য সবকিছু ভুলে থমকে গেল! একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

হয়তো তারই বয়সি। দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। মুখটা আকাশের দিকে তুলে রেখেছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এসে পড়ছে তার চোখে, গালে, ঠোঁটে। খিলখিল করে হাসছে সে। যেন, বৃষ্টি তার বহুদিনের চেনা বন্ধু। যেন পৃথিবীতে তার কোনো দুঃখ নেই। তার চুলগুলো ভিজে কপালে লেপ্টে গেছে। মেঘলা আকাশের নিচে তাকে দেখে মনে হচ্ছিল... কোনো এক রূপকথার মেঘবালিকা!

স্বপ্নের সেই ক্ষণিক মুহূর্ত

মেঘ স্থির হয়ে গেল। তার হাত থেকে একটা জামা উড়ে গিয়ে ছাদের এক কোণে পড়ল, কিন্তু সে খেয়াল করল না। শুধু তাকিয়ে রইল... অবাক হয়ে, মুগ্ধ হয়ে, অচেনা এক অনুভূতিতে হারিয়ে গিয়ে। মেয়েটা একবার ঘুরে দাঁড়াল। হঠাৎই, তার চোখ পড়ল মেঘের দিকে। দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল। সেই ক্ষণিকের সময়টুকু যেন এক যুগের সমান দীর্ঘ। তারপর মেয়েটা মৃদু হেসে আবার আকাশের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই ভেসে এলো মায়ের ডাক,

— মেঘ! কী করছিস এতক্ষণ? সব কাপড় ভিজে যাবে যে!

চমকে উঠল সে। তাড়াতাড়ি করে কাপড়গুলো হাতে নিল। আবার একবার তাকাল পাশের ছাদের দিকে। কিন্তু একি! কেউ নেই। ছাদটা ফাঁকা। শুধু বৃষ্টি পড়ছে। মেঘের বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠল।

দু'বছর কেটে গেছে সেই ঘটনার পর। সেদিন বিকেলে ঘুম ভাঙার পরেও তার মনে হয়েছিল, সবটা যেন স্বপ্ন। সে বিছানায় বসে অনেকক্ষণ ভেবেছিলো। সত্যিই কি কোনো মেয়ে ছিল? নাকি বৃষ্টির শব্দে ঘুমজড়ানো চোখে ভুল দেখেছিল সে? পাশের বাড়িতে তো এমন বয়সি কোনো মেয়ে থাকেও না। তাহলে? শেষমেশ নিজেকেই বুঝিয়েছিল... স্বপ্ন ছিল। হয়তো দুপুরের মেঘলা আলো আর বৃষ্টির নেশায় মাথা একটু ঘুরে গিয়েছিল। তবু... মেয়েটার হাসিটা কিছুতেই ভুলতে পারেনি সে। সেই দুহাত ছড়িয়ে বৃষ্টি ছোঁয়ার ভঙ্গি, ভেজা চুল আর সেই চোখ... অদ্ভুত শান্ত, অথচ গভীর!

দু বছর পরের এক বৃষ্টিভেজা সাক্ষাৎ

আকাশটা আজও মেঘলা। পশ্চিম দিগন্তে কালো মেঘের দল জমে উঠেছে। বাতাসে কদম ফুলের গন্ধ। টিউশন থেকে ফেরার পথে মেঘ ধীরে ধীরে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ মারছিল। হঠাৎই, একটা ঠান্ডা ফোঁটা এসে পড়ল তার হাতে। তারপর আরেকটা。তারপর ঝমঝমিয়ে নেমে এলো বৃষ্টি।

— ধুর! আবার!

বলে সাইকেলটা নিয়ে রাস্তার ধারের পুরোনো বাসস্ট্যান্ডটার নিচে গিয়ে দাঁড়াল সে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ পড়ছে। "টুপ... টুপ... টুপ..."

সেই শব্দের ভেতরেই আবার কোথা থেকে যেন ফিরে এলো দু'বছর আগের দুপুরটা। সেই ছাদ, সেই হাসি, সেই মেয়ে। আর ঠিক তখনই... দূর থেকে কাউকে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। একটা মেয়ে, হাতে একটা খাতা, চুলগুলো উড়ছে, বৃষ্টিতে অর্ধেক ভিজে গেছে সে। মেয়েটা ছুটে এসে দাঁড়াল বাসস্ট্যান্ডের শেডের নিচে। আর মেঘ? একেবারে স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল! এ কি...? এ তো... একই মুখ। একই চোখ। একই শান্ত হাসি।

মেয়েটা একটু হাঁপাচ্ছিল। ভেজা চুলগুলো কানের পাশে সরাতে সরাতে সে খেয়াল করল, একটা ছেলে অদ্ভুতভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ হঠাৎই বলে ফেলল,

— তুমি আবার এসেছ?

