ধূলো জমা ভালোবাসা

বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। এটা সেই বিকেলের বৃষ্টি নয়, যেটা জানলার পাশে বসে কবিতা পড়তে ইচ্ছে করে। এই বৃষ্টি ক্লান্ত, টিনের ছাদে পড়ে যেন পুরোনো হিসেব মেলাচ্ছে। হঠাৎই আলোটা নিভে গেল। ফ্যান থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরটা কেমন অচেনা নিস্তব্ধতায় ভরে উঠল। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা জিরে ফোড়নের গন্ধটা আরও স্পষ্ট লাগল। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে। বারান্দার গ্রিলে জল পড়ে টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। মধুমিতা হাতড়ে মোমবাতিটা খুঁজছিল।

অরিন্দম মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে বলল,

"ডানদিকের ড্রয়ারে আছে।"

কথাটা খুব সাধারণ। অথচ তাদের মধ্যে আজকাল কথাগুলো সবই এরকম।

"চিনি শেষ।"

"কাল বিলটা জমা দিও।"

"মায়ের ওষুধটা এনেছ?"

"গ্যাস বুক করো।"

দশ বছরের সংসার মানুষকে কেমন ছোট ছোট প্রয়োজনের মধ্যে আটকে ফেলে। ভালোবাসা তখন আর সিনেমার মতো থাকে না। থাকে না সেই প্রথম দেখার কাঁপনি, সেই চিঠি লেখার রাত, সেই একটু হাত ছোঁয়ার জন্য বুকের ভেতর যে ঝড় ওঠা অনুভূতি। সব কিছু ধীরে ধীরে কমে আসে। এতটাই ধীরে যে মানুষ গুলোও টের পায় না। রান্নাঘরের ধোঁয়া, ইএমআই, বাজারের ব্যাগ আর মাসের শেষে বেঁচে থাকা টাকার মধ্যে কোথাও গিয়ে ভালোবাসা চুপ করে বসে থাকে। সে আর কথা বলে না। শুধু থাকে অভ্যাসের মতো, শ্বাসের মতো, এমন কিছুর মতো যেটা না থাকলে টের পাওয়া যাবে, কিন্তু থাকতে থাকতে ভুলে যাওয়া যায়।

মোমবাতিটা জ্বলে উঠতেই ঘরটা হলুদ হয়ে যায়। সেই হলুদ আলোয় মধুমিতার মুখটা দেখা যায়। দশ বছরের চেনা মুখ। অথচ এই মুহূর্তে কেন জানি মনে হয় এই মুখটা সে অনেকদিন ঠিক মতো দেখেনি। দেখলেও দেখেনি। চোখ রেখেছে, কিন্তু দৃষ্টি দেয়নি। এই এতদিনে অরিন্দমের খেয়াল হয় সে কতদিন "মধু" বলে সম্বোধনও করে না।

সে কিছু বলে না। মোমবাতির শিখাটা একটু কাঁপে, জানালার ফাঁক দিয়ে হয়তো বাতাস এসেছে তারপর স্থির হয়ে যায়। ঘরের ছায়াগুলো দুলতে দুলতে থামে। এইটুকুই। এই নীরবতাটুকুই হয়তো দশ বছরের সংসার।

বেশ কিছুক্ষণর নীরবতা ভেঙে অরিন্দম হালকা হেসে বলল,

"মনে আছে? বিয়ের পর প্রথম যে বাড়িটায় ছিলাম, সেখানেও রোজ কারেন্ট যেত।"

মধুমিতা একটু থামল। তারপর খুব আস্তে হাসল।

"আর তুমি হাতপাখা নাড়তে নাড়তে নিজেই ঘুমিয়ে পড়তে।"

অরিন্দমও হেসে ফেলল। অনেকদিন পরে তারা একই স্মৃতিতে একসঙ্গে হাসল। বাইরে বজ্রপাত হল। এক মুহূর্তের জন্য জানলার কাঁচ সাদা হয়ে উঠল। তারপর আবার অন্ধকার। মধুমিতা রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে এল। মোমবাতির আলোয় ধোঁয়াটা সরু নদীর মতো উঠছিল।

অরিন্দম কাপটা হাতে নিয়ে বলল,

"এই কাপটা এখনও আছে?"

"ফেলে দিইনি।"

"হ্যান্ডেলটা তো ভাঙা।"

"সব ভাঙা জিনিস ফেলে দিতে নেই।"

কথাটা বলে মধুমিতা নিজেই চুপ করে গেল। অরিন্দম তাকিয়ে রইল ওর দিকে। এই মুখটাই তো একদিন দেখে ওর মনে হয়েছিল, এই মানুষটার সঙ্গেই বুড়ো হতে চায়। তারপর কবে যেন বুড়ো হওয়ার তাড়াহুড়োয় মানুষটাকেই দেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

দূরে কোথাও ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

"তোমার মনে আছে কলেজের সামনে বৃষ্টিতে আটকে পড়ার দিনটা?" অরিন্দম জিজ্ঞেস করল।

মধুমিতা হেসে মাথা নাড়ল।

"একটা ছোট ছাতা ছিল। তোমার অর্ধেক কাঁধ ভিজে গিয়েছিল।"

"ইচ্ছে করেই ভিজিয়েছিলাম।"

"জানি।"

এই ‘জানি’ শব্দটার মধ্যে কত বছর জমে ছিল। ঘরটা ধীরে ধীরে আরও স্নিগ্ধ হয়ে আসছিল। যেন অন্ধকার তাদের মধ্যে জমে থাকা অস্বস্তিগুলো ঢেকে দিচ্ছে।

মধুমিতা হঠাৎ বলল,

"তুমি গান গাইতে আগে!"

