জুতোর ফিতেয় বাঁধা নূরের ব্যাগটা, যেন এক ভাঙা শৈশব

মেয়ের স্কুলের ট্রান্সফার সার্টিফিকেটের (TC) কাগজটা যখন ক্লাস টিচারের টেবিলের ওপর রাখলাম, ম্যামের চোখ দুটো অবিশ্বাস্য এক বিষাদে ভরে উঠল। তিনি চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত করুণ স্বরে বললেন, — “মিসেস নাদিয়া, আপনারা তো এতগুলো বছর ধরে কত কষ্ট করে মেয়েটাকে এই শহরের এত নামী আর ভালো স্কুলে রেখেছিলেন! হঠাৎ মাঝপথে এই সিদ্ধান্ত কেন?” আমি আলতো করে একটু হাসলাম। কিন্তু সেই মলিন হাসির অন্তরালে লুকিয়ে ছিল বিগত আট বছরের জমে থাকা তীব্র ক্লান্তি, প্রতিনিয়ত পাওয়া অপমান আর এক বুক না বলা হাজারটা কথা। আমি দীর্ঘশ্বাস চেপে বললাম, — “আর পারছি না ম্যাম… আমি মানসিকভাবে বড্ড ক্লান্ত। ঠিক করেছি, মেয়েকে নিয়ে চিরকালের জন্য গ্রামে চলে যাব।” ম্যাম দুঃখভরা চোখে ফাইলের দিকে তাকিয়ে বললেন, — “নূর কিন্তু ক্লাসের অন্যতম সেরা এবং মেধাবী ছাত্রী, মিসেস নাদিয়া। এই মাঝপথে গ্রামের সাধারণ স্কুলে চলে গেলে ওর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎটা হয়তো একবারে নষ্ট হয়ে যাবে।” আমি আর কোনো উত্তর দিলাম চিহ্নিত না। শুধু একটা ম্লান মাথা নেড়ে রুম থেকে বের হয়ে এলাম। কারণ ম্যামকে বলার মতো ভাষা বা শক্তি কোনোটিই আমার অবশিষ্ট ছিল না।

বাইরে নূর চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। ওর পিঠের সেই পুরোনো স্কুল ব্যাগটা—যার চেইনটা অনেক আগেই ভেঙে গেছে আর সেটাকে কোনোমতে একটা জুতোর ফিতে দিয়ে বেঁধে আটকে রাখা হয়েছে। স্কুলের সামনের একটা স্টেশনারি দোকানে ঝুলছিল একটা নতুন চমৎকার গোলাপি রঙের স্কুল ব্যাগ, যার দাম মাত্র ১০০০ টাকা। নূর ব্যাগটার দিকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য বড় বড় চোখে তৃষ্ণার্তের মতো তাকিয়ে রইল, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে হাঁটা শুরু করল। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। গত মাসেও সায়েমের নতুন ক্লাসের বিপুল অ্যাডমিশনের খরচ মেটাতে গিয়ে নূরের এই মাসের টিউশন ফি-র টাকাটা রাশেদ আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে। নূরের কপালে জোটেনি একটা ১০০০ টাকার নতুন ব্যাগ। পথে একটা বড় কেকের দোকানের সামনে এসে নূর থমকে দাঁড়াল। কাঁচের ওপাশে রাখা একটা সুন্দর স্ট্রবেরি কেকের দিকে ও তাকিয়ে রইল। নূরের দিকে তাকিয়ে আমার আট বছর আগের বিয়ের পর থেকে শুরু হওয়া প্রতিটা মুহূর্ত চোখের সামনে ভেসে উঠল।

আমাদের বিয়ের এই আট বছরে একটা মাসও অন্তত শান্তিতে কাটেনি, বিশেষ করে প্রতি মাসের শুরুতে নূরের স্কুলের ফি দেওয়ার সময় এলেই ঘরে কুরুক্ষেত্র বেঁধে যেত। কারণ আমার স্বামী রাশেদ তার প্রয়াত বড় ভাই তানভীরের পরিবারকে নিজের একমাত্র জীবনের ব্রত এবং অলঙ্ঘনীয় দায়িত্ব বলে ধরে নিয়েছে। তিন বছর আগে তানভীর ভাই মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী হালিমা আর একমাত্র ছেলে সায়েমকে যেন নিজের বুকের পাঁজর বানিয়ে নিয়েছে রাশেদ। প্রতি মাসের এক তারিখে বেতন হওয়া মাত্রই তার পুরো টাকাটা চলে যায় হালিমাদের পেছনে—ওদের তিন রুমের ফ্ল্যাটের চড়া ভাড়া, সায়েমের দামী দুধ, নামী ব্র্যান্ডের সিরিয়াল, নামকরা চাইল্ড স্পেশালিস্টের ফিস আর জামাকাপড়। বাজারের সবচেয়ে সেরা এবং দামী জিনিসটাই সবসময় সায়েম পায়। আর আমার নিজের পেটের মেয়ে নূর? সে যেন আমাদের নিজের সংসারে থেকেও এক অলিখিত পরিযায়ী পাখি, ব্রাত্য এক অনাহূত অতিথি।

