১. তিলোত্তমার বুকে নিস্তব্ধতার মেঘ
উত্তর কলকাতার সেই পুরোনো ছাঁচের বাড়িটার ঘরে তখন এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। ঘরের কোণে মৃদু আলো ছড়াচ্ছে একটি টেবিল ল্যাম্প। বইয়ের তাকে ঠাসা শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে জীবনানন্দ—যেন এক টুকরো আস্ত সাহিত্যজগৎ। দেওয়ালে ঝোলানো ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা ঘরের এই কোণটিকে করে তুলেছে অনির্বাণের এক নিজস্ব ছোট পৃথিবী। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করা অনির্বাণ এখন পুরোদস্তুর লেখক ও কবি। বেশ কিছুদিন ধরে সে মগ্ন হয়ে লিখছে তার জীবনের প্রথম বড় উপন্যাস, যার নাম সে দিয়েছে—"হৃদয়পুরের ট্রামলাইন"।
আর তার ঠিক বিপরীতে বসে আছে রিয়া। গোয়েঙ্কা কলেজ থেকে অ্যাকাউন্টেন্সিতে অনার্স করে এখন সল্টলেকের এক নামী কর্পোরেট সংস্থায় ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত সে। রিয়ার জীবনটা যেন ব্যালেন্স শিটের ডেবিট আর ক্রেডিটের মতোই হিসেবি, নিয়মে বাঁধা। বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি নেমেছে। তিলোত্তমা কলকাতার বুকে আলতো বর্ষার ছোঁয়া। ঘরের ভেতরে অনির্বাণ নিজের খাতা-কলম আর একটি ডায়েরি নিয়ে বসে আছে। রিয়া অফিস থেকে ফিরে শাড়িটা পর্যন্ত না ছেড়েই হাতমুখ ধুয়ে ক্লান্তি কাটাতে একটি বই হাতে বিছানায় বসেছে। অথচ দুজনের মাঝখানে কেমন যেন একটি নিস্তব্ধতা জমে উঠেছে।
২. মান-অভিমানের খেরোখাতা
হঠাৎ অনির্বাণ হাতের খাতাটা বন্ধ করে রিয়ার দিকে পিঠ ফিরিয়ে একটু মান-অভিমানের সুরে বলল, "তুমি সারাদিন কাজ আর ক্লায়েন্ট নিয়ে এত ব্যস্ত থাকো, রিয়া, আমার জন্য তোমার কোনো সময়ই থাকে না। এই যে আমি একটা আস্ত উপন্যাস শেষ করতে চললাম, তুমি একটা লাইনও পড়ে দেখলে না! সত্যি বলছি, আজকাল আমার ভীষণ একা লাগে।"
রিয়া বইটা হাত থেকে নামিয়ে রাখল। সারাদিন ট্যাক্স, অডিট আর ফাইলের চক্করে ক্লান্ত হয়ে ফেরে সে। অনির্বাণের এই কবিসুলভ অভিমান দেখে তার ঠোঁটের কোণে মিষ্টি এক হাসি ফুটে উঠল। সে একটু ঘুরে বসে অনির্বাণের পিঠে নিজের পিঠ ঠেকিয়ে দিল। আদুরে গলায় বলল, "সরি বাবা, আর এমন হবে না। আমারই ভুল হয়ে গেছে। আসলে কোয়ার্টার-এন্ডের চাপ চলছিল তো, তাই একটু জড়িয়ে পড়েছিলাম।"
অনির্বাণ মুখটা সামান্য ঘুরিয়ে বলল, "ভুল তো তোমার রোজই হয়, রিয়া। তোমার ওই ডেবিট-ক্রেডিটের হিসাবের খাতায় আমার আবেগের কোনো কলামই নেই! সাহিত্যিককে ভালোবেসেছিলে যখন, তখন জানতে না যে আমাদের একটু আধটু অ্যাটেনশন বেশি লাগে?"
রিয়া মৃদু হেসে অনির্বাণের কাঁধে আলতো করে মাথা রাখল। "বাব্বাহ! মেজাজটা তো দেখছি একেবারে সপ্তম আকাশে। আচ্ছা কবিমশাই, একটা কথা বলো তো? তোমার এই নতুন উপন্যাসটার নাম কী যেন?"
