অহংকারের বাঁধন বনাম অতীতের প্রতিধ্বনি
১. রুদ্র রোদ ও একটি নির্মম দৃশ্য
আষাঢ়ের শুরু হলেও প্রকৃতির মেজাজটা যেন রুক্ষ গ্রীষ্মের মতো। তপ্ত দুপুরে উপজেলা সদরের college মাঠে জড়ো হয়েছে শয়ে শয়ে মানুষ। সবার চোখে কৌতূহল আর উত্তেজনা। মাঠের সামনের এক বিশাল শিরীষ গাছের সঙ্গে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে এক তিরিশোর্ধ যুবতীকে। ফর্সা শরীরে মেটে রঙের শাড়ি পরা, চোখে জল আর অপমানে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখ। যুবতীর নাম বন্যা।
তার অপরাধ? সে জীবিকার তাগিদে এই শহরে এসে বান্ধবীর আশ্রয়ে "বনলতা" নামে একটা পোশাকের দোকান খুলেছিল। তার হাতের কাজ আর সুলভ মূল্যের কারণে দ্রুতই সে সবার নজর কাড়ে। কিন্তু গোলমাল বাঁধল আজ সকালে, যখন স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান সৈয়দ আহমেদ মির্জার একদল অল্পবয়সী ছোকরা কর্মী এসে জোর করে বন্যা'র দোকানের সাইনবোর্ডের ওপর চেয়ারম্যানের শুভেচ্ছা পোস্টার লাগিয়ে দেয়। বন্যা দোকানের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার ভয়ে পরে সেই পোস্টারটি ছিঁড়ে ফেলে। এই 'অপরাধে' political ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ যুবকেরা তাকে টেনে-হিঁচড়ে এনে মাঠে গাছের সাথে বেঁধে চরম অপমান করে। আশেপাশের মানুষ অন্যায় জেনেও ক্ষমতার ভয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল।
২. মেহতাব মির্জার আগমন ও এক অদ্ভুত স্তব্ধতা
ঠিক সেই মুহূর্তে কলেজ মাঠে এসে থামল একটি অভিজাত গাড়ি। গাড়ি থেকে নামলেন পঁয়ত্রিশোর্ধ এক কঠোর চেহারার পুরুষ—মেহতাব মির্জা, চেয়ারম্যানের ছেলে। দলের ছেলেরা ভেবেছিল মেহতাব এসে বন্যাকে আরও কঠোর শাস্তি দেবে। কিন্তু মেহতাব যখন পা বাড়িয়ে যুবতীর কাছাকাছি এলেন, আচমকা তার পায়ের গতি শ্লথ হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল তার। সানগ্লাসটা খুলে যখন ভালো করে তাকালেন, তখন মেহতাবের মুখের সমস্ত কঠোরতা এক নিমেষে মিলিয়ে গেল।
গাছের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা এই মেয়েটি আর কেউ নয়, এ যে বনশ্রী!
বন্যা তখন মেহতাবের দিকে তাকিয়ে কাঁপানো গলায় নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে বলছিল,
"আমার ছোট দোকানের ওপর পোস্টার লাগিয়েছিল আপনার লোকেরা। আমি বারণ করায় আমায় অপমান করে, তাই রাগ করে পোস্টারটা খুলে ফেলি। অন্যায় হয়েছে, আমি ক্ষমা চাইছি। প্লিজ আমায় যেতে দিন।"
কিন্তু মেহতাবের কানে তখন অন্য এক অতীত বাজছিল। সে বন্যার থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
"কেন এসেছ বনশ্রী? ছোবল দিতে? প্রাণটুকু নিয়ে বেঁচে আছি, সহ্য হচ্ছে না?"