মেয়েটা চমকে উঠল।

— মানে?
— জানোনা যেন? বৃষ্টি হলে তুমি চলে আসো ঠিক... স্বপ্ন হয়ে...
— কিসব বলছ?

মেঘ একটু হেসে ফেলল। সেই হাসটা কেমন যেন বোকাশোকা, শিশুর মতো।

— আচ্ছা, এবার কতক্ষণ থাকবে? পাঁচ মিনিট? নাকি আমি চোখ বন্ধ করলেই উধাও হয়ে যাবে?

মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।

— তুমি কি আমাকে অন্য কারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছ?
— না। তোমাকে গুলিয়ে ফেলার মতো মানুষ পৃথিবীতে দু'জন নেই।

বাইরে তখন বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে। টিনের চালের ওপর শব্দ হচ্ছে 'ঝমঝম' করে। মেয়েটা একটু ইতস্তত করে বলল,

— তোমার কি জ্বর-টর এসেছে?
— না। তবে স্বপ্ন দেখার পুরোনো অসুখ আছে।
— আমি কিন্তু সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না।

মেঘ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। তারপর একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল,

— তুমি দু'বছর আগে একটা বৃষ্টির দুপুরে একটা ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলে। দু'হাত ছড়িয়ে বৃষ্টি খুঁজছিলে। মনে আছে?

মেয়েটার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় খেলে গেল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে নিজেকে সামলে নিল।

— তুমি আমাকে আগে কোথাও দেখেছ?
— দেখেছি বলেই তো ভাবছি তুমি সত্যি নও। কারণ তোমাকে আর কখনো দেখিনি।

মেয়েটা এবার কিছু বলল না। মেঘ হালকা হেসে বলল,

— আচ্ছা, এবার কী হবে জানো? আমি একটু পরেই চোখ মুছব, আর তুমি হাওয়া হয়ে যাবে!

এ কথা বলে সে সত্যিই দুই হাত দিয়ে চোখ মুছে নিল। তারপর তাকাল। মেয়েটা তখনও দাঁড়িয়ে, একইভাবে। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। মেঘ কয়েকবার চোখ পিটপিট করল। না... যাচ্ছে না! সে আবার চোখ বন্ধ করল। চোখ খুলল। মেয়েটা এবারও আছে। বরং সে একটু হেসে ফেলেছে।

— কী হলো? আমি কি অঙ্কের প্রশ্ন, যে চোখ বন্ধ করলে মিলিয়ে যাব?

মেঘ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ হাত বাড়িয়ে নিজের গালে চিমটি কাটল।

— আউচ!

মেয়েটা এবার সত্যিই হেসে ফেলল। খুব আস্তে, খুব শান্তভাবে।

— তুমি বেশ অদ্ভুত মানুষ!

মেঘ ফিসফিস করে বলল,

— তাহলে... তুমি সত্যি?
— আমার তো তাই মনে হয়।
— মানে তুমি... মানুষ?
— অন্তত আজ সকাল পর্যন্ত তাই ছিলাম।

মেঘের মুখটা এমন হয়ে গেল যে মেয়েটা আবারও হেসে উঠল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকালো। সেই ক্ষণিকের আলোয় মেয়েটার মুখটা আরও উজ্জ্বল লাগল। মেঘ ধীরে ধীরে বলল,

— আমি সত্যিই ভেবেছিলাম তুমি একটা স্বপ্ন। এর আগে আমাকে কোথায় দেখেছ বলোতো?

মেঘ ও বৃষ্টিলেখার মিলন

মেঘ দুবছর আগের ঘটনা সবটা খুলে বলে। মেয়েটা চোখ গোলগোল করে বলে ওঠে,

— তুমি তাহলে পিসির বাড়ির পাশের ছেলেটা? হ্যাঁ... মনে আছে!

মেঘ যেন এবার অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেল।

— মানে... তুমি সত্যিই ছিলে?

