ইছামতীর তীরে দুই

"ইছামতীর শান্ত জল তখন বিকেলের ম্লান আলোয় গলানো সোনার মতো চকচক করছে। ঘাট ঘেঁষে কাশবনের দুলুনি, আর ঘাটে বাঁধা এক ছোট্ট ডিঙি নৌকা। সেখানেই মুখোমুখি এক ভবঘুরে পথিক শ্রীকান্ত এবং নিশ্চিন্দিপুরের চঞ্চল বুনো কিশোরী দুর্গা। দুই চিরচেনা উপন্যাসের চরিত্রদের এক অসামান্য ও কাল্পনিক মিলনকাহিনী।"

ইছামতীর শান্ত জল তখন বিকেলের ম্লান আলোয় গলানো সোনার মতো চকচক করছে। নদীর পাড় ঘেঁষে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত কাশবেনের মাথাগুলো উত্তুরে হাওয়ায় মৃদু দুলছে। ঘাটে বাঁধা একটা ছোট্ট ডিঙি নৌকা, মাঝির দেখা নেই। আর সেই নৌকার ঠিক পাশেই, নদীর দিকে পা ঝুলিয়ে বসে আছে এক যুবক—*শ্রীকান্ত*।

তার চোখে কোনো গন্তব্যের তাগিদ নেই, বুকে কোনো পিছুটান নেই। রাজলক্ষ্মীর সেই দমবন্ধ করা ভালোবাসা, অভয়ার সেই বিদ্রোহী রূপ— সবকছু পেছনে ফেলে সে আজ আবার একা। নদীর জলের কুলকুল শব্দের ভেতর সে যেন এক চিরন্তন সুরের খোঁজ পাচ্ছে।

এমন সময় কাশবনের দিক থেকে একটা শুকনো পাতা মাড়ানোর মড়মড় শব্দ ভেসে এল। শ্রীকান্ত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। কাশবনের জঙ্গল ফুঁড়ে বেরিয়ে এল এক কিশোরী। পরনে একটা শতচ্ছিন্ন দুরে শাড়ি, রুক্ষ উড়ন্ত চুল, আর বড় বড় দুটো চোখে সীমাহীন কৌতূহল।

শ্রীকান্ত জীবনে বহু নারী দেখেছে, কিন্তু এমন অকৃত্রিম, বুনো আর নিষ্পাপ একটা মুখ সে আগে কখনো দেখেনি। মেয়েটি যেন কোনো মানুষ নয়, এই ইছামতীর পাড়ের মাটি, জল আর হাওয়ারই একটা জীবন্ত রূপ।

মেয়েটির আঁচলে কিছু একটা সযত্নে বাঁধা। শ্রীকান্তকে ওখানে বসে থাকতে দেখে সে একটুও থমকাল না। বরং এগিয়ে এসে একেবারে শ্রীকান্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, ভরাট আর তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল,
— "তুমি কে গো? ওই নৌকায় কোথায় যাবে?"

শ্রীকান্ত একটু হাসল। তার সেই চিরচেনা উদাসীন হাসি।
— "কোথায় যাব তা তো জানি না। ওই নদী যেদিকে নিয়ে যাবে।"

মেয়েটির কপালে ভাঁজ পড়ল। এই কথাটার কোনো মানে তার কাছে নেই।
— "নদী আবার কোথায় নিয়ে যাবে? তোমার কি বাড়ি নেই? মা নেই?"
— "না। আমার ঘরবাড়ি কিছু নেই। আমি ভবঘুরে। পথেই পথেই ঘুরি।"

*দুর্গা* অবাক চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইল। যার বাড়ি নেই, সে আবার কেমন মানুষ! দুর্গার নিজেরও তো ওই নিশ্চিন্দিপুরের ভাঙা বাড়িটায় মন টেকেন না। সারাদিন বনে-বাদাড়ে ঘুরেই কাটে। কিন্তু তাই বলে বাড়ি থাকবে না? অপুকে ফেলে সে কি কোথাও যেতে পারে?

হঠাৎ কী মনে হতে দুর্গা জিজ্ঞেস করল,
— "তুমি বুঝি অনেক দূর দূর গিয়েছ?"
— "তা গিয়েছি বৈকি।"

দুর্গার চোখদুটো মুহূর্তে গোল গোল হয়ে উঠল।
— "রেলগাড়ি যেখানে যায়, সেখানেও?"

শ্রীকান্ত মেয়েটির দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
— "রেলগাড়ির চেয়েও দূরে হয়তো। কেন?"
— "এমনি।"

অপু রেলগাড়ি দেখবে বলে ভারী পাগল। দুর্গা কাশবনের ওপারে দূরের মাঠের দিকে তাকাল।
— "সেবার আমরা দুজনে কতদূর মাঠ পেরিয়ে গিয়েছিলাম জানো? শুধু রেলগাড়ি দেখব বলে। অপুটা হাঁপিয়ে গিয়েছিল, তবু বাড়ি ফিরবে না। দাঁড়িয়ে থাকবে। রেলগাড়ি না দেখে ফিরবেই না।"

কথাটা বলতে বলতে দুর্গা হেসে ফেলল।
— "শেষে যখন দেখল—কী যে খুশি! যেন রাজ্যের কী পেয়েছে!"

