গোলাপী প্রেম
লেখক: আনন্দধারা
সঞ্চিতা তার মায়ের আলমারি খুলে শাড়ি দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে গেলো। কী যে করেনা তার মা! এবছরের পুজোর জন্য সব গাঢ় রঙের শাড়ি কিনেছে, সঞ্চিতা কতবার বললো একটু হালকা রঙের শাড়ি কেনো, ও একদিন পরে যাবে। নাহ লাল নীল সবুজের মেলা বসেছে। নিজের পুজোর বাজেট তো সব ড্রেস, জিন্স, টি শার্ট আর সাত জোড়া জুতো কিনে খরচ করে ফেলেছে। শাড়িটা তাই মায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। সঞ্চিতার একটু হালকা হালকা রঙ পছন্দ। সাদা, ঘিয়ে, হালকা হলুদ, হালকা গোলাপি, একটু অ্যাস্থেটিক, একটু মিনিমালিজম! আর তাছাড়া... রনজয়কেও ও দেখেছে.... হালকা রঙের শার্ট পরতে সে বেশি ভালোবাসে। রনজয়কে পছন্দ করার পর থেকে কবে থেকে যে তার পছন্দগুলোও সঞ্চিতার পছন্দ হয়ে গেলো... কেজানে।
— কী খুঁজছিস?
— শাড়ি! কীসব শাড়ি কিনেছো? বলেছিলাম একটা হালকা রঙের শাড়ি কিনবে। এত ডিপ ডিপ কালার। উফফ!
— শোন আমার ঐ বুড়িদের মত শাড়ি পরার বয়স আমার এখনও হয়নি বুঝলি। তোরও যে কি চয়েস! কম বয়সে রং পরবি, জীবনেও রং থাকবে বুঝলি!
— ধুর, ক্যাটক্যাট করে বড্ড! ওওওওও.. মাআআ! একটা শাড়ি কেনোনা! আরেকটা। সুন্দর তসর বা ধরো সাদা একটা জামদানি!
— বড়জোর একটা রানী গোলাপী রঙের শাড়ি, তোকে ওই রঙটা বেশ মানায়।
— ধুর! পরবোনা শাড়ি! যাও! একটু শখ করে শাড়ি পরতে চেয়েছিলাম!
— পরতে হবেনা যা। আগে তো সব রঙ পরতিস। এখন তোর মাথা খেয়েছে এইসব রিল আর ইনস্টাগ্রাম।
পায়ে ধুপ-ধাপ শব্দ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো সঞ্চিতা! রাগ হচ্ছে, মাকে বলাও যাবেনা মাথাটা রিলস খায়নি, খেয়েছে ওই ঝাঁকড়া চুল আর সিলভার ঘড়ি পরা শান্তুশিষ্ট খানিক গোমড়া মুখ বিশিষ্ট লোকটা!
...
— কী রে, দুপুর হলো! খাবিনা?
— একটা শাড়ি কেনো!
— এহ! খেতে হলে আয়, না খেতে হলে যা!
— কিনবে না তো?
— নিজের বাজেট শেষ করে আমার বাজেটের দিকে নজর কেনো দিস! নিজে পারলিনা একটা শাড়ি কিনতে?
— ধুর, শাড়ি কিনলে আমার উইশলিস্ট এর জামাগুলোর কী হতো?
— তাহলে ভোগ! আলু পোস্ত বানিয়েছি!
বালিশ থেকে মুখ তুলে তাকালো সঞ্চিতা। এতক্ষণ বিছানায় উপুড় হয়ে বালিশে মুখ ডুবিয়ে শুয়েছিল। আলু পোস্ত ব্যাপারটা ঠিক বাদ যাবে এটা মেনে নেওয়া কঠিন, কিন্তু শাড়িটাও চাই, মাকে পটাতে পারলেই হলো! বাবা তো না বলবেইনা।
— আলু পোস্ত না শাড়ি ভেবে নিয়ে নীচে চলে আসিস!
মা চলে যেতে সঞ্চিতা তড়াক করে নেমে এলো। আলু পোস্ত আর শাড়ি দুটোই চাই ওর। রণজয়ের সঙ্গে প্রেম করার সময়েও একই মনোভাব ছিল ওর। রনজয় ওর মেডিকেল কলেজের এক বছরের সিনিয়র। সেকেন্ড ইয়ারে প্রপোজ করার পর রণজয় গম্ভীর গলায় বলে উঠেছিল,
— পড়াশোনায় মন দে। এই বছরগুলো ফিরে আসবেনা। অন্যকিছুতে মাথা দিসনা।
রেগে মেগে সেদিনই হোস্টেলে এসে সঞ্চিতা পড়তে বসে। তবে ওইটুকুই, ফিল্মি কায়দায় ওকে college top করতে হয়নি। রনজয় এর সঙ্গে প্রেমটা হঠাৎ করেই হয়ে গেলো। তবে ওই সময় পড়াশোনাটা বেশ মন দিয়েই করেছিল সে। নইলে তো মেডিক্যাল কলেজের পড়াশোনা নিয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছিল ও। অবশ্য, এতে রনজয়কে মেন্টর হিসেবে একটু ক্রেডিট দিতে হয়!