মেয়েটা এবার মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

— ছিলাম তো! তবে আমি এখানে থাকি না। দু'বছর আগে গরমের ছুটিতে পিসির বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। সেদিন বৃষ্টি দেখে ছাদে উঠে গিয়েছিলাম।

মেঘ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর একদম শিশুর মতো গলায় বলল,

— তাহলে আমি... আমি এতদিন ধরে একটা সত্যিকারের মানুষকে স্বপ্ন ভেবে এসেছি?

মেয়েটা এবার খিলখিল করে হেসে ফেলল।

— মনে হচ্ছে তাই।

বাইরে বৃষ্টি আরও জোরে নামতে শুরু করেছে। টিনের চালের কিনারা দিয়ে টুপটুপ করে জল পড়ছে। মেঘ যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।

— আচ্ছা... তুমি মাঝে মাঝে আমার কথা ভেবেছ?

প্রশ্নটা করেই সে নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এভাবে কেউ প্রথম আলাপেই প্রশ্ন করে নাকি! মেয়েটা একটু ভেবে বলল,

— মাঝে মাঝে।
— সত্যি? কেন?
— হ্যাঁ। কারণ সেদিন যখন আমি বৃষ্টিতে ভিজছিলাম, দেখলাম পাশের ছাদের একটা ছেলে আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন আমি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য।

মেঘ লজ্জা পেয়ে মাথা চুলকাল।

— আসলে... তোমাকে একটু অন্যরকম লাগছিল।
— কেমন?
— যেন... যেন বৃষ্টির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা কোনো গল্প।

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে খেয়াল করছিল, ছেলেটা এক মুহূর্তও স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কখনো চুল ঠিক করছে, কখনো সাইকেলের হ্যান্ডেল ঘোরাচ্ছে, কখনো পা নাড়ছে।

— তুমি কি সবসময় এত চঞ্চল?
— আমি? একদম না!
— সত্যি?
— হ্যাঁ। আমি শুধু... একটু বেশি নড়াচড়া করি।
— একটু?

মেয়েটা ভুরু তুলে তাকাতেই মেঘ হেসে ফেলল।

— আচ্ছা, অনেকটা।

মেয়েটা এবার বাসস্ট্যান্ডের বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকাল। সে একদম স্থির। মনে হচ্ছে, তার কোনো তাড়া নেই। যেন সে বৃষ্টির শব্দও মন দিয়ে শুনছে। মেঘ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

— তুমি এভাবে চুপ করে কী দেখছ?
— বৃষ্টি!
— বৃষ্টিতে আবার দেখার কী আছে?
— অনেক কিছু। যেমন? কোন ফোঁটাটা আগে মাটিতে পড়ল, কোনটা পাতা বেয়ে নামল, কোনটা জমে থাকা জলে বৃত্ত তৈরি করল...

মেঘ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, এই মেয়েটা যেন তার সম্পূর্ণ উল্টো। সে ঝড়ের মতো! আর এই মেয়েটা? নিঃশব্দ সন্ধ্যার মতো। সে তাড়াহুড়ো করে কথা বলে, তাড়াতাড়ি হাসে, তাড়াতাড়ি রেগে যায়। আর মেয়েটা? প্রতিটা শব্দ বলার আগে যেন একটু ভেবে নেয়। মেঘ হঠাৎ বলল,

— আচ্ছা, তোমার নামটা তো এখনও জানলাম না।

মেয়েটা বাইরে তাকিয়েই বলল,

— বৃষ্টিলেখা।

শব্দটা যেন বৃষ্টির ভেতরেই গলে গেল। মেঘ ধীরে ধীরে নামটা উচ্চারণ করল।

— বৃষ্টি...লেখা...
— কী?
— কিছু না। নামটা খুব সুন্দর। তোমার?
— মেঘাদ্রি। সবাই মেঘ বলে ডাকে।

মেয়েটা এবার তার দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো হঠাৎ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

— মেঘ?
— হ্যাঁ।

সে আস্তে করে হাসল।

— অদ্ভুত তো! কী অদ্ভুত? আমার নাম বৃষ্টিলেখা... আর তোমার নাম মেঘ।

কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ করে রইল। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালের ওপর তার মৃদু শব্দ। আর সেই শব্দের মাঝে দাঁড়িয়ে দুটি চঞ্চল ও শান্ত প্রাণ প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মে পরস্পরের মুখোমুখি হলো, যেখানে মেঘ আর বৃষ্টি আর আলাদা কোনো গল্প রইল না—একই আকাশের অংশ হয়ে গেল।


সংগৃহীত