চিকিৎসা ব্যবস্থার অসংবেদনশীলতা: এক মায়ের কোল খালি হওয়া এবং বেঁচে ফেরার লড়াই
বিশেষ প্রতিবেদন
ঢাকা: একটি হাসপাতালের দরজা বন্ধ থাকবে নাকি খোলা, তা নিয়ে সমাজ বা প্রশাসনের হাজারো বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যখন কোনো চিকিৎসা কেন্দ্রে ন্যূনতম মানবিকতা, সচেতনতা এবং দায়িত্ববোধের অভাব ঘটে, তখন তার দায় কার? এমনই এক নির্মম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন নাজনীন নামে এক মা। আজ বহু বছর পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসা ব্যবস্থার সেই চরম অসংবেদনশীলতা আর নিয়মহীনতার ক্ষত তাঁর মনে দগদগে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং একটি স্বপ্নের শুরু
২০০৮ সালের ঘটনা। মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় নাজনীনকে পাড়ি দিতে হয়েছিল এক দীর্ঘ এবং কঠিন পথ। দেশ-বিদেশে নানা চিকিৎসার পর, অবশেষে দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালে অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি প্রথমবার গর্ভধারণ বা কনসিভ করতে সক্ষম হন। সেই অনাগত সন্তানকে ঘিরে দম্পতির মনে জমা হয়েছিল কত আশা, কত প্রার্থনা আর সীমাহীন ভালোবাসা।
গর্ভেই মৃত্যু এবং হাসপাতালের নির্মমতা
টানা নয়টি মাস পরম যত্নে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন নাজনীন। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে, প্রসবের ঠিক আগ মুহূর্তে গর্ভের ভেতরেই তাঁর ৯ মাসের সন্তানটি মারা যায়। সেই সময় তিনি ‘একলামসিয়া’ (Eclampsia) রোগে আক্রান্ত হয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক অবস্থায় আদদ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তীব্র খিঁচুনি এবং চরম শারীরিক ঝুঁকিতে থাকা একজন মুমূর্ষু মায়ের সামনে হাসপাতালের পক্ষ থেকে যে আচরণ করা হয়, তা কোনো সুস্থ চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিচয় দেয় না। নাজনীন তখনও জানতেন না যে তাঁর স্বপ্নের পৃথিবী তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে। সেই মুহূর্তে আদদ্বীন হাসপাতাল থেকে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে তাঁর মুখের ওপর সরাসরি বলে দেওয়া হয়, "মরা বাচ্চা নরমালি বের করবে, সিজার করবে না?"
অন্ধকার এবং জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ
একজন খিঁচুনির রোগীর সামনে তাঁর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সন্তানের মৃত্যুর খবর কতটা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তা অনুধাবন করার ন্যূনতম সচেতনতাও দেখায়নি hospital কর্তৃপক্ষ। এই চরম নিষ্ঠুর আঘাত সহ্য করতে না পেরে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন নাজনীন এবং সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারান।
এরপর তাঁর আর কিছুই মনে নেই। দীর্ঘ তিন দিন পর যখন তাঁর জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন ধানমণ্ডি সেন্ট্রাল হাসপাতালের আইসিইউ (ICU)-তে। তখন তাঁর রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার ছিল ২৫০/১৫০—যা এককথায় জীবন ও মৃত্যুর একেবারে শেষ সীমানা। সেখানে টানা তিন দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসেন তিনি।
এক অন্তহীন শূন্যতা
শারীরিক, মানসিক এবং আবেগগতভাবে সেই সময়টি ছিল নাজনীনের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। সন্তানকে হারানো তো বটেই, কিন্তু তাঁর আজীবন আফসোস—সেদিন যদি hospital কর্তৃপক্ষ তাঁর নাজুক শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে একটু সংবেদনশীলভাবে কথা বলতো, তবে হয়তো তিনি জ্ঞান হারাতেন না। হয়তো শেষবারের মতো নিজের মৃত সন্তানের মুখটি অন্তত একবার দেখার সুযোগ পেতেন।
"একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে বড় বেদনা আর কী হতে পারে? বহু প্রতীক্ষা, অসংখ্য স্বপ্ন আর সীমাহীন ভালোবাসার সেই প্রথম সন্তান আজও আমার জীবনের সবচেয়ে গভীর না-পাওয়ার গল্প হয়ে আছে।"
জवाबদিহিতার দাবি
কালক্রমে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু নাজনীনের হৃদয়ের সেই শূন্যতা আর ক্ষত আজও একই রকম রয়ে গেছে। এই ঘটনাটি কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং তা আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার এক বড় অবহেলার প্রতীক। নাজনীনের স্পষ্ট বক্তব্য, কোনো নির্দিষ্ট হাসপাতাল বন্ধ বা খোলা রাখা নিয়ে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত অবস্থান নেই, কিন্তু যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থায় এমন চরম অনিয়ম, অসচেতনতা এবং অমানবিকতা থাকে, সেখানে অবশ্যই প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন। আর কত মায়ের কোল খালি হলে তবেই চিকিৎসা সেবায় মানবিকতার ছোঁয়া লাগবে?
সংগৃহীত