সময়ের ক্যানভাসে একাকীত্বের গল্প

সময়ের ক্যানভাসে একাকীত্বের গল্প: বিনিময় যখন শুধু টাকার নয়, একাকীত্ব মোছার এক পশলা আন্তরিকতার।

"আপনিই বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন? আমি মহুয়া দত্ত।"

রিক্লাইনারে পা তুলে বসা, ধবধবে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত রোগা, লম্বা চেহারার বৃদ্ধের দিকে চোখ তুলে তাকাল মহুয়া। তার এই কাজটা ভীষণ দরকার ছিল। কিন্তু বিজ্ঞাপনে কাজের ধরণ নিয়ে কোনো স্পষ্ট উল্লেখ ছিল না। কৌতুহল আর কিছুটা সংকোচ নিয়ে মহুয়া জিজ্ঞেস করল, "বিজ্ঞাপনে ঠিক কী কাজ করতে হবে, তার উল্লেখ ছিল না। যদি বলেন আমায় কী করতে হবে?"

সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন। তাঁর বাঁধানো দাঁতের পাটিতে সামান্য শব্দ হলো। অত্যন্ত শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় তিনি বললেন, "তোমার মূল্যবান সময় থেকে খানিকটা সময় দিতে হবে। দিনের বেশ খানিকটা সময়। বিনিময়ে আমি তোমায় অর্থ দেব। সহজ কথায় বলতে গেলে, আমি তোমার সময় কিনব—গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি। বুঝলে কিছু?" বৃদ্ধ তাঁর একটি ভুরু ঈষৎ তেরছা করে কপালের দিকে তুললেন।

মহুয়া বেশ অবাক হলো। সময়ের বিনিময়ে টাকা? এমন চাকরির কথা সে কখনো শুনেনি বা ভাবেনি। সে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে জানতে চাইল, "আমায় ঠিক কী করতে হবে?"

বৃদ্ধ বুঝিয়ে বললেন, "বেশি কিছু নয়, সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন আমার সঙ্গে খানিকটা সময় কাটাতে হবে। আমি বললে বই পড়ে শোনাতে হবে, আর কিছু বললে সেটা টাইপ করে রাখতে হবে। আসলে বয়স বাড়ছে তো, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে। ইচ্ছে থাকলেও বেশিক্ষণ পড়তে পারি না, চোখ ব্যথা করে, কখনো সখনো জলও পড়ে। মাঝে মাঝে অবশ্য তোমার কাছে কফি খাওয়ার আবদারও করতে পারি—দুধ বেশি, চিনি ছাড়া। বাকি রান্নাবান্নার জন্য সুমতি আছে, দুবেলা আসে। রাজি থাকলে বলো।"

মহুয়া একমুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল, "আমি রাজি আছি। কিন্তু স্যালারি কত দেবেন? বিজ্ঞাপনে টাকার কোনো উল্লেখ ছিল না।"

"ইচ্ছে করেই দিইনি," বৃদ্ধের সোজাসাপটা উত্তর, "সামনাসামনি কথা হওয়াটা সবার আগে দরকার। তুমি সময় দেবে, আমি টাকা দেব—সঠিক লেনদেন হবে কি না যাচাই করতে হবে না? তুমি বারো হাজার পাবে। আর কোনো প্রশ্ন?"

ব্যক্তিগত সীমানা ও কঠিন শর্ত

মহুয়া কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসল, "এত বড় ফ্ল্যাটে আপনি একা থাকেন? ফ্যামিলি?"

