গোলদীঘির ভূত

আমি তখন সবে এক দৈনিক সংবাদপত্রের অফিসে সাংবাদিকের কাজ নিয়েছি। কাজ তেমন কিছু নয়, কিন্তু রবিবারের কলামের জন্য হরেক রকমের পত্রিকা খুঁটিয়ে পড়াটাই ছিল আসল বিভীষিকা। একদিন এক অদ্ভুত চিঠিতে আমার চোখ আটকে গেল। গোলদীঘি এলাকার এক বাসিন্দা লিখেছেন যে, সেখানে এক অশরীরীর উপদ্রবে সবাই অতিষ্ঠ; যখন-তখন তার আবির্ভাব আর প্রস্থান মানুষের হৃৎকম্প বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কলকাতার বুকে ভূত! সম্পাদক মশাই আমাকে তলব করলেন। তিনি বললেন গোলদীঘি গিয়ে ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে, কালকের কাগজে মুখরোচক খবর চাই। যদিও ভূতের নামে আমার হাড় হিম হয়ে যায়, তবু পকেটে আড়াই টাকা গুঁজে দিয়ে সম্পাদক আমাকে পাঠিয়ে দিলেন গোলদীঘির কফি হাউসে, যদি সেখানে কোনো সূত্র মেলে।

সেদিন ছিল মেঘলা বিকেল, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। গোলদীঘি চত্বরে সন্দেহভাজন কাউকেই না দেখে আমি কফি হাউসে গিয়ে ঢুকলাম। সেখানে এক কোণে এক হাফশার্ট পরা ভদ্রলোক বসে ছিলেন, যাঁকে দেখে বেশ ‘ভূত-তটস্থ’ মনে হচ্ছিল। আমি তাঁর টেবিলে বসে কফি আর চিপসের অর্ডার দিলাম এবং কথায় কথায় ভূতের প্রসঙ্গ পাড়লাম।

ভদ্রলোক কিন্তু ভূত মানতে নারাজ। তিনি বরং এক অদ্ভুত নেশায় মত্ত—আইসক্রিম খাওয়া! আমি এক কাপ কফিতে চুমুক দিচ্ছি, আর তিনি একের পর এক সতেরো গ্লাস আইসক্রিম সাবাড় করে দিলেন। ভূতের কথা তুলতেই তিনি বললেন, “কলকাতায় ভূত থাকার জায়গা কোথায়? সব তো ইহলোকপ্রাপ্ত হয়েছে”।

আইসক্রিম খেয়ে তৃপ্ত হয়ে ভদ্রলোক কখন যে উঠে চলে গেলেন আমি টেরও পাইনি। বিপত্তি ঘটল বিল মেটানোর সময়। ওয়েটার এসে পনেরো টাকার বিল ধরিয়ে দিল! আমি প্রতিবাদ করে বললাম, “আমি তো মাত্র তিন কাপ কফি খেয়েছি!” ওয়েটার সাফ জানিয়ে দিল যে আমার টেবিলে আর কেউ ছিল না, আমিই নাকি সব খেয়েছি। পকেটে মাত্র আড়াই টাকা নিয়ে আমি তখন চোখে সর্ষে ফুল দেখছি।

পয়সা দিতে না পারায় কফি হাউসের লোকেরা পুলিশ ডাকার হুমকি দিল। তখনই এক পাহারাওয়ালা এসে আমার ঘাড় পাকড়াও করল। আমি যখন বাঁচার জন্য ছটফট করছি, ঠিক তখনই দেখলাম সেই আইসক্রিম-খোর ভদ্রলোক ম্যালকোঁচা মেরে এগিয়ে আসছেন। ভাবলাম হয়তো আমায় বাঁচাতে আসছেন, কিন্তু না! তিনি পুলিশের সঙ্গে মিলে আমার পা ধরে চ্যাংদোলা করে সিঁড়ি দিয়ে নামাতে শুরু করলেন।

পুলিশ আর সেই অদ্ভুত মানুষের পাল্লায় পড়ে আমি তখন দিশেহারা। পাহারাওয়ালা যখন হাঁক ছাড়ল যে সে শুধু আমার ঘাড় ধরেছে, কিন্তু আমার পা কারা ধরেছে সে জানে না—তখনই আমার রক্ত হিম হয়ে গেল! অর্থাৎ, যে দ্বিতীয় ব্যক্তিটি আমার পা ধরে টানছিল, তাকে অন্য কেউ দেখতেই পাচ্ছিল না। গোলদীঘির ভূতের রহস্য এভাবেই এক বীভৎস অভিজ্ঞতায় শেষ হলো আর আমি জ্ঞান হারালাম।