ভক্তি যেখানে সরল

"ভক্তি যেখানে সরল, ভগবান সেখানে সাকার। দামি রথের জাঁকজমক নয়, ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন আর শিশুর নিষ্পাপ ইচ্ছাই টেনে আনে স্বয়ং জগন্নাথকে। রথযাত্রার এক অলৌকিক ও হৃদয়স্পর্শী কাহিনী..."

১. বাজারের অপমান ও এক শিশুর ভাঙা স্বপ্ন

হরি মন্দির বাজারের হাটবারের ব্যস্ত সকাল। চারিদিকে কোলাহল আর দরদামের মাঝে মতিলাল বেপারী বেশ বাবু হয়ে বসে রয়েছেন। দু-তিন দিন ধরে ওনার দেড়শ টাকার কাগজের এই ছোট ছোট রথগুলো ভালোই বিক্রি হয়েছে। আজ সকাল থেকে এত বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও কত ছেলেমেয়েরা তাদের বাবাদের নিয়ে এসে একটা দুটো রথ কিনে নিয়ে গেছে। খানিক সুখানিন্দ্রা নেওয়ার ইচ্ছায় মতিলাল সবে চোখটা বুজেছে, তখনই খুঁটখুট করে কিছু শব্দে ও তৎক্ষণাৎ চোখ খুলে ফেলে। ওর সামনেই তিনটে কাগজের রথ যেগুলো বিক্রি হতে বাকি আছে, আর সেখানেই বছর সাতেকের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে।

মতিলাল ছেলেটিকে চিনতেন, তাই দেখেই ধমকিয়ে ওঠেন,
— "এই তুই সেই জেলে পাড়ার নীলু না? ওরকম নোংরা হাতে রথগুলোতে হাত দিচ্ছিস কেন? সরে দাঁড়া!"
— "কাকু একটা রথ দেবে গো?" নীলুর সরল প্রশ্ন।

মতিলাল ভেঙচি কেটে বলে ওঠে,
— "উঁহঃ, 'রথ দেবে গো!' ভারি আহ্লাদের কথা! তা পয়সা কড়ি আছে?"
— "না, পয়সা তো..." নীলু আমতা আমতা করে।

— "জানতাম! কার ছেলে দেখতে হবে না... তোর মা গত মাসে বাকি করে চাল ডাল নুন তেল সব নিয়ে গেল। তারপর থেকে আর সে বাকি দাম মেটানোর নাম নেই। কখনো বলে তোর বাপ এলে দেবে, কখনো বলে, হ্যাঁ হ্যাঁ এখনই দিয়ে যাচ্ছি, তারপর আর পাতা নেই। যা, বেরিয়ে যা! তোদেরকে তো এই বাজারে ঢুকতে দেওয়া উচিত না। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। কিচ্ছু হবে না এখানে, যা ভাগ! এদিকে খেতে পায় না, আবার সেদিকে শখও মন্দ না।"

আশপাশের লোকজন নীলুর দিকে কেমন করুণার চোখে তাকিয়ে থাকে। ও মাথা নিচু করে। দু ফোঁটা চোখের জল মুখ থেকে গড়িয়ে চিবুক বেয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলে পড়ে। পা ঘষে ঘষে ও এগিয়ে যায় বাড়ির দিকে। সত্যিই তো, বাবা-মা কী করে যে ওকে মানুষ করছে ও কি সেটা বোঝেনা? তবুও কেন যে পল্টুদের বাড়িতে সুন্দর ওই রথটা দেখে মতিলাল কাকুর দোকানে এলো! পল্টুর বাবা শহুরে ব্যবসায়ী। ওরা তো একটা কেন, দশটা রথ কিনতে পারে। কিন্তু ওরা যে গরিব—বাবা ট্রলারে মাছ ধরতে যায়, মা জাল বোনে। ওদের কি শখ মানায়?