অরিন্দম একটু লজ্জা পেল।

"এখন গাইলে পাশের ফ্ল্যাট পুলিশ ডাকবে।"

"তবু গাও না।"

অনেকদিন পরে বেশ অপটু কণ্ঠে অরিন্দম খুব আস্তে গাইল,

"এই পথ যদি না শেষ হয়,
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?
যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়
তবে কেমন হতো তুমি বলো তো।।..."

গলার সুর ভেঙে যাচ্ছিল। তবু মধুমিতার মনে হচ্ছিল, এই ভাঙা সুরটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস।

কিছুক্ষণ পরে মধুমিতা বলল,

"তুমি জানো, আমি একসময় চাকরিটা ছাড়তে চাইনি।"

অরিন্দম চুপ করে শুনছিল।

"ঋদ্ধির পরে সবকিছু এত তাড়াতাড়ি বদলে গেল... মনে হত আমি শুধু কারও মা হয়ে গেছি। আমি কোথায় গেলাম, সেটা কেউ খেয়ালই করল না।"

বৃষ্টির শব্দটা হঠাৎ যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।

অরিন্দম খুব ধীরে বলল,

"আমি খেয়াল করেছিলাম। শুধু বলতে পারিনি।"

মধুমিতা তাকাল।

"তুমিও তো বদলে গিয়েছিলে।"

"ভয় পেতাম।"

"কীসের?"

"ঠিকমতো সংসার চালাতে না পারার। বাবা যেমন ছিলেন, তেমন হয়ে যাওয়ার। তোমাদের কিছু কম পড়ে যাবে ভেবে।"

মধুমিতা চুপ করে রইল। তারপর আস্তে বলল,

"আমাদের সবচেয়ে বেশি কী কম পড়েছিল জানো?"

"কী?"

"আমরা।"

শব্দটা মোমবাতির শিখার মতো কেঁপে উঠল। দশ বছরের ক্লান্তি, না বলা অভিমান, ঘুম না হওয়া রাত, স্কুলের ফি, হাসপাতালের করিডর, পুড়ে যাওয়া রুটি, হঠাৎ হঠাৎ চুপ করে যাওয়া দুপুর, সব যেন সেই এক শব্দের মধ্যে এসে দাঁড়াল।

অরিন্দম হাত বাড়িয়ে কাপটা নামিয়ে রাখল। তারপর অনেক দ্বিধা নিয়ে মধুমিতার হাত ছুঁলো। অদ্ভুত ব্যাপার, এত বছরের সংসারের পরেও স্পর্শটা নতুন লাগছিল।

বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তার আলো নিভে আছে। পাশের বাড়ির বারান্দা অন্ধকার। পৃথিবীটা যেন একটু ধীরে চলছে।

মধুমিতা খুব আস্তে বলল,

"জানো, আমি এখনও তোমার জন্য অপেক্ষা করি।"

"কখন?"

"রাতে। তুমি অফিস থেকে ফিরলে দরজার শব্দটা শুনে এখনও মনে হয়, কেউ আমার কাছেই ফিরছে।"

অরিন্দমের গলায় কিছু আটকে গেল। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা কখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। শুধু ধূলো জমে যায়। ঠিক পুরোনো অ্যালবামের মতো। একদিন হঠাৎ আলো চলে গেলে, সময় থেমে গেলে, মানুষ আবার ধূলো সরিয়ে ছবিগুলো দেখতে বসে।

হঠাৎ বিদ্যুৎ ফিরে এল। ফ্যান ঘুরতে শুরু করল। টিউবলাইটের সাদা আলোয় ঘরটা আবার সাধারণ হয়ে গেল। সেই একই সোফা, একই দেয়াল, একই সংসার। তবু কিছু একটা বদলে গেছে হয়তো।

অরিন্দম উঠে গিয়ে বারান্দার দরজাটা খুলল। ঠান্ডা হাওয়া ভেতরে ঢুকে এল।

পেছন থেকে মধুমিতা বলল,

"কাল সকালে চা খেতে ছাদে যাবে?"

অরিন্দম ফিরে তাকাল। অনেকদিন পরে প্রশ্নটার মধ্যে সাংসারিক ভাব ছিল না। ছিল শুধু একটু একসঙ্গে থাকার আকাঙ্ক্ষা।


সংগৃহীত