ঘরের পরিধি

বিয়ের পর মেহুলের এটাই প্রথম দুর্গাপূজা। ছোটবেলা থেকে দুর্গাপূজা মানেই মেহুলের কাছে ছিল চারটে দিনের ছুটি, নতুন জামা আর একদিন বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রতিমা দর্শন। বাকি দিনগুলো কেটে যেত বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড় আর আনন্দে। বাবা-মা দুজনেই চাকরিজীবী হওয়ায় ছোট থেকেই অনেকটা একাই বড় হয়েছে মেয়েটা। পুজোর দিনগুলোতেও বাড়িতে তেমন হৈচৈ হতো না। আত্মীয়-স্বজন বলতে বিশেষ কেউ ছিল না। তাই অল্প বয়সেই একা থাকার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তার। একমাত্র সন্তান হওয়ায় মেহুলের ছোট্ট পৃথিবীটা ছিল বাবা মা আর নিজের ঘরটুকুকে ঘিরেই। তাই বিয়ের পর যখন সে প্রশান্তদের বিশাল বনেদি বাড়িতে এসে উঠল, প্রথম কয়েকটা দিন তার কাছে সবকিছুই ছিল ভীষণ অচেনা।

সকাল হলেই কারও না কারও ডাক, রান্নাঘর থেকে বাসনের শব্দ, উঠোনে ছোটদের দৌড়ঝাঁপ, বড়দের গল্প-আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা—সব মিলিয়ে মাঝে মাঝে নিজের অস্তিত্বটাই যেন হারিয়ে ফেলত সে। এত মানুষ কীভাবে একসঙ্গে থাকে? এত মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন মানিয়ে নিতে নিতে কেউ ক্লান্ত হয়ে পড়ে না? এই প্রশ্নটাই বারবার ঘুরে বেড়াত মেহুলের মাথায়।

তার ওপর মেহুল আর প্রশান্তের বিয়েটা ছিল সম্পূর্ণ অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। প্রশান্ত খারাপ ছেলে নয়। বরং বিয়ের পর থেকেই মেহুলকে বোঝার চেষ্টা করেছে সবসময়। নতুন বাড়িতে এসে মেয়েটার মানিয়ে নিতে যে বেশ সমস্যা হচ্ছে, সেটা সে বুঝতে পেরেছিল। মেহুল যখনই এত মানুষের মধ্যে হাঁপিয়ে উঠত, প্রশান্ত কিছু না বলে তার পাশে এসে বসত। এত প্রশ্নের ভিড়ে মেহুল চুপ করে গেলে আস্তে করে জিজ্ঞেস করত,

— খারাপ লাগছে?

메হুল প্রতিবারই মাথা নেড়ে বলত,

— না তো।

কিন্তু প্রশান্ত জানত, ওই ছোট্ট ‘না’-এর মধ্যে অনেকটা ‘হ্যাঁ’ লুকিয়ে আছে।

বিয়ের পর মেহুল সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটার মুখোমুখি হয়েছিল, সেটা ছিল নিজের মতো করে একটু সময় কাটানোর অভাব। প্রশান্তই ছিল তার কাছে অচেনা একজন মানুষ, যার সঙ্গে হঠাৎ করে তাকে একই ঘর ভাগ করে নিতে হয়েছে। তার ওপর প্রশান্তের বাড়ির এত মানুষ, যারা যখন তখন ঘরে ঢুকে পড়ে গল্প করার জন্য। চিরকাল একা থাকতে অভ্যস্ত মেহুল এত কোলাহলের মধ্যে মাঝে মাঝে দমবন্ধ অনুভব করত। একদিন রাগের মাথায় নিজের বাবা মাকে ফোন করে বলেই ফেলেছিল,

— তোমরা আমাকে এত বড় একটা পরিবারে বিয়ে দিলে কেন বলো তো? তোমরা তো জানতেই আমি এত মানুষজনের মধ্যে থাকতে পারি না। আমি আর থাকতে পারছি না এভাবে!

