জিৎ গন
  • "যেখানে উপহাসের শুরু, ঠিক সেখান থেকেই এক রাজত্বের জন্মঃ নিন্দুকের হাসিকে যিনি বদলে দিয়েছেন নিজের সাফল্যের হাততালিতে"

"শূন্য থেকে শুরু করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর রাস্তাটা সহজ ছিল না। আসানসোল থেকে কলকাতা—চোখে ছিল অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন। কোনো গডফাদার ছিল না, তাই জুনিয়ার আর্টিস্টের ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির গ্রুমার হয়ে ওঠার এই লড়াইটা শুধুই জেদ আর কঠোর পরিশ্রমের। আজ আপনাদের জানাবো মডেল গ্রুমার এবং তার সাথে সাথে অভিনেতা জিৎ গন-এর অসম্ভবকে সম্ভব করার এক জার্নির গল্প, সঙ্গে অপরাজিতা ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি রিক্তা বিশ্বাস

প্রশ্নঃ তোমার জন্ম ও ছোট বেলা কোথায় কেটেছে?

উত্তরঃ আমার জন্ম এবং ছোট বেলা সব-টাই আসানসোলে।

জিৎ গন
  • স্বপ্নপূরণের এক অজানা লড়াই
  • "শূন্য থেকে শুরু করে সাফল্যের শিখরে: গডফাদার ছাড়া নিজের সাম্রাজ্য গড়ার গল্প।

"জুনিয়ার আর্টিস্ট থেকে মুখ্য চরিত্র—গডফাদারহীন এক লড়াইয়ের গল্প। রূপোলী পর্দার পেছনের সংগ্রামটা হঠাৎ পাওয়া কোনো সাফল্য নয়, বছরের পর বছর ধরে বোনা স্বপ্নের ফসল।"

জিৎ গন

প্রশ্নঃ হঠাৎ করে মডেলিং কেন?

উত্তরঃ হঠাৎ করে বলাটা ভুল হবে। আসলে আমি অভিনয় করতে এসেছিলাম, কিন্তু অভিনয়ে টিকে থাকতে গেলে বা সুযোগ পেতে গেলে নিজের প্রোফাইল স্ট্রং করতে হবে এবং নিজস্ব একটা পরিচিতি বা ফেম তৈরি করতে হবে।

এই ভাবনা থেকেই আমি ধীরে ধীরে মডেলিং শুরু করি এবং খুব কম সময়ের মধ্যেই ফ্যাশন দুনিয়ায় এমন এক পরিচিতি পাই, যা বহু বছর অভিনয় জগতে স্ট্রাগল করেও পাইনি। কিছুদিনের মধ্যেই মডেল থেকে আমি একজন মডেল গ্রুমার হয়ে উঠি এবং দেশে-বিদেশে এত শো করি যে তা হয়তো হাতে গুনে শেষ করা যাবে না। অবশেষে যখন আমার একটা নিজস্ব শক্ত প্রোফাইল এবং ফেম তৈরি হলো, তখন বিনোদন জগত থেকে আমার কাছে কাজের অফার আসতে শুরু করল। এমনকি এমন এক অবিশ্বাস্য ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে প্রথমে আমাকে একটি ছোট চরিত্রের জন্য কাস্ট করা হয়েছিল, কিন্তু আমি যখন আমার প্রোফাইল পাঠাই এবং শুটিং ফ্লোরে পৌঁছাই, তখন জানতে পারি যে আমার প্রোফাইল দেখার পর পরিচালকেরা আমার চরিত্রটি জুনিয়ার আর্টিস্ট থেকে বদলে সরাসরি মুখ্য চরিত্র বা লিড রোল করে দিয়েছেন। (একতু হেসে) সত্যি বলতে, এটা আমার জীবনের অনেক বড় একটা পাওয়া। এখন যখন সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, ভীষণ ভালো লাগে। তবে এই সবটাই সম্ভব হয়েছে আমার ফ্যাশনের প্রতি ভালোবাসা, সততা আর কঠোর পরিশ্রমের হাত ধরে। আমার মতে—ভাগ্য বদলানোর অপেক্ষা নয়, পরিশ্রম হলো ভাগ্য ছিনিয়ে নেওয়ার মন্ত্র।"

জিৎ গন
  • সমালোচকদের হাসিমুখ, আজ আমার সাফল্যের মঞ্চ

"যারা একদিন হাসত অবহেলায়, আজ তারাই শেখে আমার ইশারায়ঃ সমালোচনাকে পেছনে ফেলে নিজের লক্ষ্য স্থির রাখার এক অদম্য গল্প।"

জিৎ গন

প্রশ্নঃ একজন মেল হয়ে আপনি ফিমেল গ্রুমার, সেটা নিয়ে কতটা বিদ্রুপের মুখোমুখি হতে হয়েছে? সেই সময়ে নিজেকে কীভাবে সামলেছেন?