...
— তাহলে পোস্ত!
এক লোকমা আলু পোস্ত মুখে তুলে চেবাতে চেবাতে সঞ্চিতা বলে উঠলো,
— উহু! শাড়ি আর পোস্ত, দুটোই চাই! তুমি না মা!
— গোলাপী শাড়ি আছে তো। ওটা আমি তোর কথা ভেবেই কিনেছি!
— না একটা সাদা শাড়ি!
— গোলাপীটা পর, যার জন্য পরছিস, সে যদি পছন্দ না করে তাহলে বুঝতে পারবো ও আমার জামাই হওয়ার যোগ্য নয়!
— এক্সকিউজ মী!
বিষম খেয়ে উঠলো সঞ্চিতা। সঞ্চিতা কি টেবিলের তলায় লুকোবে? নাকি খাওয়া ছেড়ে উঠে যাবে। মা জানে?
— না রে; মা জানেনা! তুই যা কিছু ভাবছিস বাদ দে! আমি জানিনা, তবে ওই আর কি আমিও রিলস ঘাটি! দেখলাম একটা পেজ পোস্ট করেছে, যদি দেখেন মেয়ে হঠাৎ করে শাড়ি পরার বায়না করছে, বুঝবেন মেয়ে প্রেমে পড়েছে!
— ইনস্টাগ্রাম তোমার মাথা খাচ্ছে।
— আমাদের মাথা খাচ্ছে। পোস্ত খা, আর গোলাপী শাড়িটা পরে বেরিয়ে যা!
**
প্যান্ডেলে বসে আছে সঞ্চিতা, মাথাটা গরম হয়ে আছে! সেই গোলাপী শাড়ি উফফ। খুব রাগ হচ্ছে, কত প্ল্যান ছিল! ভেবেছিলো বলবে, তোমার হালকা রং পছন্দ তাই। সবসময় না হোক , একদিন তো মনের মানুষের মতো সাজাই যায়! গেলো! সব গেলো!
— কীরে এত ইরিটেড লাগছে কেনো?
— কিছুনা।
— আচ্ছা!
মাথাটা আরোই জ্বলে উঠলো সঞ্চিতার!
— আচ্ছা মানে কী? দুবার জিজ্ঞেস করতে নেই। ডাক্তার তো তুমি! জানো না মানুষ সহজে সমস্যার কথা বলেনা!
— আমি তো...
— বিরক্তিকর সব বিরক্তিকর!
— শাড়িটা পরে ভালো লাগছে!
চমকে উঠলো সঞ্চিতা।
— এই ক্যাটকেটে রঙটা ভালো লাগছে? মা জোর করে পরালো!
— ক্যাটকেটে? ভালোই তো। রঙের আবার ভালো মন্দ কী?
— তো তুমি কেনো সবসময় হালকা রং পরো?
— কালো নীলও তো পরি! দেখোনি?
— সে ঠিক আছে কিন্তু বেশিরভাগ সময় তো..
— ছেলেদের কী সেই সুযোগ আছে? এই যে মা দুর্গার এত গায়ে গয়না, রকমারি শাড়ি, আমি যদি পরে বেরোই গয়না তাহলে সেটা সবার হাসির কারণ হবেনা?
— ধুর কী যে হচ্ছে। লাইফটাই বোরিং। আমার লাইফের এই প্লটটাও ঠিক করে এগোচ্ছেনা! আমি কত কিছু প্ল্যান করেছিলাম, এরকম হবে, সেরকম হবে, কিছুই হয়না।
রণজয় খানিক হেসে বললো,
— কী হয়না? প্রেম হয়না? শাড়ি পরা হয়না? পুজো দেখা হয়না? সবই তো হয়!
— কিন্তু যেমন চাই তেমন হয়না!
— কিন্তু এই যে রেগে মেগে যেটুকু হচ্ছে সেটুকুর দিকে খেয়াল করোনা?
— কই করিনা?
— তোমার পছন্দের রং পরেছি আজ, ওই যে বলো ল্যাভেন্ডার কালার।
সঞ্চিতার এতক্ষণ পরে হুঁশ ফিরলো, আমতা আমতা করে বলে উঠলো,
— আমিও ভেবেছিলাম তোমার প্রিয় রঙ পরে আসবো।
— তোমাকে কে বললো আমার প্রিয় রঙ এর মধ্যে গোলাপী নয়?
— গোলাপিও?
— কোনোটাই তো অপ্রিয় নয়, তুমি পরে আছো যে?
হেসে ফেললো সঞ্চিতা.. গম্ভীর মুখের রণজয় এর কাছ থেকে এহেন কমপ্লিমেন্ট পেয়ে মনটা উড়ু উড়ু হয়ে উঠলো। পুজো শুধু প্রার্থনা নিয়ে আসেনা, কখনো নিয়ে আসে গোলাপী প্রেমও।