এক অদ্ভুত পুনরাবিষ্কার
গত সপ্তাহের একটা সাধারণ দুপুর। কলকাতার একটা চেনা রেস্টুরেন্টে কলিগদের সাথে লাঞ্চ করতে গিয়েছিলেন লেখিকা পল্লবী। হইচই, চামচ-কাঁটার আওয়াজ আর খাবারের সুবাসের মাঝেই হঠাৎ উল্টোদিকের একটা টেবিলের দিকে তাঁর চোখ আটকে গেল। সেখানে বসে আছে প্রায় তিরিশ বছর বয়সী এক তরুণী, বন্ধুদের এক বড় গ্রুপের মাঝে। সে প্রাণখুলে হাসছে, আড্ডায় মেতে আছে। প্রথম দেখায় পল্লবী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না— এ যে সংযুক্তা!
ছয় বছর আগে সংযুক্তা ছিল পল্লবীর অফিসের জুনিয়র কলিগ। সেই সময়ে তাদের সম্পর্কটা বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু তখনকার সংযুক্তা আর আজকের এই সংযুক্তার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। আগের সংযুক্তা ছিল ভীষণ চুপচাপ, গুটিয়ে থাকা এক মেয়ে। অফিস কলিগরা কোনো প্ল্যান বা আউটিং করলে সে বারবার এড়িয়ে যেত, বলতো, "এসব আমার ভালো লাগে না।" কখনো তাকে বন্ধুদের সাথে এভাবে আড্ডা দিতে দেখা যায়নি। তাই আজকের এই প্রাণোচ্ছ্বল সংযুক্তাকে দেখে পল্লবী ভীষণ অবাক হলেন।
খানিকটা সময় পর সংযুক্তার চোখ পড়ল পল্লবীর ওপর। পুরোনো দিদিকে দেখে মুখে চওড়া হাসি নিয়ে সে এগিয়ে এলো পল্লবীর টেবিলের কাছে। এবার পল্লবীর অবাক হওয়ার পালা আরও বাড়ল। সংযুক্তার পরনে ছিল জিন্সের প্যান্ট আর একটি আধুনিক ডিজাইনার টপ। অথচ পুরোনো দিনে সে সবসময় কুর্তি বা সালোয়ার কামিজ পরত। অন্য কিছু পরার কথা বললে সে কোনোভাবেই রাজি হতো না। সৌজন্য বিনিময়ের পর পল্লবী বলেই ফেললেন, "তুই অনেক বদলে গেছিস। বেশ ভালো লাগছে এখন। কেমন যেন সিঁটিয়ে থাকতিস সব সময়।" সংযুক্তা শুধু মিষ্টি করে হেসে ঘাড় দুলিয়ে বলল, "এখন যাই গো, বন্ধুরা ওয়েট করছে। পরে তোমায় ফোন করব।"
বিষাক্ত সম্পর্কের আড়ালে থাকা সত্য
পরের দিন সংযুক্তা সত্যিই ফোন করল। সাধারণ কিছু কথার পর পল্লবী আর কৌতুহল চেপে রাখতে পারলেন না। জিজ্ঞেস করলেন, "বিতান কেমন আছে? কবে বিয়ে করছিস তোরা?"
ফোনের ওপার থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস আর চাপা স্বরে উত্তর এলো, "বিতান আমার জীবনে আর নেই দিদি। দু বছর হল আমরা আলাদা হয়ে গেছি।"
পল্লবী আঁতকে উঠলেন। দীর্ঘদিনের একটা সম্পর্ক, যা নিয়ে সংযুক্তা একসময় ভীষণ সিরিয়াস ছিল, তা এভাবে ভেঙে গেল? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "কেন ব্রেক আপ করল বিতান?"