ফোনের ওপাশে মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শুধু বলেছিলেন,

— সময় লাগবে মা। একদিন বুঝবি।

সেদিন মেহুল বুঝতে পারেনি। বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে দিয়েছিল। কিন্তু মায়ের বলা সেই ‘একদিন’টা এসেছিল ঠিক তিন মাস পর—দুর্গাপূজার সময়। মহালয়ার পর থেকেই মেহুলের অনুভূতিগুলো কেমন যেন বদলাতে শুরু করেছিল।

ষষ্ঠীর সকালে নতুন শাড়ি পরে ঠাকুরদালানে এসে দাঁড়াতেই কাকিশাশুড়ি এসে বললেন,

— মেহুল, দালানে মেয়েগুলো ফুল দিয়ে মালা গাঁথছে। যা তো মা, ওদের একটু সাহায্য করে দে।

মেহুল একটু অবাক হয়ে বলল,

— আমি?

— হ্যাঁ, তুই! কেন? তুই কি এই বাড়ির মেয়ে নয়? তুইও তো এখন এই বাড়ির মেয়ে।

‘এই বাড়ির মেয়ে।’ কথাটা খুব সাধারণ। তবুও কোথাও যেন মেহুলের বুকের মধ্যে নরম একটা আলো জ্বলে উঠল।

সপ্তমীর সকালে রান্নাঘরে ঢুকে মেহুল দেখল, সবাই মিলে ভোগ রান্না করছে। কেউ নারকেল কুরোচ্ছে, কেউ লুচি বেলছে, কেউ সুজি বানাচ্ছে। চারপাশে হাসি-ঠাট্টা, গল্প আর আনন্দে রান্নাঘরটা যেন উৎসবের থেকেও বেশি উৎসবমুখর। মেহুল চুপচাপ একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবাইকে দেখছিল। হঠাৎ বড় জা এসে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন।

— এই যে, এত দূরে দাঁড়িয়ে কী দেখছিস? আয়, আমাদের সঙ্গে বস।

তারপর আর তাকে ছাড়ার নামই নেই। কেউ তাকে নিয়ে গল্প করছে, কেউ শাড়ির প্রশংসা করছে, কেউ আবার নতুন বউ বলে মজা করছে। অদ্ভুতভাবে, আজ আর কিছুই বিরক্তিকর লাগছিল না। এতদিন যাদের এড়িয়ে চলেছে, আজ তাদের সঙ্গেই নিজের অজান্তে হাসতে শুরু করল মেহুল।

অষ্টমীর সকালে বাড়ির সবাই একসঙ্গে অঞ্জলি দিল। ছোটরা দালান জুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, বাড়ির ছেলেরা নিজেদের মধ্যে ইয়ার্কি-ফাজলামি করছে। বাইরে থেকে আসা আত্মীয়-পরিজনেরাও মেহুলকে ঘিরে গল্পে মেতে উঠেছে। আজ আর সেই আসর থেকে উঠে চলে যেতে ইচ্ছে করল না তার। বরং মনে হচ্ছিল, এই শব্দগুলো থেমে গেলে যেন বাড়িটাই হঠাৎ একটু ফাঁকা হয়ে যাবে। প্রশান্ত মেহুলকে খুঁজতে খুঁজতে এসে তার পাশে বসতেই ছোটদের টিটকারি শুরু হলো। মেহুলের ফরসা গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। প্রশান্ত মুচকি হেসে আস্তে করে বলল,

— এখনও মনে হচ্ছে খুব বড় পরিবার?

মেহুলও হেসে বলল,

— হ্যাঁ।

প্রশান্ত একটু অবাক হয়ে তাকাতেই মেহুল ধীরে ধীরে বলল,

— তবে এখন আর অস্বস্তি হয় না আগের মতো। বরং… ভালো লাগে।

প্রশান্ত কিছু বলল না শুধু মেহুলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। কথাটা শুনে তার বুকের ভেতরেও যেন এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এল।

নবমীর রাতে ঠাকুরদালানে সবাই মিলে বসেছিল। কেউ গান গাইছে, কেউ গল্প করছে, কেউ পুরোনো দিনের কথা বলছে। ছোটরা দৌড়াদৌড়ি করছে। হাসি-ঠাট্টায় গোটা বাড়িটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মেহুল একটু দূরে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যটা দেখছিল। হঠাৎ তার মনে পড়ল নিজের ছোট্ট বাড়িটার কথা। মা বাবার কথা। নিজের ঘরটার কথা। মায়ের বলা সেই কথাটাও মনে পড়ল,

— একদিন বুঝবি।

হঠাৎ বুকের ভেতর জমে থাকা এতদিনের অভিমানটা কেমন যেন গলে গেল। সেদিন মেহুল বুঝল, বাবা মা তাকে তার ছোট্ট পৃথিবী থেকে ছিনিয়ে নেননি। তারা বরং তার পৃথিবীটাকে আরও বড় করে দিয়েছেন। যেখানে তার নিজের মানুষ শুধু দুজন নয়— অনেকজন।

দশমীর সকালে সিঁদুরখেলা শেষ হওয়ার পর মেহুল যখন দুর্গামায়ের পায়ের সামনে এসে বসল, অকারণেই তার চোখ দুটো ভিজে উঠল। প্রশান্ত এসে নিঃশব্দে তার পাশে বসল। মেহুলের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আস্তে করে বলল,

— কী হলো?

