নিশা মণ্ডল

অনুপ্রেরণার উৎস ফ্যাশন টিভি (FTV) ছোটবেলায় যখন চারপাশের মানুষ গায়ের রঙ নিয়ে ট্রোল করত, তখন 'ফ্যাশন টিভি'-র মডেলদের দেখে মনের ভেতর স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। ডাস্কি বা শ্যামলা রঙের মডেলদের আত্মবিশ্বাস দেখেই তাঁর মনে হয়েছিল—আমিও একদিন এই মঞ্চে দাঁড়াব। আজ আমরা জানবো মডেল নিশা মণ্ডল-এর লড়াই এর গল্প সঙ্গে অপরাজিতা ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি রিক্তা বিশ্বাস।এই সাক্ষাৎকারটি শুধু একজন মডেলের গল্প নয়, এটি সমাজের তথাকথিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলে দেওয়ার এবং প্রতিটি ভেঙে পড়া মানুষকে নতুন করে বাঁচার আলো দেখানোর এক অনন্য অনুপ্রেরণা।

১। তোমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা কোথায় ?

আমার জন্ম, স্কুল এবং কলেজ সবটা-ই কলকাতায়, লেকটাউনে।

নিশা মণ্ডল

২। এত কিছু থাকতে মডেলিং কেন বেছে নিলে ?

মডেলিং বেছে নেওয়ার কারণ হলো, ছোটবেলা থেকেই আমি খুব বেশি বুলি হয়েছি আমার এই গায়ের রঙ নিয়ে। আর সেই সময় ফ্যাশন টিভি বলে একটা চ্যানেল ছিল, যেখানে আমি অনেক মডেলের ফ্যাশন শো দেখতাম। ওদের দেখে মনে হতো যে ওদেরকেও কেউ পয়সা দিয়ে দেখতে আসে। তখন থেকেই আমার মনে হয়েছিল আমি নিজেও এটা করতে চাই।

নিশা মণ্ডল

৩। গায়ের রঙ নিয়ে এত বুলি হওয়ার পরও কখনো ডিমোটিভেট হয়ে যাওনি?

না, আমি সব সময়েই খুবই পজিটিভ একজন মানুষ। আমি মনে করি ধৈর্য ধরলে সব হবে; একটু সময় লাগবে কিন্তু হবেই।

৪। তোমার মডেল হওয়ার জার্নিটা কি খুবই সহজ ছিল?

না, কখনোই সহজ ছিল না। কারণ এই প্রফেশনে কম্পিটিশন তো অনেকটাই বেশি, তার ওপর খুব কমই ডাস্কি (শ্যামলা) মডেল নেওয়া হয়। সেই জায়গা থেকে কাজ কন্টিনিউ পাওয়াটাও খুবই চাপের। আমার সব সময় মনে হয় ওই পসিটিভ চিন্তা ভাবনার জন্যই ব্যাক টু ব্যাক প্রচুর কাজ পেয়েছিলাম একদম প্রথমে আমার জার্নি শুরুর সময়ে । তার পর আমি ২ বছর কোনো কাজ পাইনি, জানি না কেন! এখনও স্ট্রাগল করছি আমি। তবে আমার ভরসা ছিল যে আমি ঠিক সবটা গুছিয়ে নেব, আবার সব ঠিক হবে—এই ভেবেই আমি সব সময় এগিয়ে চলি।

নিশা মণ্ডল

৫। এই যে ২ বছর তোমার কাজ ছিল না, সেই ফেজটা কীভাবে কাটিয়েছ? কখনো কি ভেঙে পড়োনি?

দেখো, ভেঙে পড়িনি বলাটা ভুল—দিনশেষে আমিও তো মানুষ! একদমই ভেঙে পড়িনি বলাটা যেমন ভুল, সেরকমই যে খুব বেশি ভেঙে পড়েছিলাম, সেরকম কিছুও না। ওই যে বললাম, আমি খুব পজিটিভ চিন্তার মানুষ। খারাপ সময়টাতে শুধু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতাম আর নিজেকে মোটিভেট করতাম। খারাপ সময়ের পর ঠিক একদিন ভালো সময় আসবে, এই পজিটিভ চিন্তাই আমার অস্ত্র বলতে পারো।

৬। ২ বছর কাজ না থাকার কারণ তোমার কী মনে হয়? তোমার কোনো ভুল, নাকি তোমাকে কাজের বিনিময়ে অন্য কোনো অফার দেওয়া হয়েছিল?

আমি না কখনোই অন্য কাউকে দোষ দেওয়াতে বিশ্বাস করি না। আমার মনে হয় আমারই ভুল, আমারই নিজেকে হয়তো আরও গ্রুম করা দরকার। আরও শিখতে হবে, শেখার তো কোনো শেষ হয় না কখনোই। আর যদি অন্য অফারের কথা বলি, তাহলে বলব—হ্যাঁ, এসেছিল। কিন্তু আমি কখনোই মেনে নিতে পারিনি সেইসব প্রপোজাল। কারণ আমি মনে করি যে কাজটা আমি আমার দক্ষতা দিয়ে পেতে পারি, সেটার জন্য কেন কম্প্রোমাইজ করব ? আমি তো মডেলিংটা খুব ভালোবাসি, তাই ভালোবেসেই কাজটা করতে চেয়েছি সবসময় এবং এখন ও তাই চাই।

নিশা মণ্ডল

৭। জীবনের কেরিয়ারের এত ওঠা-নামার মধ্যে পরিবারের সাপোর্ট কতটা ছিল?

ভীষণ পরিমাণে সাপোর্ট ছিল আমার পরিবারের। মা না থাকলে তো এত খারাপ সময় কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারতাম না। কারণ সবাই আমাকে নিয়ে খুবই বুলি করত—‘অ্যাঁ বাবা! তুই মডেল হবি?’... এরকম প্রচুর কটাক্ষের শিকার হয়েছি আমি ছোট থেকেই। কিন্তু মা খুব সাহস দিয়েছেন সব সময়। মাকে ছাড়া সম্ভব হতো না কখনোই।

৮। তোমার ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনা কী?

আমার ইচ্ছে আছে ফ্যাশন শো (RAMP WALK) করার। যেই কাজটা দেখেই আমি মডেল হতে চেয়েছিলাম, সেটাই এখনও করে উঠতে পারিনি। তার আগে এখন নিজেকে ভালো করে গ্রুম করছি। ভালো করে গ্রুম করে আমি ফ্যাশন শো (RAMP WALK) –এর জন্য অ্যাপ্লাই করব—আপাতত এটাই ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনা।

নিশা মণ্ডল

৯। এখন আমরা সবাই খুব অল্পতেই ভেঙে পড়ি, কিন্তু তুমি নিজেকে এত কিছুর মধ্যেও খুব ভালোভাবে সামলে চলেছ—সেটা তোমার খুবই পজিটিভ একটা দিক। কিন্তু সবাই তো সেটা পারে না, তাদের উদ্দেশ্যে তুমি কী সাজেশন দিতে চাও?

আমি শুধু এটাই বলব যে, আমাদের সবার জীবনেই ওঠা-নামা বা খারাপ সময় আসে। সেই মুহূর্তে ভেঙে না পড়ে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখাটা খুব দরকার। ধৈর্য ধরতে হবে আর নিজের মনকে পজিটিভ রাখতে হবে। সময় সবসময় একরকম থাকে না, আজ খারাপ তো কাল নিশ্চয়ই ভালো সময় আসবে। তাই নিজের স্বপ্নকে ভালোবেসে সততার সাথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত, সাফল্য একদিন আসবেই।

× Zoomed Image