"হৃদয়পুরের ট্রামলাইন।" —গলায় এখনও সামান্য গাম্ভীর্য ধরে রাখার চেষ্টা করল অনির্বাণ, যদিও রিয়ার স্পর্শে তার অভিমান অনেকটাই গলে গেছে।
৩. অর্ক, তিতলি এবং একটি বৃষ্টির সন্ধে
রিয়া একটু কাছে সরে এল। "আচ্ছা, এই হৃদয়পুরের ট্রামলাইন-এর মূল চরিত্র দুটোর নাম কী? শুনি তো..."
অনির্বাণ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে উত্তর দিল, "অর্ক আর তিতলি।"
রিয়া অনির্বাণের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম স্বরে বলল, "তাহলে শোনো, অর্ক আর তিতলির গল্পটা হয়তো তুমি খাতায় লিখছ, কিন্তু রিয়া আর অনির্বাণের গল্পটাতে তো আমরা প্রতিদিন একসঙ্গে বাঁচি, তাই না?"
অনির্বাণ কিছু বলল না। শুধু চুপ করে শুনতে লাগল। রিয়ার কথার জাদু তার ভেতরের সমস্ত মেঘ কাটিয়ে দিচ্ছিল।
রিয়া আবার বলল, "আজ সব খাতা-কলম, ডায়েরি আর ল্যাপটপ বন্ধ। এই মেঘলা সন্ধ্যায় চলো, আমরা দুজনে গঙ্গার ঘাট থেকে ঘুরে আসি।"
"এই বৃষ্টিতে গঙ্গার ঘাট?" —এবার সত্যিই ঘুরে তাকাল অনির্বাণ।
রিয়া হেসে মাথা নাড়ল। "হ্যাঁ, এই বৃষ্টিতেই। ঘাটে বসে ছাতা মাথায় দিয়ে দু-ভাঁড় দুধ চা খাব। আর তুমি আমাকে তোমার উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়টা পড়ে শোনাবে। রাজি?"
৪. রিয়েল ম্যাজিশিয়ান এবং নতুন নিয়ম
রিয়ার চোখে তখন অদ্ভুত এক আবদার, আর সেই আবদারের ভেতর লুকিয়ে থাকা গভীর ভালোবাসা। অনির্বাণ কিছুক্ষণ রিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হলো, এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সমস্ত অভিমান বৃষ্টির জলে ধুয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সে হালকা হেসে বলল, "তুমি পারোও বটে, রিয়া! মুহূর্তের মধ্যে মানুষের সব রাগ গলিয়ে দিতে পারো! ইউ আর আ রিয়েল ম্যাজিশিয়ান, রিয়া!"
রিয়া দুষ্টু হেসে বলল, "হুমমম মশাই! পৃথিবীর সব প্রেমিকারাই ম্যাজিশিয়ান হয়, দক্ষ হাতে প্রেমিকের রাগ দমন করতে পারে...বুঝলেন, মিস্টার কবি?"
তারপর একটু থেমে রিয়া বলল, "আচ্ছা অনি... কী মনে হয় তোমার? হিসাবের খাতা সামলাই বলে কি সম্পর্কের হিসাবও ভুলে যাব?"
"না, তা তুমি ভুলো না। শুধু মাঝে মাঝে আমাকে মনে করিয়ে দিতে হয়।"
"তাহলে আজ থেকে একটা নতুন নিয়ম হলো।"
"কী নিয়ম?"
"প্রতি নতুন অধ্যায় শেষ হলে তার প্রথম পাঠক আমি।"
অনির্বাণ ভুরু তুলে বলল, "আর প্রতি কোয়ার্টার-এন্ডের পরে আমার জন্য এক কাপ চা?"
"এক কাপ কেন? দু-ভাঁড়... ব্যস!!" —দুজনেই একসঙ্গে হেসে উঠল।
৫. উপসংহার: ছাতা মাথায় গঙ্গার পথ
কলকাতার বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, অ্যাকাউন্টিংয়ের কড়া হিসাব আর সাহিত্যের নরম আবেগ যেন হাত ধরাধরি করে বেরিয়ে পড়ল গঙ্গার ঘাটের পথে। শহরের কোথাও হয়তো ট্রামলাইন এখনও ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে, আর সেই ট্রামলাইনের মতোই রিয়া আর অনির্বাণের গল্পটাও এগিয়ে চলেছে... অভিমান, ভালোবাসা আর একসঙ্গে বেঁচে থাকার ছোট ছোট মুহূর্তকে সঙ্গী করে।
সংগৃহীত