মেহুল মৃদু হেসে বলল,

— জানো, মা বাবার ওপর খুব রাগ করেছিলাম।
— কেন?
— ভাবতাম, এত বড় সংসারের এই অথৈ সাগরে আমাকে একা ফেলে দিয়েছে।

প্রশান্ত একটু হেসে জিজ্ঞেস করল,

— এখনও রাগ হয়?

মেহুল এবার কোনো উত্তর দিল না। শুধু প্রশান্তের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে তার কাঁধে মাথা রাখল। কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে করে বলল,

— না। এখন মনে হয়… ওরা ঠিকই করেছিল।

প্রশান্ত মৃদু হেসে তার দিকে তাকাল। মেহুল চোখ মুছে আবার বলল,

— ছোট থেকে একা একা বড় হয়েছি তো। তাই ভাবতাম, আমার ঘর মানেই আমার ছোট্ট ঘরটা। আমার পৃথিবী মানেই বাবা-মা আর আমি।

একটু থেমে চারপাশের মানুষগুলোর দিকে তাকাল সে। কেউ তখন মিষ্টি বিলোচ্ছে, কেউ মাকে প্রণাম করছে, কেউ আবার ছোটদের সামলাতে ব্যস্ত। মেহুলের ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

— কিন্তু এই কয়েকটা দিনে বুঝলাম, ঘর আসলে একটা জায়গার নাম নয়। ঘর মানে এমন কিছু মানুষ… যাদের কাছে ফিরে এলে নিজের অজান্তেই মনটা শান্ত হয়ে যায়।

প্রশান্ত চুপ করে শুনছিল। মেহুল এবার তার হাতটা আলতো করে নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বলল,

— এই পরিবারের প্রতিটা মানুষ যেভাবে আমাকে আপন করে নিয়েছে, আমার ভুলগুলোকে ক্ষমা করেছে, আমাকে সময় দিয়েছে, মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছে… কখন যে এই বাড়িটা আমার অচেনা বাড়ি থেকে নিজের বাড়ি হয়ে গেল, আমি নিজেই বুঝতে পারিনি।

একটু হেসে মেহুল বলল,

— আগে ভাবতাম, আমি একাই আমার পৃথিবী।

তারপর প্রশান্তের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে বলল,

— এখন মনে হয়, my পৃথিবীটা অনেক বড়।

প্রশান্ত মৃদু হেসে বলল,

— আর সেই পৃথিবীর মধ্যে আমি আছি তো?

মেহুল লাজুক হেসে মাথা নাড়ল।
— শুধু আছো না… এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভরসার মানুষটাও তুমি।

প্রশান্ত কিছু বলতে পারল না। শুধু মেহুলের হাতটা শক্ত করে ধরে রইল। সামনে তখন দেবী বিসর্জনের প্রস্তুতি চলছে। ঢাকের শব্দে চারপাশ মুখরিত। মেহুল একবার ঠাকুরদালানের দিকে তাকাল, তারপর নিজের নতুন পরিবারের দিকে। মনে হলো, মা দুর্গা যেন শুধু বিদায় নিতে আসেননি। এই বাড়ির ভালোবাসার মানুষগুলোর মধ্যে তার জন্যও একটা জায়গা তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছেন। আর সেই মুহূর্তে মেহুল বুঝল—

বিয়ের পর এটাই তার প্রথম পূজো। কিন্তু এই পূজোতেই সে প্রথমবার বুঝতে পেরেছে— একটা মেয়ে যখন নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে আসে, তখন সে সবসময় নিজের ঘর হারায় না। কখনও কখনও সে তার ঘরের পরিধিটা আরও একটু বড় করে ফেলে। আর মেহুলের সেই বড় হয়ে যাওয়া ঘরের নাম — পরিবার।