এই প্রশ্নেই যেন বৃদ্ধের মেজাজ কিছুটা বদলে গেল। তিনি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং কঠোর স্বরে বললেন, "তুমি আসতে পারো। আমার ব্যক্তিগত জীবনের খবরাখবর দেব বলে তোমায় রাখছি না।"

মহুয়া নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঈষৎ কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে বলল, "ভুল হয়ে গেছে, আর হবে না।"

বৃদ্ধ একটু শান্ত হয়ে বললেন, "পরশু বিকেল চারটে। আমার নাম অখিলেশ বর্মন, রিটায়ার্ড আর্মি ম্যান। পুলিশের ওপর মহলে ভালো চেনাশোনা আছে। যা করবে ভেবেচিন্তে করবে।"

বাড়ি ফিরে সে রাতে মহুয়া এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারল না। অখিলেশ বাবু বৃদ্ধ হলেও তাঁর শরীরের গঠন ছিল ঋজু ও টানটান, ব্যক্তিত্বে ছিল এক আকর্ষণীয় দৃঢ়তা। কিন্তু তাঁর কথাবার্তায় আর ভাবভঙ্গিতে লুকিয়ে ছিল এক গভীর অবিশ্বাস। আসলে উনি জীবনটাকে অনেক কাছ থেকে দেখেছেন, পোড়খাওয়া মানুষ। এমন একজন মানুষের সঙ্গে দিনে তিন-চার ঘণ্টা কাটানো মোটেও সহজ কাজ নয়।

কিন্তু মহুয়ার এই মুহূর্তে টাকাটা বড্ড দরকার। তার বাবা হঠাৎ একটা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন, পুরো সংসারটা প্রায় অচল। কত আর মানুষের কাছ থেকে ধার চাওয়া যায়! পেটের ক্ষুধা তো আর পরিস্থিতির কথা শোনে না। মনের ভেতরে চলা সমস্ত দ্বিধা আর দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে মহুয়া সিদ্ধান্ত নিল—কাজটা সে করবেই। এই চাকরিটা না করলে বাড়িতে চাল-ডাল আসবে না, বাবার প্রয়োজনীয় ওষুধটুকুও কেনা যাবে না।

সাহিত্যের আড্ডা ও বন্ধুত্বের সূচনা

বৃহস্পতিবার ঠিক বিকেল চারটের সময় অখিলেশ বর্মনের ফ্ল্যাটের বেল বাজাল মহুয়া। দরজা খুলে অখিলেশ বাবু তাকে দেখে বেশ প্রীত হলেন। নিজের হাতের দামী রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে একঝলক দেখে নিয়ে বললেন, "নিয়মানুবর্তিতা আমার পছন্দ। আগে কড়া করে এক কাপ কফি বানাও দেখি! আচ্ছা, ইংরেজি নভেল পড়তে পারো তো?"

সেদিনের বিকেলটা দারুণ কাটল। কফি আর স্ন্যাক্সের সাথে चलল এক চমৎকার সাহিত্য আলোচনা। চালর্স ডিকেন্সের বিখ্যাত উপন্যাস "আ টেল অফ টু সিটিজ" নিয়ে অখিলেশ বাবু এত সুন্দর বিশ্লেষণ করলেন যে মহুয়া অবাক হয়ে চেয়ে রইল। ওঁর মুখ থেকেই মহুয়া প্রথম জানতে পারল যে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে বাংলার চার্লস ডিকেন্স হিসেবে অভিহিত করা হয়।

দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। এই এক বছরে অখিলেশ বাবু আর মহুয়ার অসমবয়সী বন্ধুত্বের ভিতটা বেশ শক্ত হয়ে উঠেছিল। মাসের শেষে হাত পেতে টাকা নিতে এখন মহুয়ার নিজেরই খারাপ লাগত, কিন্তু পুরো সংসার চালানোর দায়ভার যার কাঁধে, তার তো এত আবেগ দেখালে চলে না। এই এক বছরে অখিলেশ বাবুর সৌজন্যে মহুয়া চার্লস ডিকেন্স থেকে ভিক্টর হুগো, চেতন ভগত থেকে ক্রিস্টোফার সি ডয়েল—কত লেখকের লেখার সাথে পরিচিত হয়েছে। মহুয়া বুঝতে পেরেছিল, মানুষটার বাইরে একটা কঠোর খোলস থাকলেও ওঁর মনে কোনো উন্নাসিকতা নেই; উনি পুরনোর পাশাপাশি নতুনকেও আপন করে নিতে জানেন। প্রথম দিন কেন অমন ব্যবহার করেছিলেন, সেটাও এখন মহুয়ার কাছে পরিষ্কার।