বিগত আটটি বছর ধরে এই বৈষম্য আমি মুখ বুজে সহ্য করেছি একটা অন্ধ আশায়—যে হয়তো একদিন সময় বদলাবে, রাশেদের ভুল ভাঙবে। কিন্তু কিছুই বদলায়নি। সায়েম এখন শহরের বড় নামী ব্র্যান্ডের জামা পরে ঘুরে বেড়ায়, দামী রেস্তোরাঁয় খায়; আর আমার নূরের কপালে জোটে পুরোনো, সেলাই করা, বারবার রিফু করা জামা। গত বছর নূরের জন্মদিনের দিনটার কথা আমি কোনোদিন ভুলব قلم। রাশেদ নিজে মেয়ের জন্মদিনে উপস্থিত না থেকে তড়িঘড়ি করে সায়েমকে পাঠিয়েছিল কেক আনতে। কিন্তু সেই কেক আর আমাদের বাড়ি ফেরেনি; সায়েম সেটা নিয়ে চলে গিয়েছিল হালিমাদের বাসায়, ওখানেই মোমবাতি জ্বালিয়ে নূরের জন্মদিনের কেক কাটা হয়েছিল হালিমা আর সায়েমের করতালি দিয়ে। আর গভীর রাতে নূরের জন্য রাশেদের হাত ধরে ফিরেছিল সেই কেকের একটা ভাঙা, শুকনো, অবহেলিত এক টুকরো অংশ। নূর সেদিনও কাঁদেনি, চুপচাপ খেয়ে শুয়ে পড়েছিল।

স্কুল থেকে যখন নূরকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকলাম, দেখি বসার ঘরের মেঝেতে দুটো বড় বড় কুরিয়ারের কার্টন। একটার ভেতরে সায়েমের জন্য আনা অরিজিনাল ‘নাইকি’ ব্র্যান্ডের স্কুল ব্যাগ, আর অন্যটায় জার্মানি থেকে ইমপোর্ট করা দামী হেলথ সাপ্লিমেন্ট। রাশেদ পরম যত্নে বসে কাঁচি দিয়ে ব্যাগের প্রাইস ট্যাগগুলো কাটছিল। আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, — “এগুলো কি সায়েমের?” সে আমার দিকে মাথা না তুলেই খুব স্বাভাবিক সুরে বলল, — “হ্যাঁ, সায়েমের নতুন সেশন শুরু হচ্ছে তো, স্কুলে একটা ভালো স্ট্যান্ডার্ড ব্যাগ লাগবে। ও এগুলো পছন্দ করেছে।” নূর পাশে দাঁড়িয়ে কোনো কথা না বলে নিজের জুতোর ফিতে দিয়ে বাঁধা ভাঙা ব্যাগটা আরও শক্ত করে বুকের কাছে চেপে ধরল।

আমি এবার বুক ভরে একটা শ্বাস নিয়ে বললাম, — “আমি নূরকে আজ স্কুল থেকে চিরকালের জন্য ট্রান্সফার করে দিয়েছি। আমরা দুজনে গ্রামে চলে যাব।” কথাটা শোনামাত্র রাশেদ যেন এক চরম বজ্রাঘাত খেল। ও হাতের কাঁচিটা ফেলে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল— — “তুমি কী আবোলতাবোল বলছ নাদিয়া? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার?” আমি এবার আর থামলাম না। বিগত আট বছরের জমে থাকা সমস্ত লাঞ্ছনা, অপমান আর আগ্নেয়গিরির লাভা একবারে বেরিয়ে এল— — “তুমি কোন সাহসে, কোন মুখে এই দামি স্কুলের কথা বলছ রাশেদ? তুমি কি ভুলে গেছ আমার বাবা নিজের জমানো টাকা দিয়ে নূরকে এই স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন? আর তুমি? প্রতি মাসে ওর স্কুলের ফি আটকানোর জন্য স্কুলের নোটিশ বোর্ডে নূরের নাম উঠেছে! স্কুলের প্রিন্সিপালের রুমে দাঁড়িয়ে ফি না দেওয়ার জন্য আমাকে আর আমার মেয়েকে অপমান সহ্য করতে হয়েছে!”

