লক্ষ্মী যখন সরস্বতী: এক অপরাজেয় লড়াইয়ের গল্প
প্রথম পরিচ্ছেদ: স্বপ্নের অপমৃত্যু ও নিয়তির বাঁধন
আমাদের সমাজে আজও অনেক বাবা-মা ভালো পাত্র পেলেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে 'কন্যাদায়' থেকে মুক্ত হতে চান। বিএ থার্ড ইয়ারের ছাত্রী মেঘশ্রীর জীবনেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল শিক্ষিকা হওয়া; পুতুলখেলার বয়সেও সে দিদিমণি সেজে কাল্পনিক ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াত। পড়াশোনায় সে কখনো ফার্স্ট-সেকেন্ড না হলেও খারাপ ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই এক অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ী পরিবারের একমাত্র ছেলের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। নিজের স্বপ্নগুলোকে এভাবে শেষ হতে দেখেও, বাবার করুন মুখের দিকে তাকিয়ে সে 'না' বলতে পারেনি। শুধু বিয়ের আগে পাত্রের থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার একটা প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছিল।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: টেবিল ল্যাম্পের আলো ও শাশুড়ির বাক্যবাণ
বিয়ের পিঁড়িতে বসলেও মেঘশ্রীর লড়াইটা সহজ ছিল না। তার শাশুড়ি শাশুড়িমা প্রথম থেকেই এই পড়াশোনার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তার মতে, এগুলো ছিল ঘরের কাজ ফাঁকি দেওয়ার বাহানা। সংসারের সমস্ত কাজ শেষ করে মেঘশ্রী যখন পড়তে বসত, তখন শুরু হতো শাশুড়ির খোঁটা আর টিটকিরি—"উনি বই নিয়ে বসে সরস্বতী ঠাকুর হবেন, বিদ্যেধরী হবেন!"
কিন্তু মেঘশ্রী ছিল শান্ত অথচ দৃঢ়। সে মুখে কোনো উত্তর না দিয়ে, সারাদিনের কাজ আর স্বামীর প্রতি কর্তব্য শেষ করে রাতের বেলা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় পড়াশোনা চালিয়ে যেত। স্বামী মনে মনে কিছুটা বিরক্ত হলেও প্রতিশ্রুতির খাতিরে চুপ থাকত। আর শ্বশুরমশাই নিজের ব্যবসায় মগ্ন থাকায় এই ঘরোয়া অশান্তি থেকে দূরেই থাকতেন। মেঘশ্রীর এই নিঃশব্দ সাধনার ফল মিলল একদিন—সে মেধার জোরে বাড়ির কাছাকাছি একটি স্কুলেই শিক্ষিকার চাকরি পেয়ে গেল।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ঝড়ের আগমন ও ভাগ্যের নির্মম পরিহাস
মেঘশ্রীর চাকরি পাওয়ার বছর খানেকের মাথায় হঠাৎ করেই তার শ্বশুরমশাই মারা যান। আর তখনই নেমে আসে আসল বিপর্যয়। জানা যায়, তাদের ব্যবসা একক ছিল না, বরং তা ছিল শেয়ারের ব্যবসা। শ্বশুরের সরলতার সুযোগ নিয়ে তার চতুর বিজনেস পার্টনার আইনি দিক থেকে সমস্ত মূলধন হাতিয়ে নিয়েছিল। মেঘশ্রীর সোজা-সরল স্বামী সেই চতুর লোকের সাথে কোর্ট-কাছারির লড়াইয়ে পেরে উঠছিল না, উল্টে জমানো পুঁজিও শেষ হতে বসেছিল। এই চরম মানসিক অশান্তি সহ্য করতে না পেরে ছ'মাস আগে মেঘশ্রীর শাশুড়ি স্ট্রোক হয়ে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন এবং নিজের বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ: প্রতিশোধ নয়, সেবাই পরম ধর্ম
যে শাশুড়ি একদিন মেঘশ্রীকে দু'চক্ষে দেখতে পারতেন না, আজ মেঘশ্রীই তাঁর প্রধান ভরসা। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে মেঘশ্রী আয়া মাসির সাহায্যে শাশুড়িকে তুলে ধরে পিঠে মেডিসিন পাউডার লাগিয়ে দেয়। স্কুল থেকে ফিরে সন্ধ্যার সময় তাঁর পাশে এসে বসে। আজ শাশুড়ির চোখে শুধুই অনুতাপের জল। তিনি মেঘশ্রীর হাতটা ধরতে চান, হয়তো ক্ষমা চাইতে চান, কিন্তু মুখের ভাষা তাঁর কেড়ে নিয়েছে নিয়তি। মেঘশ্রী পরম মমতায় তাঁর চোখের জল মুছিয়ে দেয়।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ: নতুন সকাল ও এক নতুন উপলব্ধি
আজ মেঘশ্রী একা হাতে পুরো সংসার সামলাচ্ছে। শুধু সংসার নয়, স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে ধুরন্ধর উকিল দিয়ে আইনি লড়াই লড়ে আজ কোর্টের রায়ও তাদের পক্ষে এনেছে সে। হারিয়ে যাওয়া ব্যবসাটা আবার নতুন করে গুছিয়ে তুলছে তারা দুজনে।
এরই মাঝে মেঘশ্রী তার নিজের বাপের বাড়ির প্রতিও দায়িত্ব ভোলেনি। তার অবসরপ্রাপ্ত গরিব বাবা মেয়ের থেকে সরাসরি টাকা নিতে না চাইলে, মেঘশ্রী নিজের উপার্জনে তার ছোট বোনের পড়াশোনার সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। বড় মেয়েকে স্বাবলম্বী হতে দেখে আজ মেঘশ্রীর বাবাও বুঝতে পেরেছেন, ছোট মেয়েকেও নিজের পায়ে দাঁড় করাতে পারলেই তবেই তিনি প্রকৃত পিতৃদায় থেকে মুক্ত হবেন।
"আজ মেঘশ্রীর বাপের বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ি—দুই পরিবারই মনে মনে স্বীকার করে যে, মেয়েদের শুধু ঘরের 'লক্ষ্মী' করে চার দেওয়ালে আটকে না রেখে, আজকের দিনে তাদের 'সরস্বতী' অর্থাৎ শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তোলাটা কতটা জরুরি। মেঘশ্রীর রাতের বেলার সেই টেবিল ল্যাম্পের আলোটাই আজ দুটো পরিবারকে অন্ধকারের গ্রাস থেকে বাঁচিয়ে আলোর দিশা দেখিয়েছে।"
সংগৃহীত