২. নিজের রথ বানানোর জেদ

বাজার থেকে ঘরে যাওয়ার পথে আস্তাকুঁড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আজ দু-তিনটে ভাঙা সাইকেল আর একটা ভাঙা ঠেলাগাড়ি দেখতে পেয়ে নীলুর মাথায় এক বুদ্ধি চাপে। সেখান থেকে বেছে বেছে কিছু জিনিস ও টেনে টেনে বাড়িতে নিয়ে আসে আর এসেই থিতু হয়ে সেগুলো নিয়ে বসে পড়ে। নীলুর চোখে অদম্য জেদ, ও নিজের মনে মনে বলে ওঠে, "সবার বাড়িতে রথ আছে। ওরা কিনেছে তো কি হয়েছে, আমি নিজেই আমার রথ বানাবো।"

এরপর বিভিন্ন জায়গা থেকে টুকরো টুকরো নারকেল দড়ি, ভাঙা কাঠের বাক্স, খেলনা গাড়ির চাকাগুলো নিয়ে ও অনবরত চেষ্টা করে যেতে থাকে। কিন্তু নীলুর প্রচেষ্টা প্রত্যেকবার ব্যর্থ হয়, কোনো না কোনো ভাবে রথের অবয়ব সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তা ভেঙে যায়। সারাদিন নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে শেষ বিকেল পর্যন্ত যখন ওর রথ তৈরি হলো না, জিনিসপত্রগুলো বুকে নিয়ে ও ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

নীলুর মা চম্পা দেবী ছেলের দুঃখ মনে মনে ঠিকই বুঝতে পারেন। কিন্তু উপায় ওনারও নেই। বাড়িতে ঠিকমতো তেমন খাবারই নেই, ওকে রথ কিনে দেওয়ার পয়সা উনি পাবেন কোথায়? তাই নিরুপায় হয়ে উনি ওকে বারংবার আশ্বাস দিতে থাকেন,
— "ভগবানের উপর ভরসা রাখ, দেখিস তুই তোর রথ ঠিক বানাতে পারবি। তোর রথও বিকেলে বাকিদের সাথে ঠিক চলবে। এখন খেয়ে নে, খেয়ে দিয়ে উঠে আবার রথ বানাবি।"

জিনিসপত্রগুলো নিয়ে নীলু আবার চেষ্টা করে। কিন্তু এবারেও ব্যর্থ হওয়ায় ও আর নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারেনা। ওখানেই শুয়ে পড়ে কাঁদতে শুরু করে...

৩. কৃষ্ণমন্দিরের স্তব্ধ রথ ও দ্বারে অলৌকিক অতিথি

ওদিকে গ্রামের কৃষ্ণমন্দির থেকে রথ বেরোবে। বিকেল গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু রথ আর এগোচ্ছে না! কত লোক এসে রথের দড়ি ধরে টান দিয়েছেন, কিন্তু রথ যেই কে সেই, এক চুলও নড়ছে না। দু-একজন পুরোহিত দেখতে গেল রথে কোনো সমস্যা আছে কিনা... কিন্তু কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি চোখে পড়ল না।

ঠিক সেই সময়ে নীলুদের বাড়ির দরজায় কেউ যেন ধাক্কা দিচ্ছে। নীলু ভাবে হয়তো ওর বাবা এসেছে ট্রলার থেকে ঘুরে। সেই আশায় ও তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে এক মহিলা, পরনে সাধারণ শাড়ি, তবে বেশ খানিক নোংরা হয়ে রয়েছে। মহিলার সাথে রয়েছেন দুটি বাচ্চা ছেলে আর একটা বাচ্চা মেয়ে।

চম্পা দেবী তখন ঘুম থেকে উঠে এসেছেন。
— "হ্যাঁ বলুন, কাকে চাই?"
— "হ্যাঁ মা, বলছি দুটো খাবার হবে? বাচ্চা দুটো দিন তিনেক কিছুই খায়নি প্রায়। আমি খিদে সহ্য করে নিতে পারি, কিন্তু ওই টুকু টুকু বাচ্চা ওরা কি পারে? অনেক বাড়িই ঘুরলাম আমি এখানে। সবাই 'না' বলে ফিরিয়ে দিল। আপনি ফেরাবেন না, মা! অনেক আশা নিয়ে এসেছি।"

চম্পা দেবী কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে যান। উনি ভাবতে থাকেন হাঁড়িতে অল্প খাবার আছে বটে, কিন্তু তা যদি এদের দিয়ে দেন তাহলে রাতে কী খাবেন? বাড়িতে আর বাড়তি চাল তো নেই! উনি বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকান। সকলেই যে খিদেতে জীর্ণ হয়ে পড়েছে তা উনি বুঝতে পারেন।

নীলু সকলকে দেখে সেখান থেকে সরে এসে আবার ওর ভাঙা রথের কাছে বসে। চম্পা দেবী আর দ্বিধা না করে আগন্তুকদের ডেকে বলেন,
— "আপনারা আসুন ভিতরে আসুন, ওভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন না।"

