আসক্তি, অনুরক্তি, বিরক্তি

১. আসক্তি: আতশবাজির ক্ষণিক ঝলক

প্রেমের শুরুটা অনেকটা আতশবাজির মতো। মুহূর্তের ঝলকে চারদিক আলোকিত করে দেয়। তখন মানুষ প্রিয় মানুষটির ত্রুটি নয়, শুধু সৌন্দর্যই দেখে। তার হাসি, কথা, অভিমান---সবই ভালো লাগে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এই সময় মানুষের মস্তিষ্কে আবেগের ঢেউ এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে বাস্তবতার অনেক অংশই আড়ালে চলে যায়। এই সময়টাকে বলা হয় আসক্তি।

অরিন্দম আর মেঘলার পরিচয় হয়েছিল এক পূজো প্যান্ডেলে। প্রথম দেখাতেই দুজনের চোখে এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠেছিল। দিনরাত ফোন, অসংখ্য বার্তা, হঠাৎ দেখা করার অজুহাত---একজনকে ছাড়া অন্যজন যেন কিছুই ভাবতে পারত না। পৃথিবীটা তখন তাদের কাছে ছোট হয়ে গিয়েছিল; দুজনের মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ ছিল সমস্ত আনন্দ。

২. অনুরক্তি: শান্ত গভীরতা ও দায়িত্ববোধ

কয়েক মাস পরে সেই উন্মাদনা একটু শান্ত হলো। কিন্তু সম্পর্ক ভাঙল না। বরং একে অপরের অসুস্থতায় পাশে দাঁড়ানো, ব্যস্ততার সময় অপেক্ষা করা, ছোট ছোট ত্যাগ স্বীকার করা---এসবের মধ্য দিয়ে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো। তখন আর শুধু ভালো লাগা নয়, এক ধরনের দায়িত্ববোধ, বিশ্বাস আর নির্ভরতা জন্ম নিল। এটাই ছিল অনুরক্তি।

একদিন মেঘলা বলল, ---"আগে তোমাকে না দেখলে অস্থির লাগত। এখন তোমাকে না দেখলেও জানি, তুমি আছ।"

অরিন্দম হেসে বলেছিল, ---"এটাই তো আসল ভালোবাসা।"

৩. বিরক্তি: অভ্যাসের একঘেয়েমি ও অবহেলা

কিন্তু মানুষ বড় অদ্ভুত। যা একদিন স্বপ্ন ছিল, সেটাই একসময় অভ্যাস হয়ে যায়। আর অভ্যাসকে যদি যত্নে না রাখা হয়, তবে সে ধীরে ধীরে একঘেয়েমিতে পরিণত হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অরিন্দম অফিসে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মেঘলাও নিজের কাজে ডুবে গেল। আগে যে ফোন না পেলে মন খারাপ হতো, এখন সেটাই বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। "এত ফোন করছ কেন?", "একই কথা বারবার বলো না", "আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছে না"--- এই কথাগুলো ধীরে ধীরে সম্পর্কের ভেতর জমতে লাগল।

অনেক বছর পরে দুর্গা পুজায় আবার তারা সেই পুরোনো প্যান্ডেলে দেখা করল। চারপাশে একই রকম ভিড়, একই রকম পুজো পুজো গন্ধ, একই রকম আলো ঝলমল অথচ দুজনের চোখে সেই প্রথম দিনের দীপ্তি আর নেই।

মেঘলা ধীরে বলল, ---"জানো, আমরা কেউ বদলাইনি। বদলে গেছে আমাদের দেখার চোখ।"

অরিন্দম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ---"প্রথমে তোমাকে পাওয়ার নেশা ছিল। পরে তোমাকে হারানোর ভয় ছিল। এখন তোমাকে পাওয়াটাকেই স্বাভাবিক ধরে নিয়েছি।"

মেঘলা মৃদু হেসে উত্তর দিল, --'"হয়তো এ কারণেই যত্ন কমে গেছে।"

দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর মেঘলা বলল, ---"প্রেমের মৃত্যু বিরক্তিতে নয়। প্রেমের মৃত্যু হয়, যখন মানুষ মনে করে---এই সম্পর্কটা তো আছেই, এর আর আলাদা যত্নের প্রয়োজন নেই।"

৪. উপসংহার: প্রেমের অবধারিত শেষ নয়

সেদিন তারা বুঝেছিল, আসক্তি প্রেমের সূচনা, অনুরক্তি প্রেমের পরিণতি, আর বিরক্তি প্রেমের অবধারিত শেষ নয়--- বরং অবহেলার ফল।

যে সম্পর্ক প্রতিদিন নতুন করে যত্ন পায়, সেখানে বিরক্তি এসে দরজায় কড়া নাড়লেও ঘরে ঢুকতে পারে না। আর যে সম্পর্ককে নিশ্চিত ভেবে অবহেলা করা হয়, সেখানে আসক্তির আগুন নিভে যায়, অনুরক্তির উষ্ণতাও হারিয়ে যায়, শেষে শুধু বিরক্তির ছাই পড়ে থাকে।

শিক্ষা: প্রেমের স্বাভাবিক পথ আসক্তি থেকে অনুরক্তির দিকে। কিন্তু সেই অনুরক্তিকে প্রতিদিন সম্মান, যত্ন ও নতুনত্ব দিয়ে বাঁচিয়ে না রাখলে, অনেক সম্পর্কের শেষ অধ্যায়ের নাম হয়ে যায়---বিরক্তি।

বাস্তব জীবনের নিরিখে লেখাটি কেমন লাগল জানালে বাধিত হব।