রাশেদ থতমত খেয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার পকেটের ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে হালিমা ভাবীর নাম দেখেই ও এক লাফে ব্যালকনিতে চলে গেল। দু-মিনিট নিচু স্বরে কথা বলে হন্তদন্ত হয়ে ঘরের ভেতরে এসে চাবিটা তুলে নিয়ে বলল— — “সায়েমের নাকি খুব ধুম জ্বর এসেছে… হালিমা একা কিছুতেই সামলাতে পারছে না। আমি ওদিকে যাচ্ছি।” যাওয়ার সময় ও একবারের জন্যও পেছনে ফিরে নূরের মলিন মুখটার দিকে তাকাল না, জিজ্ঞেসও করল না মেয়েটা দুপুর থেকে কিছু খেয়েছে কি না।

গভীর রাতে নূরের পড়ার টেবিলটা গুছিয়ে ওর বইগুলো ব্যাগে ভরার সময় ডায়েরির ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা ড্রয়িং খাতা বেরিয়ে এল। ওটা নূরের আঁকা একটা ছবি—একটা সাজানো সম্পূর্ণ পরিবার; একজন বাবা, একজন মা, একটা মিষ্টি মেয়ে আর একটা ছোট ছেলে। ছবির নিচে কাঁপাকাঁপা অক্ষরে লেখা— “আমার ভাই”। কিন্তু কাগজের উল্টো পিঠটা উল্টাতেই আমার চোখের জল আর বাঁধ মানল না। সেখানে নূরের কাঁচা হাতের লেখায় লেখা ছিল— “আমার খুব ইচ্ছে, আমার জন্মদিনে আমার নিজের পছন্দের একটা কেক কাটা হবে… কিন্তু বাবা সবসময় সায়েম ভাইয়ার পছন্দের চকলেট কেকটাই আনে, আর আমি ওটার এক টুকরোও পাই না।” আমার বুকটা যেন কেউ এক লহমায় হাজার টুকরো করে ভেঙে দিল।

রাতের খাবার শেষে সাত বছরের নূর নিজেই রান্নাঘরের একটা ছোট টুল টেনে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ছোট্ট, কোমল হাত দুটো দিয়ে রাতের বাসনগুলো মাজতে লাগল। শীতের তীব্র ঠান্ডায় ওর ছোট ছোট আঙুলগুলো ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। আমি গিয়ে ওর ভেজা হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরলাম। বললাম, — “নূর, সোনা আমার… আমরা যদি এই শহর ছেড়ে চিরকালের জন্য গ্রামের দাদুর বাড়িতে চলে যাই, তোমার কেমন লাগবে?” নূরের বিষণ্ণ চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে এক অপার্থিব আনন্দে জ্বলে উঠল। ও খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল, — “সত্যি বলছ মা? আমরা অনেকদিন দাদুর বাড়ি থাকব? আমি আমার নতুন পেন্সিল বক্সটা দাদুকে দেখাব!”

আমি আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে আমাদের কাপড়ের ব্যাগগুলো গোছাতে শুরু করলাম। রাত বারোটার পর রাশেদ যখন কলিং বেল টিপে ঘরে ঢুকল এবং মেঝের ওপর গোছানো ব্যাগগুলো দেখল, ও চরম বিরক্তিতে চিৎকার করে উঠল— — “তুমি এখনও এই পাগলামি নিয়ে বসে আছ নাদিয়া? একটা সামান্য বিষয় নিয়ে এত নাটক করার কী আছে?” আমি খুব শান্ত, হিমশীতল গলায় বললাম— — “আমি কোনো নাটক করছিঠি না রাশেদ… আমি আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। কাল সকালেই আমরা চলে যাচ্ছি।”

রাশেদ সোফায় বসে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর কিছুটা সুর নরম করে বলল— — “দেখো নাদিয়া, আমি ঠান্ডা মাথায় একটা পারফেক্ট সমাধান পেয়েছি। এটা করলে আমাদের সব সমস্যার চিরকালের মতো সমাধান হয়ে যাবে…” রাশেদের মুখের এই কথাটা শুনে আমার মনের কোণে এক চিলতে আশার আলো জেগেছিল। ভাবলাম, হয়তো এতদিনে ও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, হয়তো এবার আমাদের ভাঙা সংসারটা জোড়া লাগবে। কিন্তু তার পরের মুহূর্তেই রাশেদ যা বলল, তা যেন আমার পায়ের তলার মাটি এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে আমার আস্ত পৃথিবীকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল।

রাশেদ কোনো দ্বিধা ছাড়াই অবলীলায় বলল— — “আমি হালিমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ও আর সায়েম এবার থেকে আমাদের এই এক ছাদের নিচেই থাকবে… তাহলে দুটোর আলাদা খরচ বাঁচবে। এরপর যা থাকবে, তাই দিয়ে আমরা সবাই মিলেমিশে একসাথে চলব।”

আমি স্তব্ধ, নির্বাক হয়ে ওখানেই জমে গেলাম। আমার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না। আমি শুধু সোফার কোণে বসে থাকা আমার ছোট্ট মেয়ে নূরের দিকে তাকালাম। সাত বছরের মেয়েটা হয়তো বিয়ের মানে বোঝে না, কিন্তু সে এক তীব্র আতঙ্কে নিজের জুতোর ফিতে দিয়ে বাঁধা ভাঙা স্কুল ব্যাগটা বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পাথরের মতো বসে রইল…।

(চলবে…)


সংগৃহীত