যে পথ গেছে বেঁকে
গল্প ডেস্ক
সকালবেলা থেকেই আহমেদ বাড়ির পরিবেশটা কেমন যেন গোধূলির আলো-আঁধারির মতো থমথমে হয়ে আছে। ডাইনিং টেবিলে বসে শায়ান খুব তাড়াহুড়ো করে নাস্তা খাচ্ছিল, তার চোখজোড়া বরাবরের মতোই আটকে আছে ফোনের স্ক্রিনে। ঠিক এই সময় শায়ানের মা শর্মিলা আহমেদ ছেলের সামনে চায়ের কাপটি আলতো করে এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "একটা কথা বলার ছিল।"
শায়ান অত্যন্ত ব্যস্ততার সাথে ফোন থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল, "বলো।"
শর্মিলা আহমেদ আড়চোখে রান্নাঘরের দিকে তাকালেন। সেখানে তার পুত্রবধূ উপমা অত্যন্ত দ্রুত হাতে সকালের বাকি কাজকর্মগুলো সারছে, যাতে শায়ান বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেই তার দুপুরের টিফিনটা তৈরি করে হাতে ধরিয়ে দিতে পারে। উপমার ক্লান্ত চেহারাটার দিকে তাকিয়ে শর্মিলার মনে এক অদ্ভুত সন্দেহের জন্ম নিল। মেয়েটার চোখের নিচে কালচে দাগ, মুখটা কেমন অন্ধকার ও অনুজ্জ্বল হয়ে আছে। অথচ গতকালও তো মেয়েটার চেহারায় একটা অন্যরকম উজ্জ্বলতা ছিল!
উপমার এই শান্ত আচরণ শর্মিলার মনের ভেতর রাগ আরও বাড়িয়ে দিল। গতরাতের কথা মনে পড়তেই তার মন থেকে সমস্ত মায়া যেন এক নিমেষে উবে গেল। রাগ আর ক্ষোভের কারণে গতরাতে তিনি ইচ্ছে করেই ফ্রিজে থাকা সব বাড়তি খাবার ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, সকালে খাবার না পেয়ে উপমা নিশ্চয়ই তর্কাতর্কি করবে আর সেই সুযোগে তিনি ওকে ইচ্ছেমতো শাসন করবেন। কিন্তু উপমা আজ সকাল থেকে সম্পূর্ণ শান্ত, যেন কিছুই হয়নি। এই নীরবতা শর্মিলা আহমেদ সহ্য করতে পারছিলেন না।
হঠাৎ মেজাজ হারিয়ে তিনি ছেলের উদ্দেশ্যে কড়া গলায় বলে উঠলেন, "তোর বউ যে ইদানীং বাইরে বের হওয়া শিখেছে, খেয়াল করেছিস?"
শায়ান একইভাবে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে নির্বিকারভাবে উত্তর দিল, "যাক না। সমস্যা কী?"
ছেলের এমন উদাসীনতা দেখে শর্মিলার রাগ আকাশ ছুঁল। তিনি ঝাঁঝালো গলায় বললেন, "ও গতকাল একটা পাতলা শাড়ি পরে বেরিয়েছিল। সারা শরীর দেখা যাচ্ছিল। আমি নিষেধ করা সত্ত্বেও ও আমার কথা কানেই নেয়নি। এমনকি মধ্যরাত পর্যন্ত পার্টিতে ব্যস্ত ছিল। তুই আসার পর আমি ওকে কতবার কল দিলাম, অথচ ও আমার একটা কলও রিসিভ করল না!"
এবার শায়ান কিছুটা অবাক হয়ে ফোন থেকে চোখ তুলে তাকাল, "পার্টিতে? কেন?"