বন্যা শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল,
"ক্ষমতাবানদের সঙ্গে যুদ্ধে নামে বোকারা। আমি বোকা নই।"
মেহতাব তখন মেকি ক্ষোভ দেখিয়ে বন্যাকে বাঁধনমুক্ত করার নির্দেশ দেয় এবং তাকে ৫ ঘণ্টার মধ্যে শহর ছাড়ার আলটিমেটাম দেয়। বন্যা চলে যাওয়ার পর মেহতাবের বুকের ভেতরটা এমন হাঁসফাঁস করতে শুরু করে যে সে গাড়িতে বসে ছটফট করতে থাকে এবং তার সঙ্গী শরীফকে ফার্মেসী থেকে ঘুমের ওষুধ আনতে পাঠায়।
৩. ফ্ল্যাশব্যাক: ২০১৭ সালের সেই ট্রেন যাত্রা
মেহতাবের এই অস্থিরতার মূল লুকিয়ে ছিল আজ থেকে প্রায় নয় বছর আগে, ২০১৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বর এক ট্রেন যাত্রার স্মৃতিতে।
সেদিন ট্রেনে মেহতাব ও তার বন্ধুদের দল রামিস, রাজনরা গিটার বাজিয়ে উচ্চস্বরে পুরনো দিনের গান গাইছিল। ট্রেনের বাকি যাত্রীরা সেই গান উপভোগ করলেও, জানালার পাশে বসা বন্যা (তখনকার বনশ্রী) তীব্র মাথায় যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। একপর্যায়ে সহ্য করতে না পেরে সে চিৎকার করে গান বন্ধ করতে বলে। মেহতাব ও বন্যার মধ্যে শুরু হয় তীব্র বাকবিতণ্ডা। মেহতাব অহংকার নিয়ে বলেছিল,
"ভিআইপি কামরা কেন নেননি?"
আর বন্যা সপাটে জবাব দিয়েছিল,
"ভিআইপি কামরা নয় বলেই নিজেদের মজি মতো কাজ করা বন্ধ করুন।"
বন্যার মাথা যন্ত্রণা দেখে মেহতাবের বন্ধু রাজন যখন ভদ্রতার খাতিরে নিজের ব্যাগ থেকে একটা বাম (মলম) বের করে বন্যাকে দিতে যায়, তখনই ঘটে আসল ঘটনা। মেহতাব তীব্র খুতখুঁতে স্বভাবের এবং মেয়েদের ব্যাপারে প্রচণ্ড রক্ষণশীল ও নাক-উঁচু ছিল। সে রাজনের হাত চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলেছিল,
"মলমটা আমার! এই মেয়েটা মলমটা ছোঁবে? আমি কি করে এটা দ্বিতীয়বার ইউজ করব?"
মেহতাবের অহংকার আর চরম অবহেলা দেখে রাজন অনুরোধ করেছিল, "প্লিজ ভাই, মেয়েটা অসুস্থ!" মেহতাব তখন বিরক্তির সাথে বলেছিল,
"বেশ। তবে একটা কাঠি বা তোর নিজের আঙুল দিয়ে মলম নিবি। ওই মেয়েটা যেন না ছোঁয়।"
রাজন ও মেহতাবের এই ফিসফিসানি বন্যা স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল। সেদিন চরম লজ্জা, অপমান আর হীনমন্যতায় ট্রেনের জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে।
৪. বর্তমানের হিসাবনিকাশ
আজ দীর্ঘ ৯ বছর পর, সেই ট্রেনের অহংকারী মেহতাব মির্জা আর অপমানের শিকার বনশ্রী (বন্যা) আবার মুখোমুখি। কিন্তু এবার পাশা উল্টে গেছে। বন্যা আজ ক্ষমতার শিকলে বাঁধা, আর মেহতাব ক্ষমতার শীর্ষে। তবুও বন্যা যখন মেহতাবের সেই চ্যালাকে (যে তাকে কুকুরের খাবার বানানোর হুমকি দিচ্ছিল) ক্রূর হাসি হেসে চলে যাচ্ছিল, মেহতাব বুঝতে পারছিল—আঘাত সে করলেও মনের যুদ্ধে আজ বনশ্রীই জিতে গেছে। অতীতের সেই অহংকার আজ মেহতাব মির্জাকে ভেতরের দিক থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, যার কারণে আজ তাকে ছটফট করে ঘুমের ওষুধের আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
সংগৃহীত