বাবার পুরনো ডায়েরি
"অতীতের ধুলোমাখা এক রহস্য, যা এক পলকে বদলে দিল চেনা পৃথিবীর পুরো পরিচয়। বাবার রেখে যাওয়া ডায়েরি কি সত্যিই কোনো ধামাচাপা দেওয়া সত্যের দলিল, নাকি এক অনিবার্য ঝড়ের পূর্বাভাস?"
প্রথম পর্ব: চিলেকোঠার বাক্স
বাবা মারা যাওয়ার ঠিক এক বছর পর আমি প্রথমবার আমাদের পৈতৃক বাড়িতে ফিরলাম।
বাড়িটা এখন প্রায় ফাঁকা। নিস্তব্ধতা যেন চারপাশের দেওয়ালে দেওয়ালে জমকা কালো মেঘের মতো জমে আছে। মা গত ছয় মাস ধরে মামার বাড়িতে আছেন, আর আমি কলকাতায় চাকরি করি। কাজের ব্যস্ততা আর নাগরিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে এই বাড়িতে আসা হয় না বললেই চলে।
সেদিন বাইরে টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। পুরনো বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের ধূসর আকাশটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, সময় যেন এখানে এসে থমকে গেছে। বারান্দার এক কোণায় বাবার সেই চেনা কাঠের দোলনাটা এখনও পড়ে আছে। কত বিকেল বাবা এই দোলনায় বসে বই পড়তেন, চা খেতেন। হঠাৎ বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। তখনই মনে হলো, একবার চিলেকোঠাটা দেখে আসি।
ছোটবেলায় বাবা কাউকে ওখানে যেতে দিতেন না। একটু পা বাড়ালেই গম্ভীর গলায় বলতেন—
"ওখানে শুধু পুরনো জিনিস আছে রে অর্ণব, তুই যাস না, ওখানে গেলে বিরক্ত হবি।"
কিন্তু আজ বাবার মৃত্যুর পর সেই নিষেধাজ্ঞার আর কোনো মানে নেই। কৌতুহল আর নস্টালজিয়ার এক অদ্ভুত টানে আমি ধুলো জমা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। দরজাটা ঠেলতেই একরাশ স্যাঁতসেঁতে হাওয়া আমায় স্বাগত জানাল। ঘরটা অন্ধকার, শুধু একটা জানালা অল্প খোলা ছিল। সেই ফাঁক গলে আসা বৃষ্টির হাওয়ায় পুরনো কাগজের একটা চেনা, অদ্ভুত গন্ধ ভেসে আসছিল।
ঘরের কোণের দিকে নজর যেতেই দেখলাম একটা লোহার বাক্স। তালাটায় মরচে পড়ে গেছে। অনেক কষ্টে, হাত কালিয়ে তালাটা খুলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল কয়েকটা পুরনো জামাকাপড় আর কিছু হলদে হয়ে যাওয়া ছবি। কিন্তু সবার নিচে রাখা ছিল একটা কালো মলাটের ডায়েরি।
বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। ডায়েরির প্রথম পাতাটা খুলতেই চেনা হাতের লেখা ভেসে উঠল। বাবার হাতের লেখা—
«যদি কোনোদিন এই ডায়েরি আমার ছেলে অর্ণবের হাতে পড়ে, তাহলে বুঝব, আমি আর বেঁচে নেই।»
আমার বুকটা ধক করে উঠল। পাতার ওপর আঙুল বুলাতে বুলাতে পরের লাইনটা পড়তেই আমার হাত কেঁপে গেল, গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। সেখানে লেখা—
«তুই যে আমার ছেলে, সেই সত্যিটায় সবচেয়ে বড় মিথ্যা।»
মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো যেন মাথার ওপরের ছাদ আর পায়ের নিচের মেঝেটা বনবন করে ঘুরছে। এর মানে কী? আমি কি বাবার ছেলে নই? রক্তহীন ফ্যাকাশে মুখে, কাঁপা হাতে আমি পরের পাতাটা খুললাম।
সেখানে তারিখ দেওয়া— ১২ জুন, ১৯৯৮।
«আজ অর্ণবের পাঁচ বছর পূর্ণ হলো। ওকে দেখে আমার মনে হয়, ঈশ্বর আমাকে দ্বিতীয়বার বাঁচার সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু আমি জানি, একদিন ও সত্যিটা জানতে চাইবে। আর সেই দিনটার জন্যই আমি এই ডায়েরি লিখছি।»
ঠিক তখনই আমার পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম— 'মা'।
রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মায়ের কাঁপা গলা ভেসে এলো, "হ্যালো? তুই কোথায় রে অর্ণব?"
আমি কোনোমতে ঢোক গিলে বললাম, "বাড়িতে।"
"চিলেকোঠায় যাসনি তো?" মায়ের গলায় এক চরম আতঙ্ক।
আমি চুপ করে রইলাম। কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। কয়েক সেকেন্ডের এক ভারী, দমবন্ধ করা নীরবতার পর মা ওপাশ থেকে ফিসফিস করে কেঁদে উঠলেন। ফুঁপিয়ে বলতে লাগলেন—
"ডায়েরিটা খুলিস না, অর্ণব! প্লিজ ওটা পড়িস না!"
"কেন মা?" আমার গলা দিয়ে তখন আর আওয়াজ বেরোচ্ছিল না।
오পাশে ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপর মা কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন—
"কারণ তোর বাবা যা লিখে গেছে, সেটা জানলে তুই আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবি না রে... কোনোদিন না!"
বলতে বলতেই ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গেল। আমার হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। ঠিক তখনই, আমার অসাড় হাতের ঝাঁকুনিতে ডায়েরির ভেতর থেকে একটা পুরনো ছবি পিছলে মাটিতে পড়ে গেল।
ঝুঁকে পড়ে ছবিটা তুললাম। ছবিতে একজন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই আমার চোখ কপালে উঠল— লোকটার মুখটা হুবহু আমার মতোই! আমার মতোই চোখ, আমার মতোই চোয়ালের গড়ন। কিন্তু এই লোকটাকে আমি জীবনে কোনোদিন দেখিনি।
কাঁপতে কাঁপতে ছবিটা উল্টে দেখলাম, তার পেছনে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা—
«আমার ছেলে অর্ণবের জন্য। — তোমার আসল বাবা।»
আমি স্তব্ধ হয়ে মেঝেতে বসে রইলাম। ঘরের আলো যেন আরও কমে এসেছে, বাইরের বৃষ্টির শব্দটা আরও তীব্র হচ্ছে। মনের ভেতর হাজারটা প্রশ্ন মাথা চড়া দিয়ে উঠছে— তাহলে এতগুলো বছর ধরে যাকে বাবা বলে জানলাম, তিনি কে? আর আমার মা কেন এই সত্যটা লুকানোর জন্য ছটফট করছেন? আমার আসল পরিচয় তবে কী?
বাবার এত বছরের এই চরম সত্যটা লুকিয়ে রাখার পেছনের রহস্যটা কী ছিল?
(চলবে...)
সংগৃহীত