"কাল নাকি ওর জন্মদিন ছিল। ওর বন্ধুবান্ধবরা ওকে সারপ্রাইজ দিতে পার্টি রেখেছিল। তুই জানতিস না?"—শর্মিলার গলায় স্পষ্ট খোঁচা।
শায়ান বিস্মিত চোখে রান্নাঘরের দিকে তাকাল। উপমার ক্লান্ত-শ্রান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে এক অজানা মায়া জেগে উঠলেও, সেই মায়া শায়ানের মনের গভীর ঘর পর্যন্ত পৌঁছাল না। সে নিজের ফোনের কললিস্ট ঘেঁটে কিছুটা অপরাধবোধ নিয়ে বলল, "আমার মনে ছিল না।"
শর্মিলা আহমেদ হাল ছাড়লেন না। তিনি বললেন, "দ্যাখ... ও পার্টিতে যাক, আমি নিষেধ করি না। কিন্তু আমি ওকে শাড়িটা পাল্টে যেতে বলেছিলাম। একবার দ্যাখ... কী শাড়ি ছিল ওর পরনে!"
এই বলে তিনি নিজের ফোনটি বের করে উপমার একটি ছবি শায়ানের সামনে ধরলেন। ছবিটি তিনি লুকিয়ে তুলেছিলেন এবং নিজের মতো করে কিছুটা এডিট করে উপমার পরিহিত স্বাভাবিক শাড়িটিকে মশারির মতো পাতলা বানিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে শরীরের ভাঁজ স্পষ্ট দেখায়। তিনি ভেবেছিলেন এই দৃশ্য দেখে শায়ান অন্তত রেগে গিয়ে বউকে বকা দেবে এবং নিজের ঘরের প্রতি একটু আগ্রহী হবে।
শায়ান ছবির দিকে তাকাল, তারপর রান্নাঘরে থাকা উপমার দিকে দেখল। কয়েক সেকেন্ড দেখার পর তার চোখে যেন এক অদ্ভুত উদাসীনতার নেশা ফুটে উঠল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে মাকে বলল, "এই যুগের মেয়ে। এসবই তো পরবে। তুমি আর নিষেধ করো না। ওর যা ইচ্ছা, ও তা-ই করুক।"
ছেলের এই চরম নির্বিকার আচরণে শর্মিলা আহমেদ চমকে উঠলেন। তিনি রেগে গিয়ে বললেন, "তুই প্রশ্রয় দিচ্ছিস এসব? এই শাড়ি? ছিঃ ছিঃ! লোকে যদি জানে, আমাদের বাড়ির বউ শরীর দেখিয়ে বাইরে ঘোরাঘুরি করে... তখন আমাদের সম্মান থাকবে?"
শায়ান বিরক্ত হয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, "মা প্লিজ... এসব কথা শুনতে ভালো লাগছে না। আমার দেরী হচ্ছে। আমি উঠলাম।"
ঠিক সেই মুহূর্তেই উপমা টিফিন ক্যারিয়ার হাতে ডাইনিং রুমে এসে দাঁড়াল। সে শায়ানের দিকে সেটি বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বলল, "তোমার টিফিন। সময়মতো খেয়ে নিও।"
শায়ান কোনো উত্তর না দিয়ে টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে নিতে যাবে, ঠিক তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ ভেসে উঠল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটি নাম—'শ্রীতমা'। উপমা না চাইতেও মেসেজটির দিকে তার চোখ চলে গেল এবং সে এক পলকেই লেখাটি পড়ে ফেলল। তবে মুখে সে এমন একটা ভাব করল যেন সে কিছুই দেখেনি। সে স্বাভাবিক গলায় বলল, "দেরী হয়ে যাচ্ছে না? আমি কিন্তু আজ একটু বাইরে যাব। আমাকে কিছু টাকা দিতে পারবে?"
শায়ান নিঃশব্দে প্যান্টের পকেট থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে উপমার হাতে দিয়ে বলল, "প্রয়োজনমতো খরচ করে নিয়ো।"
উপমা কার্ডটি নিয়ে শুধু বলল, "থ্যাংক ইউ।"
সংগৃহীত