৪. ক্ষুধার্তের অন্ন ও রথ নির্মাণ

চম্পা দেবী সকলকে ঘরের ভেতর বসতে বলেন,
— "আপনারা বসুন আমি খাবার আনছি।"

হাঁড়িতে যা খাবার ছিল সবটুকুই উনি বাচ্চাদের দিয়ে দেন। কিছুটা লজ্জিত মুখে বলেন,
— "কিছু মনে করবেন না, বাড়িতে শুধুই ভাত ছিল, কোনো তরকারিপাতি আর নেই।"
— "সে ঠিক আছে, এতেই ওদের হয়ে যাবে। একটু নুন-লংকা..." মহিলার চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেখা যায়।

তিনটে বাচ্চা সেইটুকু খাবারই চেটেপুটে তৃপ্তি করে খেয়ে নেয়। এরপর ওদের নজর পড়ে নীলুর ওপর।
— "ওকি ভাই, তুমি কাঁদছো কেন?" প্রথমজন জিজ্ঞাসা করে।
— "দেখো না, সেই সকাল থেকে চেষ্টা করছি। কিছুতেই এই রথ বানাতে পারছি না আমি।" নীলু ফুঁপিয়ে বলে।

বাচ্চা মেয়েটি নীলুর কাঁধের উপর হাত রাখে,
— "তোমার নাম নীলু, তাই না? আমি সুভা। আর হল জগা, আর ও হচ্ছে বলাইদা। আমরা কত রথ বানিয়েছি, তুমি যদি বলো তাহলে আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি।"

চম্পা দেবী সকলকে দেখে এঁটো থালাগুলো নিয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে যান। নীলু জিনিসপত্রগুলো থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়ায়। যে রথ নীলু সকাল থেকে এতবার চেষ্টা করেও পারেনি, তা এক নিমেষেই জগা, বলাই আর সু বানিয়ে দেয়! যেন ওরা কত জন্মের সুদক্ষ কারিগর। ওই ভদ্রমহিলা ওদের কাছেই চুপচাপ বসে থাকেন নিঃশব্দে। এত সুন্দর রথ এই কটা জিনিসে এভাবে তৈরি হতে দেখে নীলু ওদের তিনজনকে জড়িয়ে ধরে।

৫. ভক্তির জয় ও পরম প্রকাশ

এবার ওরা সকলে চলে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু চম্পা দেবী ওদের পথ আটকান,
— "আপনারা না এলে কি যে হতো, ছেলেটা সকাল থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কি বলে যে ধন্যবাদ জানাবো আপনাদের! এই কটা আম বাড়ির গাছ থেকে পেড়ে আনলাম, এগুলো নিয়ে যান, খিদে পেলে খাবেন।"
— "কি যে বলেন আপনি! নীলু খুবই ভালো ছেলে তাই ওর সাথে ভালোটাই হয়েছে। আর এত সুন্দর খাবার খাওয়ানোর জন্য ধন্যবাদ। মা অন্নপূর্ণার আশীর্বাদ আপনার ওপর থাকুক..."

ওনারা চলে যাওয়ার পর চম্পা দেবী সদর দরজা লাগিয়ে দেন। ওদের এঁটো থালাগুলো ধুতে গিয়ে দেখেন—থালাগুলো কেমন যেন চকচক করছে, এক অপরূপ সোনালী আভা ঠিকরে পড়ছে! শুধু তাই নয়, ওদের বাড়িতে শিউলি ফুলের গাছই নেই, অথচ উঠোন বিছিয়ে অসময়ে শিউলির মেলা বসে গেছে... সুগন্ধে চারদিক ম ম করছে!

ঠিক সেই মুহূর্তেই গ্রামের দিক থেকে ঢাক-ঢোলের আওয়াজ ভেসে আসে। গ্রামের মন্দিরের রথটা এতক্ষণে নড়ে উঠেছে! রথে কেউ যেন ফিরে এসেছেন। হাজার কণ্ঠে ধ্বনি উঠছে— "জয় জগন্নাথ... জয় বলরাম... জয় সুভদ্রা..."

চম্পা দেবী আর নীলু স্তম্ভিত হয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকে। নীলু বুঝতে পারে, জগা, বলাই আর সুভা—আসলে কারা ছিল! ভক্তের সামান্য ভাঙা কাঠ আর ভাতের থালাটুকুর টানে স্বয়ং শ্রী জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবী এসে তার রথ গড়ে দিয়ে গেছেন।


সংগৃহীত