শ্রীকান্ত চুপ করে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে কত পথ পেরিয়েছে। কত অচেনা শহর, কত নদী, কত মানুষের মুখ তার স্মৃতিতে এসে আবার মুছে গেছে। অথচ একটা রেলগাড়ি দেখার জন্য মাঠের পর মাঠ হেঁটে যাওয়া—এবং তা দেখে এমন খুশি হওয়া—কথাটা তার কাছে হঠাৎ বড় আশ্চর্য মনে হলো。

— "অপু বুঝি তোমার খুব ন্যাওটা?" শ্রীকান্ত জিজ্ঞেস করল।
— "ন্যাওটা আবার কী!" দুর্গা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল। "আমি না থাকলে ওর কিছু চলে নাকি?"

কথাটা বলেই সে আঁচলের গিঁটের দিকে একবার তাকাল। তারপর একটু নিচু গলায় বলল,
— "কাল আমাদের গাঁয়ে মেলা বসবে। অপু বলেছে এক পয়সার টিনের বাঁশি কিনবে। কিন্তু ওর পয়সা কোথায়?"

দুর্গা যেন নিজের মনেই কথাটা বলল। তারপর আবার হেসে উঠল।
— "আমি দেখি যদি কোথাও একটা পয়সা পাই। ওকে বলিনি কিন্তু। বললে আজ রাত থেকে ঘুমোবে না।"

শ্রীকান্তের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটল। দুর্গার বয়স কতই বা! অথচ অপুর কথা বলার সময় তার চোখেমুখে এমন এক নিশ্চিন্ত অধিকার ফুটে উঠল, যেন ছোট্ট ছেলেটার সমস্ত সুখ-দুঃখের ভার সে নিজের কাঁধেই নিয়ে রেখেছে।

শ্রীকান্ত জীবনে প্রেম দেখেছে, মানুষের অদ্ভুত সব বন্ধন দেখেছে। আর দূর থেকে মায়ের স্নেহও দেখেছে। কিন্তু এই ছেঁড়া শাড়ি-পরা মেয়েটির চোখে ভাইয়ের জন্য যে অকারণ ব্যস্ততা, তার মধ্যে সে যেন স্নেহের একবারে আদিম, অনাড়ম্বর রূপ দেখতে পেল।

সে বুঝল, এই মেয়েটির কাছে পৃথিবীর কোনো জটিলতা এখনো পৌঁছায়নি। সমাজের কোনো নিয়ম একে বাঁধতে পারেনি। আর সেই ছেলেটা অপু... কে সে! কেন তাকে নিজের মত মনে হল কে জানে!

— "তা তোমার নাম কী খুকি?" শ্রীকান্ত শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল。
— "দুর্গা।"

একগাল হেসে উত্তর দিল সে। তারপর হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তে নিজের আঁচলের গিঁট খুলতে শুরু করল।
— "তুমি খাবে? এই দ্যাখো, ভুবন মুখুজ্যের বাগান থেকে কুড়িয়ে এনেছি। ভারী মিষ্টি!"

আঁচল খুলে দুর্গা দুটো ডাঁসা পেয়ারা শ্রীকান্তের দিকে এগিয়ে দিল। শ্রীকান্ত স্তব্ধ হয়ে গেল।

তার জীবনে কেউ তাকে নিজের সবটুকু সম্পত্তি দিয়ে বেঁধে রাখতে চেয়েছে, কেউ তার কাছে আশ্রয় খুঁজেছে। কিন্তু এমন নির্লিপ্ত, নিঃস্বার্থ উপহার তাকে কেউ দেয়নি। একটা ছোট্ট বন্য মেয়ে, যার নিজেরই হয়তো ঠিকমতো খাওয়া জোটে না, সে তার কুড়িয়ে আনা শ্রেষ্ঠ সম্পদ অবলীলায় তুলে দিচ্ছে এক অচেনা পথিকের হাতে।

শ্রীকান্ত হাত বাড়িয়ে পেয়ারা দুটো নিল।
— "খুব মিষ্টি বুঝি?"
— "হুঁ! তুমি খেয়ে দ্যাখো।"

দুর্গা একটু থামল। তারপর আঁচলের ভেতর হাত দিয়ে আরও একটা ছোট পেয়ারা বের করল। আগের দুটোর মতো ডাঁসা নয়। একপাশে একটু দাগও লেগেছে। সেটা আবার আঁচলের খুঁটে বাঁধতে বাঁধতে বলল,
— "এটা অপুর জন্য। ও একটা না পেলে মুখ ভার করে বসে থাকবে।"