উত্তরঃ দেখো, জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় একটা জিনিস আমি খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। আমি মনে করি, তোমার পেছনে বিদ্রুপ, সমালোচনা বা পরনিন্দা তারাই করে যারা যোগ্যতা বা সাফল্যের দিক থেকে তোমার চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। আসলে তারা জীবনে যে স্বপ্নটা পূরণ করতে পারেনি, যখন দেখে তুমি অনায়াসে এবং খুবই কম সময়ের মধ্যে সেই সাফল্যের শিখর ছুঁয়ে ফেলছ, তখন তাদের ভেতরের রাগ বা হিংসাটা-তো উপহাস হিসেবে বেরিয়ে আসে। অতএব, তাদের কাছে তো এই সব পরচর্চা করার জন্য প্রচুর অলস সময় আছে, কিন্তু আমাদের মতো ব্যস্ত মানুষদের জীবনে সেই সময়টা কোথায়? আমরা প্রতিদিন আমাদের লক্ষ্য পূরণ করার জন্য আপ্রাণ দৌড়াচ্ছি। তাই চলার পথে সবার সব কথাকে যদি তুমি গুরুত্ব দিতে যাও, তবে নিজের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য। বোধহয় এই কারণেই ঈশ্বর আমাদের দুটো কান দিয়েছেন—যাতে এক কান দিয়ে অবাঞ্ছিত সমালোচনা ঢুকলেও অন্য কান দিয়ে তা নিমেষে বের করে দেওয়া যায় (একটু হেসে)। হ্যাঁ, এটাই আমার জীবনের মূল দর্শন।

এবার যদি বাস্তবতার নিরিখে জানতে চাও যে আমি নিজে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি কতবার হয়েছি, তবে বলবো—অজস্রবার, জীবনের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে আমি এই তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছি। বিশেষ করে যখন ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে আমার মডেলিং জার্নিটা শুরু করেছিলাম, তখন পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল। শুধু আড়ালে বা পেছনেই নয়, কেরিয়ারের শুরুতে আমার সামনে দাঁড়িয়েও অনেকে আমাকে নিয়ে প্রকাশ্যেই হাসাহাসি করত, আমার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলত। কিন্তু আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে; সময় তার নিজস্ব নিয়মে চাকা ঘুরিয়েছে। আজ আমি গর্বের সাথে বলতে পারি, যারা একদিন আমাকে দেখে উপহাসের হাসি হেসেছিল, আজ আমি স্বয়ং তাদেরই 'গ্রুমার'। আজ তারা আমার কাছ থেকে কাজ শেখে। একজন মানুষের কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি, এর চেয়ে মধুর প্রতিশোধ বা সাফল্য আর কী-ই বা হতে পারে! তাই তো আজ আমি বুক ঠুকে সবাইকে বলতে পারি, চারপাশের নেতিবাচক কোলাহলে কান না দিয়ে নিজের ফোকাসটা একদম অর্জুনের তীরের মতো স্থির রাখো। লোকে কী বলল তাতে কিচ্ছু আসে যায় না, কারণ তোমার নীরব পরিশ্রম আর চূড়ান্ত সাফল্যই একদিন তোমার হয়ে সব সমালোচনার যোগ্য জবাব দিয়ে দেবে (একটু হেসে)।"

তিনি মনে করেন—"পরনিন্দা আর সমালোচনা হলো দুর্বলদের অস্ত্র, আর আপনার অস্ত্র হলো আপনার কঠোর পরিশ্রম। যারা আপনার পেছনে কথা বলে, তারা চিরকাল পেছনেই থেকে যাবে। তাই চাকা ঘোরানোর দায়িত্বটা নিজের হাতে নিন। আজ আপনি যাদের সামনে মাথা নিচু করে আছেন, কাল তারা যেন আপনার দিকে মাথা তুলে তাকাতে বাধ্য হয়। লড়ে যান! দিনশেষে একটা কথাই মনে রাখবেন—ভগবানের দেওয়া দুটো কান শুধু কথা শোনার জন্য নয়, একটা দিয়ে আবর্জনা ঝেড়ে ফেলার জন্যও। লোকে কী ভাবল তা নিয়ে ভাবার সময় আমাদের মতো ব্যস্ত মানুষের নেই। নিজের সাম্রাজ্য নিজেকেই গড়তে হবে। আজ যারা উপহাস করছে, কাল তারাই হাততালি দেবে।"

জিৎ গন

  • জিৎ গন-এর এই পথচলা আমাদের শেখায় যে, পথটা কতটা কঠিন ছিল সেটা বড় কথা নয়; জেদ আর সততা থাকলে লাইনের শেষ থেকে লাইমলাইটের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানো সম্ভব। অবহেলা আর উপহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজ তিনি নিজের ভাগ্যের নির্মাতা।
  • "ঈশ্বর আমাদের দুটো কান দিয়েছেন আবর্জনা ঝেড়ে ফেলার জন্য"—জিৎ গন-এর মুখের এই সহজ দর্শনটাই বোধহয় তাঁর সাফল্যের আসল চাবিকাঠি। ফ্যাশন গ্রুমার এবং অভিনেতা জিৎ গনের এই লড়াইয়ের গল্প আজ আমাদের মনে করিয়ে দিল, চাকা একদিন ঘোরেই, শুধু চাকা ঘোরানোর জেদটা নিজের মধ্যে থাকতে হয়।