ভৌতিক
একটি অলৌকিক জীবনরক্ষা ও অমীমাংসিত রহস্যের গল্প
বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রার যুগে ভূত বা অশরীরী আত্মা নিয়ে বিতর্ক অন্তহীন। গল্পের কথক, যিনি পেশায় একজন শিক্ষক, তিনিও ছিলেন ঘোর যুক্তিবাদী এবং অবিশ্বাসী। তিনি মনে করতেন, যা অণুবীক্ষণ বা দূরবীন দিয়ে দেখা যায় না, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। কিন্তু তাঁর এই সুদৃঢ় বিশ্বাস একদিন এক প্রবল ঝোড়ো সন্ধ্যায় ওলটপালট হয়ে যায়।
সমরের রহস্যময় আগমন
বাইরে তখন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, দমকা বাতাসে জানলার পর্দা উড়ছে। এমন সময় কথকের ঘরে এসে প্রবেশ করে তাঁর ছাত্র এবং প্রতিবেশী সমর রায়। সমর সবে লখনউ থেকে ঘুরে এসেছে, কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে ভীষণ উত্তেজিত এবং পাংশুটে। সমর সোজাসুজি প্রশ্ন করে বসে, "আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন মাস্টারমশাই?" এরপর সে শোনায় তার জীবনের সেই অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কথা।
স্টেশনের সেই অলৌকিক হাতছানি
দেরাদুন এক্সপ্রেসে লখনউ যাওয়ার পথে এক স্টেশনে ট্রেন থামলে সমর প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করতে নামে। হঠাৎ সে দেখে, আট-নয় বছরের একটি ফুটফুটে মেয়ে, পরনে নীল রঙের ফ্রক আর কোঁকড়ানো চুল, তাকে হাত নেড়ে ডাকছে। সমর ভাবল মেয়েটি হয়তো কোনো বিপদে পড়েছে। সে মেয়েটির পিছু পিছু স্টেশনের বিশ্রামকক্ষ ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে একটি বকুল গাছের নিচে চলে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই গার্ডের বাঁশি বাজে এবং ট্রেনটি ছেড়ে দেয়। সমর শত চেষ্টা করেও ট্রেনটি ধরতে পারে না এবং অদ্ভুতভাবে সেই মেয়েটিও চোখের নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যায়।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা
কিছুক্ষণ পর স্টেশনে হুলুস্থুল পড়ে যায়। সমর জানতে পারে, যে দেরাদুন এক্সপ্রেসে সে আসছিল, সেটি এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। ট্রেনের সামনের দিকের তিন নম্বর বগিতেই সমরের বসার কথা ছিল, যা একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। সেই রহস্যময়ী মেয়েটি তাকে ডেকে না নিয়ে গেলে সেদিন তার মৃত্যু ছিল অবধারিত।
ছবির রহস্য
লখনউ পৌঁছে সমরের বিস্ময়ের সীমা থাকে না। তার পিসিমা তাকে যে ঘরে থাকতে দেন, সেই ঘরের দেওয়ালে একটি ছবি দেখে সমর শিউরে ওঠে। এটি ঠিক সেই মেয়েটিরই ছবি যাকে সে স্টেশনে দেখেছিল। পিসিমাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, ওটি তাঁর মেয়ে টুনুর ছবি। টুনু সমরের জন্মের এক বছর আগেই টাইফয়েডে মারা গিয়েছিল।
পিসিমা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, পরলোকে থেকেও টুনু তার দাদাকে বিপদ থেকে বাঁচাতে ফিরে এসেছিল। সমরের সেই অমোঘ প্রশ্ন—"চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া মানুষ কি নিজের লোককে রক্ষা করার জন্য পৃথিবীতে ফিরে আসে?"—গল্পের শেষে এক গভীর রহস্য আর মুগ্ধতা রেখে যায়।