অখিলেশ বাবুর একমাত্র ছেলে বহু বছর ধরে আমেরিকায় প্রবাসী। আর তাঁর স্ত্রী গত হয়েছেন বছর চারেক আগে। যতদিন স্ত্রী বেঁচে ছিলেন, দুজনের মধ্যে এমন চমৎকার সব আলোচনা হতো, একে অপরের মধ্যেই তাঁরা জীবনের মানে খুঁজে পেতেন। কিন্তু স্ত্রীর হঠাৎ চলে যাওয়ায় যে একাকীত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেটা মানতে পারেননি অখিলেশ বাবু। সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক অভিমান। কিন্তু এই নিষ্ঠুর দুনিয়া তো বৃদ্ধের অভিমানকে পাত্তা দেয় না, তাই এক অক্ষম রাগে তিনি নিজের চারপাশে একটা দেয়াল তুলে নিয়েছিলেন।

আকস্মিক অসুস্থতা ও কঠিন বাস্তব

হঠাৎ একদিনের ঘটনা। মহুয়া সেদিন নতুন লেখক অমিশ ত্রিপাঠীর "রাবণ" বইটি পড়ে শোনাচ্ছিল। হঠাৎ পড়তে পড়তে ও দেখল, অখিলেশ বাবু বুকের বাঁ দিকটা চেপে ধরে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠলেন। মহুয়াকে আগে থেকেই সব নির্দেশ দেওয়া ছিল। সে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে নির্দিষ্ট নম্বরে ফোন করতেই দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স চলে এলো। অচেতন অখিলেশ বাবুকে নিয়ে মহুয়া হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। যে মানুষটা এতদিন একাকীত্বের অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছিলেন, তাঁর অসুস্থতার খবর পেয়ে ভিজিটিং আওয়ার্সে হাসপাতালের কেবিনের বাইরে ভিড় জমল তাঁর তথাকথিত বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনদের। মহুয়া নিঃশব্দে এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল, কেউ ফিরেও তাকাল না তার দিকে। তারপর একদিন সেই অমোঘ দিনটি এলো, যা সবার জীবনেই আসে—"জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?"

অখিলেশ বাবুর দেহটি পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেল। আমেরিকা থেকে তাঁর প্রবাসী ছেলে এলো। বাপের শ্রাদ্ধশান্তি শেষ করেই সে আসবাবপত্র সমেত সেই বিশাল ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিল। যে শিকড় বহু বছর ধরে এখানে ছিল, তা এক নিমেষে উপড়ে গেল। মহুয়ার ডিউটিও অফিশিয়ালি শেষ হয়ে গেল。

এক নতুন গন্তব্যের পথে

কিন্তু মহুয়া এই কাজটা আর ছাড়তে পারল না। অখিলেশ বর্মনের ফ্ল্যাটে নিয়মিত সময় কাটাতে গিয়ে সে উপলব্ধি করেছে, এই ব্যস্ত শহরের বুকে একাকী বসবাসকারী বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা আদতে কতটা অসহায়। তাঁদের টাকা-পয়সার অভাব হয়তো নেই, কিন্তু আছে একটুখানি কথা বলার মানুষের অভাব। মহুয়া মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যতদিন তার সামর্থ্য থাকবে, সে এই একাকী মানুষগুলোকে নিজের সময় দেবে। অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও তাদের একাকীত্বের সঙ্গী হবে।

মোবাইলের স্ক্রিনে বিজ্ঞাপনে দেওয়া একটা নতুন নম্বরে আঙুল ছোঁলাল মহুয়া। ফোনটা কানে দিয়ে সে হাঁটতে থাকল নতুন এক গন্তব্যের দিকে—যেখানে হয়তো অন্য কোনো একাকী বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা ঘরের কোণে বসে চাতকের মতো অপেক্ষা করছেন শুধু একটুখানি আন্তরিক কথার জন্য।

"বিনিময় যখন শুধু টাকার নয়, একাকীত্ব মোছার এক পশলা আন্তরিকতার।"

সংগৃহীত