সংযুক্তার উত্তর ছিল স্পষ্ট এবং দৃঢ়: "ও নয়, আমিই আর ওর সাথে এগোতে চাইলাম না সম্পর্কটা নিয়ে।"
এরপর সংযুক্তা একে একে খুলে ধরল তার জীবনের সেই অন্ধকার দিনগুলোর কথা, যা সে এতদিন ভালোবাসার নামে সহ্য করে এসেছে। বাইরে থেকে সম্পর্কটা ঠিক মনে হলেও, সেখানে কোনো প্রকৃত ভালোবাসা বা সম্মান ছিল না। বিতানের প্রতিটা মতামত, প্রতিটা হুকুম সংযুক্তাকে মুখ বুজে মেনে চলতে হতো:
- পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা: বিতানের মডার্ন ড্রেস পছন্দ ছিল না, তাই সংযুক্তা চাইলেও নিজের পছন্দের পোশাক পরতে পারত না।
- সামাজিক জীবনে বাধা: ছেলেরা আছে এমন কোনো বন্ধুদের গ্রুপ বা কলিগদের আউটিংয়ে সংযুক্তার যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল।
অথচ বিতানের নিজের বেলায় কোনো নিয়ম ছিল না। সে রাত অবধি পাবে বসে ড্রিংক করতে পারত, হাজার গন্ডা মেয়ে বান্ধবী নিয়ে আউটিংয়ে যেতে পারত। আর সংযুক্তা যদি এই বৈষম্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন করত, তবে তার কপালে জুটত কেবল অপমান আর গালিগালাজ।
পুরুষতান্ত্রিক অহংকার ও আত্মসম্মানের আপোষ
বিতানের ছিল তীব্র মেল ইগো (Male Ego)। কথায় কথায় রাগ দেখানো, যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া এবং পান থেকে চুন খসলেই সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া ছিল তার নিত্যদিনের স্বভাব। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভুল বিতানের হলেও প্রতিবার সংযুক্তাকেই গিয়ে 'সরি' বলে পরিস্থিতি মেটাতে হতো। কারণ একটাই— বিতান রেগে থাকলে বা কষ্ট পেলে সংযুক্তার নিজের খারাপ লাগত। ভালোবাসার মোহে সে নিজের আত্মসম্মানকে বিসর্জন দিয়েছিল।
কিন্তু দিনের পর দিন এভাবে চলতে চলতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তার মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে— যে সম্পর্কে একজনের মর্জিমতো অন্যজনকে চলতে হয়, যেখানে রোজ নিজেকে প্রমাণ করতে হয় এবং আত্মসম্মানের সাথে আপোষ করতে হয়, সেটা কি আদৌ ভালোবাসা? যেখানে কোনো সহমর্মিতা, বিশ্বাস বা সম্মান নেই, সেই সম্পর্ক সারাজীবন টিকিয়ে রাখার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।
মুক্তির এক নতুন সকাল
অনেকেই সংযুক্তাকে বলেছিল, এতদিনকার সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে সে ভুল করেছে। কিন্তু সংযুক্তা মনে করে, কোনো সম্পর্ক কেবল "বহুদিনের" বলেই তাকে জোর করে টেনে নিয়ে যেতে হবে— এর কোনো মানে হয় না। বিচ্ছেদের সাময়িক কষ্টটুকু এড়ানোর জন্য সারাজীবনের যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানোটা অনেক বড় ভুল।
আজ সংযুক্তা মুক্ত। এখন সে নিজের ইচ্ছেমতো চলতে পারে, নিজের পছন্দের পোশাক পরতে পারে। কথায় কথায় এখন আর কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না, নিজেকে প্রমাণ করতে হয় না, আর ভয়ে ভয়ে ভালোবাসার ভিক্ষাও চাইতে হয় না। সে এখন সত্যিই অনেক ভালো আছে, যা তার মুখের ওই বাঁধভাঙা হাসিটাই প্রমাণ করে দিচ্ছিল।
পল্লবীর কলমে এক সামাজিক বার্তা
সংযুক্তার মুখের এই গল্প পল্লবী সেনগুপ্তকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। আমাদের চারপাশে এমন কত মেয়ে প্রতিদিন ভালোবাসার দোহাই দিয়ে, সমাজের ভয়ে নিজের ভালো থাকা আর আত্মসম্মানকে স্যাক্রিফাইস করে দেয়। সম্পর্ক হয়তো টিকে যায়, কিন্তু তাদের মনের ভেতরের মানুষটা মরে যায়।
পল্লবী তাঁর "ভাবিয়ে দিল" সিরিজের এই পোস্টে সমাজের সকল নারীর জন্য প্রার্থনা করেছেন, যেন ঈশ্বরের আশীর্বাদে প্রতিটি মেয়ের মনের জোর সংযুক্তার মতো শক্ত হয়। তবেই হয়তো একদিন আমাদের চারপাশের সব "খারাপ থাকা" মেয়েরা নিজেদের অধিকার ফিরে পাবে এবং জীবনের লড়াইয়ে সত্যি সত্যি জিতে যাবে।
সংগৃহীত