অহংকার বনাম আত্মিক টান

পুচাইয়ের অন্নপ্রাশন ও অলস দুপুর

পুচাইয়ের অন্নপ্রাশনের হইহুল্লোড় শেষ হতেই বাড়ির পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়ে এসেছিল। চুঁঁচুড়ায় বড় মামার বাড়িতে গরমের ছুটি কাটাতে এসেছিল বেহালার ললিতা আর দীপান্বিতা। দুপুরের চড়া রোদ আর ভ্যাপসা গরমে ক্লান্ত হয়ে বড় মাইমা কাবেরী, মেজো মামার ছেলের বউ নবনীতা বৌদি, ললিতা এবং দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী দীপান্বিতা ঘরের খাটে একরকম জড়সড় হয়ে জিরোচ্ছিল। অলস আড্ডার মাঝেই উঠে আসে বড় মাসির মেয়ে মিলিদি এবং তার বড়লোক বর অনিকেতের কথা। অনিকেত অত্যন্ত অহংকারী ও 'আনসো셜'। যৌথ পরিবারের মধ্যবিত্ত পরিবেশের সাথে সে কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পারে না, আর তাই শ্বশুরবাড়িতে এসে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। অন্যদিকে, বাড়ির সবাইও জামাইয়ের এই হামবড়া ভাবকে অতিরিক্ত তোয়াজ করে চলে, যা ললিতা ও দীপান্বিতার একদম পছন্দ নয়।

অনিকেতের রাজকীয় তর্জন-গর্জন

বিকেলের দিকে খবর আসে অনিকেত নাকি আজই চলে যেতে চায়! কারণ? তার নাকি 'ফুড হ্যাবিট' আলাদা এবং সে বাসি খাবার (অন্নপ্রাশনের বেঁচে যাওয়া খাবার) একদম খায় না। মাথা ধরার অজুহাতে সে বাড়ি ফেরার জেদ ধরে। এই শুনে বড় মাইমা কাবেরী দেবী অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জামাইকে খুশি করতে বড় মামাকে তড়িঘড়ি বাজারে পাঠানো হয় তাজা পাঁঠার মাংস (মটন) আনার জন্য। অনিকেতের এই অদ্ভুত নবাবী আচরণ দেখে দীপান্বিতা বারান্দায় গিয়ে মিলিদিকে জিজ্ঞেস করে, সে কেন এমন মানুষের সাথে মানিয়ে নিচ্ছে। মিলি মলিন হেসে জানায়, অনিকেত একটু অন্যরকম হলেও মানুষ খারাপ নয়।

অবহেলিত নীলাঞ্জন: এক খাঁটি মনের মানুষ

ঠিক এই সময়েই বাড়িতে প্রবেশ ঘটে মেজো মাসির জামাই নীলাঞ্জনের। নীলাঞ্জন আর দীপ্তিদি ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, যার কারণে বাড়ির বড়রা তাদের ওপর অসন্তুষ্ট। নীলাঞ্জন একসময় পিয়নের কাজ করলেও কঠোর পরিশ্রম ও লোন নিয়ে মাছ চাষ করে এখন বেশ ভালো জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। সে পুচাইয়ের অন্নপ্রাশনের সমস্ত মাছের দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু অহংকারী বড় মেসো (মিলিদির বাবা) নীলাঞ্জনকে দেখা মাত্রই অবজ্ঞা করে কথা শোনাতে শুরু করেন—মাছের মান ভালো ছিল না, দাম বেশি নেওয়া হয়েছে ইত্যাদি নানা খোঁটা দেন। অথচ এই নীলাঞ্জনই দীপান্বিতার পরীক্ষার সময় পাশে দাঁড়িয়েছিল, পরিবারের সকলের বিপদে সবার আগে হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বড়লোক জামাই অনিকেতের জন্য যেখানে পোলাও, ভেটকি ফ্রাই, মটন কষা আর নামী মিষ্টির আয়োজন করা হয়, সেখানে সরল মনের নীলাঞ্জনকে জোটে শুধু অবহেলা।

আকস্মিক বিপর্যয় ও মানবতার জয়

সন্ধ্যা নামতেই হঠাৎ বাড়ি জুড়ে শোরগোল পড়ে যায়। ড্রয়িংরুমে বসে থাকা বড় মেসো হঠাৎ বুক চেপে ধরে বেতের চেয়ারে ঢলে পড়েন। তাঁর এই আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে গোটা পরিবার যখন আতঙ্কে দিশেহারা, তখন সেই অহংকারী জামাই অনিকেতকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। বিপদের ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসে মেজো মামার ছেলে বুবাই এবং অবহেলিত সেই নীলাঞ্জন। দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডেকে মিলিদির বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় তারা। সারা রাত আইসিইউ-এর বাইরে পরিবারটিকে আগলে রাখে এই সাধারণ মনের ছেলেটিই।

পরদিন ভোরে যখন সবাই ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরে, তখন দীপান্বিতা আর নবনীতা বৌদির মনে একটাই সত্য প্রকট হয়ে ওঠে—

"টাকা আর দেমাক দিয়ে হয়তো সাময়িক খাতির পাওয়া যায়, কিন্তু বিপদের দিনে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর মানবিকতাই আসল আশ্রয়।"

সংগৃহীত