শ্রীকান্ত কিছু বলল না। তার হাতে তখন দুটো ডাঁসা পেয়ারা। আর দুর্গা নিজের ভাইয়ের জন্য তুলে রেখেছে সবচেয়ে ছোট, দাগ-লাগা পেয়ারাটা। কেন জানি এই সামান্য ব্যাপারটুকুই তার বুকের কোথাও গিয়ে লাগল।

দুর্গা হয়তো নিজেও জানে না, সে কী করেছে। হিসাব করে ভালোবাসার বয়স তার হয়নি। তবু নিজের আঁচলের গিঁটে, কুড়িয়ে পাওয়া ফলের মধ্যে, এক পয়সার টিনের বাঁশির চিন্তায়—অপু যেন সর্বক্ষণ তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়।

শ্রীকান্তের হঠাৎ মনে হলো, পৃথিবীর পথে পথে সে কত বড় বড় বন্ধনের কথা শুনেছে। অথচ কোনো কোনো বন্ধন এমনও হয়, যার কোনো নাম দিতে হয় না।

হঠাৎ দূর থেকে মাঝির হাঁক শোনা গেল,
— "বাবু, জোয়ার আসছে! এবার রওনা দিতে হবে।"

শ্রীকান্ত উঠে দাঁড়াল। নৌকায় ওঠার আগে সে পেয়ারা দুটো সযত্নে নিজের চাদরের খুঁটে বাঁধল। দুর্গা তখনও ঘাটেই দাঁড়িয়ে আছে।
— "তুমি আর আসবে না?" দুর্গা জিজ্ঞেস করল। কেমন যেন এই লোকটার মধ্যে অপুর মত ভাব আছে। একা একা ঘোরে। কোনো চালচুলো নেই। কে জানে!

শ্রীকান্ত নৌকায় পা রেখে হাসল।
— "পথিক কি কখনো এক ঘাটে দু'বার ফেরে গো দুগ্গা মা? তবে এই পেয়ারার স্বাদ আমার মনে থাকবে।"

দুর্গা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ যেন কী একটা মনে পড়তেই বলে উঠল,
— "অপু তোমায় দেখলে ভারী খুশি হতো। ও-ও বলে, একদিন তোমার মতো পথে পথে বেরোবে। সব নদী, সব গাঁ, সব রেলগাড়ির পথ ধরে ঘুরে বেড়াবে। কিন্তু ওকে একা ছাড়ে কে!"

কথাটা বলেই দুর্গা মুচকি হেসে যেন আরও কিছু বলতে চাইল। কিন্তু হঠাৎ কী মনে হতে সে থেমে গেল। তারপর একটু ইতস্তত করে বলল,
— "কাল কিন্তু মেলা! থেকে গেলে যেতে পারতে।"
— "তুমি যাবে?"
— "যাব না আবার!"

দুর্গার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— "অপুকে নিয়ে যাব। ও বাঁশি কিনবে। তারপর সারারাত প্যাঁ-প্যাঁ করে বাজিয়ে আমার মাথা খাবে।"

শ্রীকান্ত হেসে ফেলল। দুর্গা এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন লোকটার মধ্যে সবকিছুই আশ্চর্য হওয়ার মতো।
— "ও যে চেয়েছে।"

শ্রীকান্তের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। মাঝি আবার তাড়া দিল। নৌকা ধীরে ধীরে ঘাট ছেড়ে মাঝনদীতে গিয়ে পড়ল।

শ্রীকান্ত ছইয়ের কাছে বসে পিছন ফিরে তাকাল। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই রুক্ষ চুলের কিশোরীটিকে তখন কাশবনের মতোই প্রকৃতির একটা অংশ বলে মনে হচ্ছে।

দুর্গা তখনও দাঁড়িয়ে। তার আঁচলের খুঁটে অপুর জন্য রাখা ছোট্ট পেয়ারাটা বাঁধা।

কাল রথের মেলা। হয়তো সে সত্যিই কোথাও থেকে একটা পয়সা জোগাড় করবে। হয়তো অপু টিনের বাঁশি কিনে সারাপথ বাজাতে বাজাতে ফিরবে। আর দুর্গা বিরক্ত হওয়ার ভান করে তার পাশ দিয়ে হাঁটবে।

শ্রীকান্ত জানে না। সে শুধু দেখল, মেয়েটি ধীরে ধীরে নদীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কাশবনের পথে হাঁটা দিল।

শ্রীকান্তের মনে হলো, সে নিজে সারা জীবন যে অনন্ত মুক্তির খোঁজে ছুটে বেড়িয়েছে, এই মেয়েটি স্নেহের শিকড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়েও তার চেয়ে অদ্ভুত রকমের এক স্বাধীন জীবন বেঁচে আছে।

নৌকা বাঁক ঘুরল। ইছামতীর বুকে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।


সংগৃহীত